পুরোনো ঢাকায় একদিন: বলধা গার্ডেন থেকে ইমরান হেরিটেজ পর্যন্ত ভ্রমণ
পুরোনো ঢাকায় একদিন: বলধা গার্ডেন থেকে ইমরান হেরিটেজ

সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে বলধা গার্ডেনে পৌঁছানো যায়। জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ১৯০৬ সালে এই বাগান তৈরির কাজ শুরু করেন এবং তা শেষ হয় ১৯৩৬ সালে। দীর্ঘ ২৮ বছরে বিশ্বের ৫২টি দেশ থেকে দুর্লভ গাছের চারা সংগ্রহ করা হয়। বর্তমানে এখানে ৮০০ প্রজাতির প্রায় ১৮ হাজার গাছ ও লতাগুল্ম রয়েছে। নরেন্দ্রনারায়ণ শুধু উদ্যানবিদই ছিলেন না, তিনি ছিলেন লেখক, নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক অনুরাগী। তাঁর বাগানবাড়িতে প্রায়ই গানের আসর বসত এবং স্বরচিত নাটক মঞ্চস্থ হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই বাড়িতে এসে উদ্যান দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। জানা যায়, অনেক বৃক্ষ ও ফুলের নাম তাঁরই দেওয়া। বাগানের দায়িত্বে ছিলেন বিখ্যাত উদ্যানবিদ অমৃতলাল আচার্য, তিনিও অনেক ফুলের নামকরণ করেন।

বলধা গার্ডেনের দুটি অংশ

৩ দশমিক ৩৮ একরের বলধা গার্ডেন দুটি অংশে বিভক্ত, যা মুখোমুখি রাস্তার এপার-ওপার। সিবিলি অংশে ৩০ টাকার টিকিটে প্রবেশ করা যায়। এখানে ঘন সবুজ গাছপালার মাঝে হাঁটলে বুনো গন্ধ ও প্রকৃতির খাঁটি অনুরণন পাওয়া যায়। বিখ্যাত শঙ্খনাদ পুকুরপাড়ে বসে মাছ ও কচ্ছপদের খাবার দেওয়া যায়। বিপরীত দিকে জয় হাউজ নামের হলদে দালান দেখা যায়। কথিত আছে, এই জয় হাউজে বসে রবীন্দ্রনাথ ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটি লিখেছিলেন, তবে এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এখানে বিখ্যাত ক্যামেলিয়া গাছও রয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে একটি ভাঙা সূর্যঘড়ি দেখা যায়।

রাস্তার বিপরীতে সাইকি অংশে প্রবেশের জন্য অনুমতি লাগে। এখানে বিশাল আমাজন লিলি ও নানা রঙের শাপলা ফুটে আছে। ক্যাকটাস ঘরটি অপূর্ব, এবং এখানে হিমালয়ের বিখ্যাত ভূর্জপত্র আছে—অতীতে এই গাছের বাকল শুকিয়ে মন্ত্র লেখা হতো। সোনালি কনকসূধা ফুল, উল্টো করে ঝুলতে থাকা লাল ও হলুদ উলট চণ্ডাল, টকটকে লাল সীতা অশোক এবং কাকতুরি নামের আশ্চর্য সুন্দর ফুলও দেখা যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছানা, মাঠা, চা ও কলম্বো সাহেবের সমাধি

সকাল ৮টায় বলধা থেকে বেরিয়ে পাশের খ্রিষ্টান কবরস্থানের সামনে আসা যায়। টিপু সুলতান রোডের মাদানী চায়ের বাড়িতে প্রায় ২০ রকমের চা পাওয়া যায়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাটির খুড়িতে মালাই-চা খাওয়া যায়। এছাড়া নারিন্দা পুলিশ ফাঁড়ির সামনে ছানা ও মাঠার স্বাদ নেওয়া যায়।

