প্রাণিজগতে চোখের পিউপিল বা মণির আকৃতিতে নানা ধরনের বৈচিত্র্য দেখা যায়। কাটলফিশের চোখের মণি দেখতে ইংরেজি ডব্লিউ অক্ষরের মতো। আবার ছাগলের চোখের মণি দেখতে অনুভূমিক আয়তাকার। কিন্তু প্রাণীদের চোখের পিউপিলের আকৃতি এত ভিন্ন হয় কেন?
সহজ কথায়, মূলত পিউপিল হলো আইরিশের মাঝখানের ছিদ্র, যা ছানিমুক্ত চোখে কালচে দেখায়। চোখের মণিকে আমরা একটি সাধারণ গর্তের মতো ভাবতে পারি। যা অন্ধকারে বড় হয় আর আলোতে ছোট হয়ে যায়। কিন্তু পুরো প্রাণিজগতের দিকে তাকালে এই মণির আকৃতিতে অদ্ভুত সব পার্থক্য দেখা যায়। বিড়াল বা সাপের চোখের মণি উল্লম্ব ফালির মতো। ঘোড়ার ক্ষেত্রে এটি আবার মাটির সমান্তরালে ছড়ানো চারকোনা বাক্সের মতো। মজার ব্যাপার হলো, একটি প্রাণীর চোখের মণির আকৃতি কেমন, তা থেকে বোঝা যায় প্রাণীটি আসলে কীভাবে চারপাশ দেখে এবং বেঁচে থাকার জন্য তার ঠিক কী প্রয়োজন।
যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির স্নায়ুবিজ্ঞানী জেনি রিড বলেন, পদার্থবিজ্ঞানের আদর্শ নিয়মে চোখের মণির আকৃতি কোনো বড় বিষয় নয়। কারণ, সেখান দিয়ে ঢোকা সমস্ত আলো চোখের ভেতরের একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতেই মেলার কথা। কিন্তু বাস্তব চোখের গঠন কখনোই নিখুঁত হয় না। চোখের মণি দিয়ে যখন আলো ভেতরে প্রবেশ করে, তখন আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে। আর ছবির স্পষ্টতা কমে যায়। চোখের মণির ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি মূলত চোখের এই ত্রুটি দূর করতেই ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে সাহায্য করে। বিজ্ঞানী জেনি রিডের ভাষায়, চোখের এই আলোর খেলাটি আসলে বেশ জটিল।
ডেপথ অব ফিল্ডের ভূমিকা
এ রহস্যের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘ডেপথ অব ফিল্ড’। ২০১৫ সালে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেই গবেষণায় প্রথম বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যাখ্যা করা হয়, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে থাকতে একটি প্রাণীর চোখের মণির আকৃতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই ‘ডেপথ অব ফিল্ড’ বিষয়টি সহজে বোঝা যায় ক্যামেরার লেন্সের মাধ্যমে। ক্যামেরার ভেতরে থাকা অ্যাপারচার ঠিক চোখের মণির মতোই কাজ করে। ক্যামেরার এই ছিদ্রটি যখন খুব ছোট বা সরু থাকে, তখন ক্যামেরার কাছের ও দূরের সব বস্তুই একদম পরিষ্কার ও নিখুঁত ফোকাসে থাকে। আবার ছিদ্রটি যখন বড় বা প্রশস্ত হয়, তখন শুধু নির্দিষ্ট একটি বস্তু ফোকাসে থাকে এবং তার সামনের ও পেছনের বাকি সবকিছু ঝাপসা হয়ে যায়।