চায়ের বাড়ির উল্টো দিকে খ্রিষ্টান কবরস্থান, যেখানে কলম্বো সাহেবের সমাধি রয়েছে। সমাধিটি মোগল স্থাপত্যে বর্গাকার, চার দেয়ালে চারটি প্রবেশপথ, সামনে নকশা অঙ্কিত পিলার ও অষ্টভুজাকৃতির পিলারে পরীর ছবি। এই কলম্বো সাহেব কে ছিলেন তা রহস্যময়। কবরস্থান থেকে বেরিয়ে বাঁয়ে কয়েক পা হাঁটলে বিনত বিবির মসজিদ পাওয়া যায়, যা ১৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত ঢাকার প্রাচীনতম স্থাপনার একটি।

জয়কালী মন্দির ও প্রাতরাশ

সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪৫ মিনিটে জয়কালী মন্দির স্ট্রিটে প্রাচীন জয়কালী মন্দির দেখা যায়, যা ১৫৯৩ সালে তুলসীনারায়ণ ঘোষ ও নবনারায়ণ ঘোষ নির্মাণ করেন। এরপর হোটেল সুপার স্টারে নেহারি খাওয়ার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু সাতসকালেই নেহারি শেষ হয়ে যায়; তাই সবজি, ডাল, মাটন ও সুজির হালুয়া দিয়ে প্রাতরাশ করা হয়।

রোজ গার্ডেন

সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে টিকাটুলির কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে যাওয়া যায়। ১৯৩০ সালের দিকে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হৃষিকেশ দাস প্রাসাদটি তৈরি শুরু করেন। পরে তিনি দেউলিয়া হলে ১৯৩৭ সালে খানবাহাদুর আবদুর রশীদ এটি কিনে নেন এবং নাম দেন রশীদ মঞ্জিল। ২০১৮ সালে সরকার এটি কিনে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে। করিন্থীয় ও গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর সাত হাজার বর্গফুটের সাদা দোতলা প্রাসাদে মার্বেল মেঝে, ইউরোপীয় ছাদের কারুকাজ, খিলান দরজা, ঝাড়বাতি, নাচঘর ও সবুজ বেলজিয়ান কাচ রয়েছে। বিশাল গোলাপ বাগান, শ্বেতপাথরের ভাস্কর্য, কৃত্রিম ফোয়ারা ও পুকুর আছে। কথিত আছে, বলধা গার্ডেনের জমিদারের এক আয়োজনে অপমানিত হয়ে হৃষিকেশ দাস বলধার চেয়েও সুন্দর প্রাসাদ গড়ার জিদ করেছিলেন। তিনি গোলাপ ভালোবাসতেন, তাই ২২ একর জুড়ে নানা জাতের গোলাপ লাগিয়ে নাম দেন রোজ গার্ডেন।

বিউটি বোর্ডিং

বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে রোজ গার্ডেন থেকে বেরিয়ে শ্রীশ দাস লেনের বিউটি বোর্ডিংয়ে যাওয়া যায়। এটি জমিদার সুধীরচন্দ্র দাসের বাড়ি ছিল, ১৯৪৯ সালে দুই ভাই প্রহ্লাদচন্দ্র সাহা ও নলিনীমোহন সাহা ভাড়া নিয়ে বিউটি বোর্ডিং গড়ে তোলেন। ১১ কাঠা জমির এই বাড়িতে আড্ডা দিতেন কবি সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, খান আতা প্রমুখ। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এখানে হত্যাযজ্ঞ চালায়, প্রহ্লাদ সাহাসহ ১৭ জন মারা যান।

নর্থব্রুক হল, ঢাকা কেন্দ্র ও বুলবুল ললিতকলা একাডেমি

দুপুর ১২টায় বুড়িগঙ্গার তীরে ওয়াইজঘাটে নর্থব্রুক হল দেখা যায়, যা ১৮৭৪ সালে নির্মিত। ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। পাশেই ওয়াইজ হাউজে বুলবুল ললিতকলা একাডেমি ছিল, যা এখন পরিত্যক্ত। এছাড়া ফরাশগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রে দ্বিতীয় তলায় ঢাকাবিষয়ক দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ ও পত্রিকার সংগ্রহ রয়েছে। প্রদর্শনী কক্ষে প্রাচীন তৈজসপত্র, আসবাব ও অলংকার আছে। সাধারণ পাঠক বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা, গবেষকেরা সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত সময় কাটাতে পারেন।

শাঁখারীবাজার

বেলা ১টা ৩০ মিনিটে শাঁখারীবাজারে শাঁখের কাজ দেখতে যাওয়া যায়। দুই ধারে চুড়ি, বালা, টিপ ও বাদ্যযন্ত্রের দোকান। জলধি শঙ্খভান্ডার থেকে পলার চুড়ি কেনা হয় এবং বাড়ির ভেতরে শঙ্খ থেকে চুড়ি তৈরির পদ্ধতি দেখা যায়।

মধ্যাহ্নভোজ ও লালবাগ কেল্লা

বেলা ২টা ১৫ মিনিটে লালবাগ কেল্লার বিপরীতে রয়েল হোটেল বা অন্যান্য রেস্তোরাঁয় মধ্যাহ্নভোজের পর কেল্লায় প্রবেশ করা যায়। মোগল স্থাপত্যের এই নিদর্শন আওরঙ্গবাদ নামেও পরিচিত। নির্মাণ শুরু ১৬৭৮ সালে সম্রাট আওরাঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজম শাহের সময়, পরে ১৬৮০ সালে শায়েস্তা খাঁ আবার শুরু করেন কিন্তু কন্যা পরী বিবির অকালমৃত্যুতে অপয়া ধারণা করে থামিয়ে দেন। পরী বিবির সমাধি এখানেই। প্রধান ভবনে শায়েস্তা খাঁ বাস করতেন, এছাড়া তিন গম্বুজওয়ালা শাহী মসজিদ, দুর্গ প্রাচীর, জলাধার, সুড়ঙ্গ ও ফোয়ারা আছে।

আর্মেনিয়ান চার্চ ও কবরস্থান

বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে আরমানিটোলায় আর্মেনিয়ান চার্চ ও কবরস্থান দেখা যায়। ১৭৮১ সালে নির্মিত গির্জাটি ৭৫০ ফুট দীর্ঘ, শীর্ষে শঙ্খনীল মিনার। পাশের কবরস্থানে ক্যাচিক থমাসের সমাধির ওপর মেরি মূর্তি রয়েছে।

আহসান মঞ্জিল

বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটে আহসান মঞ্জিল যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকে। এটি নওয়াব আবদুল গণি প্রতিষ্ঠা করেন, পুত্র খাজা আহসানউল্লাহর নামে নাম। ১৮৫৯ সালে নির্মাণ শুরু, ১৮৭২ সালে শেষ। একসময় এর গম্বুজের চূড়া ঢাকার সর্বোচ্চ ছিল এবং এখানেই প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে। পূর্ব অংশে বৈঠকখানা ও পাঠাগার, পশ্চিমে নাচঘর ও আবাসিক কক্ষ। নিচতলায় দরবারগৃহ ও ভোজন কক্ষ। জাদুঘরে ৪ হাজারের বেশি নিদর্শন, ৩২টি কক্ষের মধ্যে ৯টি নবাবি আমলের মতো সাজানো। শনি থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত খোলা।

ইমরান হেরিটেজ

সন্ধ্যা ৬টায় বেচারাম দেউড়ির ইমরান হেরিটেজে নৈশভোজের জন্য বুকিং দেওয়া যায়। আর্মেনীয় স্থাপত্যে নির্মিত দেড় শ বছরের বেশি পুরোনো ‘সাহেব বাড়ি’টি ছয় বিঘা জমির ওপর তৈরি করেছিলেন জমিদার মৌলভি আবুল খায়রাত মোহাম্মদ। এখানে আতিথেয়তা নিয়েছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পী এস এম সুলতান ও রাজনৈতিক নেতারা। পঞ্চাশের দশকে যুক্তফ্রন্টের বৈঠক হয়েছিল এখানে। বর্তমান বংশধর ইমরান মিয়া ঐতিহ্যবাহী খাবার ও নানা নিদর্শন দেখান, যা ভোলার নয়।