চোখের মণি যখন পুরোপুরি গোলাকার না হয়ে অন্য কোনো আকৃতির হয়, তখন তা আলোকরশ্মিকে ভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। প্রাণিজগতের কিছু কিছু প্রাণী নিজেদের সুবিধামতো চারপাশ দেখার জন্য চোখের এই বিশেষ আকৃতির সুযোগটিকেই কাজে লাগায়।
শিকারি প্রাণীদের কৌশল
ওত পেতে থাকা শিকারি প্রাণী, যেমন বিড়াল বা সাপের চোখ থাকে মাথার একদম সামনের দিকে। এর ফলে এদের দুটি চোখ দুটি ভিন্ন কোণ থেকে শিকারকে দেখে। এরপর দুই চোখের দেখা সেই দৃশ্যের সামান্য পার্থক্য তুলনা করে এরা শিকারের নিখুঁত দূরত্ব মেপে ফেলে। বিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘স্টিরিওপসিস’। যেহেতু চোখ দুটি পাশাপাশি থাকে, তাই উল্লম্ব রেখাগুলোর পার্থক্য চোখ সবচেয়ে সহজে ধরতে পারে। অর্থাৎ, শিকার ধরতে হলে এই খাড়া রেখাগুলোকে একদম পরিষ্কার দেখতে হবে।
দূরত্ব নিখুঁতভাবে মাপার জন্য বিড়াল বা সাপের মতো শিকারি প্রাণীদের চারপাশের খাড়া রেখাগুলো একদম পরিষ্কার দেখতে হয়। এর জন্য এরা চোখের মণি আড়াআড়িভাবে ছোট করে লম্বালম্বি ফালির মতো খোলা রাখে। আড়াআড়িভাবে মণি ছোট রাখলে দূরত্ব নিখুঁতভাবে মাপা যায়। আর লম্বালম্বি অংশটি খোলা থাকায় চোখের ঝাপসা ভাব বা ব্লার ব্যবহার করে শিকারের দূরত্ব বোঝা সহজ হয়।
তবে এই নিয়মটি শুধু মাটির কাছাকাছি থাকা ছোট শিকারি প্রাণীদের জন্যই কাজ করে। সিংহ বা বাঘের মতো বড় শিকারি প্রাণীদের চোখের মণি বিড়ালের মতো না হয়ে গোল হয়। কারণ, এদের উচ্চতা বেশি হওয়ায় এরা বেশ ওপর থেকে শিকারের দিকে তাকায়, যার ফলে দূরত্ব মাপার জন্য চোখের এই ঝাপসা ছবির সুবিধা এরা খুব একটা পায় না।
শিকার হওয়া প্রাণীদের কৌশল
অন্যদিকে শিকার হওয়া প্রাণীদের প্রয়োজন আবার ভিন্ন। শিকার হওয়া প্রাণীদের জন্য ছবির স্পষ্টতার চেয়ে একনজরে চারপাশের বড় একটা এলাকা দেখতে পাওয়াটা বেশি জরুরি। যেহেতু এদের দিকে ধেয়ে আসা বেশির ভাগ শিকারি প্রাণীই মাটিতে থাকে। তাই মাটির ওপর বহুদূর পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে বিপদ টের পাওয়ার জন্যই এদের চোখের আকৃতি ভিন্ন হয়।
এ কারণে ছাগল, ভেড়া বা ঘোড়ার মতো শিকার হওয়া প্রাণীদের চোখ থাকে মাথার দুই পাশে। আর এদের চোখের মণি দেখতে একদম সোজা দণ্ডের মতো হয়, যা আড়াআড়িভাবে চওড়া আর লম্বালম্বিভাবে ছোট। এই চওড়া আকৃতির কারণে চারপাশ থেকে বেশি আলো চোখে ঢুকতে পারে, যা এদের চারদিকের বড় একটা অংশ একসঙ্গে দেখতে সাহায্য করে। আর ছোট লম্বালম্বি অংশটি চারপাশের আড়াআড়ি রেখাগুলোকে একদম স্পষ্ট করে তোলে। যা মূলত শিকারি প্রাণীদের চোখের ঠিক উল্টো কাজ।
সূত্র: লাইভ সায়েন্স



