বিপদে মুমিনের করণীয়: কোরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা
বিপদে মুমিনের করণীয়: কোরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা

বিপদাপদ মানুষের ইমান ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের কিছু ভয়, ক্ষুধা, ধনসম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫)

বিপদের সময় একজন মুমিনের করণীয় কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে কোরআন-সুন্নাহ জীবনঘনিষ্ঠ দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ইন্না লিল্লাহ পাঠ করা

বিপদের সময় কোরআন মুমিনকে একটি মহিমান্বিত দোয়া শিক্ষা দিয়েছে, যা পড়লে আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত পাওয়া যায়। তা হলো ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলা। আল্লাহ বলেন, ‘যাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হলে তারা বলে, “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী) তাদের ওপরই তাদের রবের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৬-১৫৭)

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা

সংকটের সময় মানুষের শক্তি ও উপায় সীমিত হয়ে যায়। তখন প্রকৃত আশ্রয় হলো আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা। আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনি তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ৩)

এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত নবী মুসার (আ.) জীবনে দেখা যায়। তিনি যখন সমুদ্র ও ফেরাউনের বাহিনীর মাঝখানে আটকা পড়লেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘কখনো নয়, নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে আমার রব আছেন, তিনি আমাকে পথ দেখাবেন।’ (সুরা শুয়ারা, আয়াত: ৬২) এরপর আল্লাহ সমুদ্রকে দ্বিখণ্ডিত করে তার মাঝখানে শুকনো পথ সৃষ্টি করেন এবং নবী মুসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের নিরাপদে পার করে দেন। ফলে সংকট যত বড়ই হোক, মুমিন কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৫-৬)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ধৈর্য অবলম্বন

বিপদের সময় একজন মুমিনের প্রথম ও প্রধান করণীয় হলো ধৈর্য ধারণ করা। ধৈর্য মুমিনের শ্রেষ্ঠ গুণ এবং আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ লাভের অন্যতম মাধ্যম। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের অপরিমিত প্রতিদান প্রদান করা হবে।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ১০)

হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন বিপদে ধৈর্য ধারণকারীদের যখন অগণিত প্রতিদান দেওয়া হবে, তখন দুনিয়ায় বিপদমুক্ত জীবনযাপনকারীরা আফসোস করে বলবে, ‘আহা, যদি দুনিয়ায় আমাদের শরীর কাঁচি দিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করে দেওয়া হতো, তবে আজ আমরাও এ মহাসম্মান ও অফুরন্ত প্রতিদানের অধিকারী হতে পারতাম।’ (আবু নুআইম ইস্পাহানি, হিলয়াতুল আউলিয়া, ৩/৯১, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৬)

বিপদে বিচলিত না হয়ে, অভিযোগ ও হতাশায় ভেঙে না পড়ে, আল্লাহর ফয়সালাকে মেনে নিয়ে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।

নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা

বিপদাপদে মুমিনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো আল্লাহর দরবার। মানুষের সব উপায় যখন সীমিত হয়ে যায়, তখন সে সেজদায় নত হয়ে মহান রবের সাহায্য কামনা করে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৫) সেজদায় বান্দা নিজের দুঃখ-কষ্ট, ভয়, আশঙ্কা ও অসহায়ত্ব মহান আল্লাহর কাছে নিবেদন করে। রাসুলের (সা.) জীবনেও এর বাস্তব দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। হুজাইফা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) কোনো কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে নামাজে দাঁড়াতেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩১৯)

তওবা করা

বিপদ-আপদ মানুষকে নিজের অসহায়ত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে আসতে উদ্বুদ্ধ করে। তাই এ সময় নিজের ভুলত্রুটি উপলব্ধি করে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের ওপর যে বিপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল এবং তিনি অনেক কিছুই ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৩০) অনেক বিপদ মানুষের পাপের কারণে আসে, আবার অনেক বিপদ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা ও মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমও হতে পারে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো বান্দার গুনাহ যখন বেশি হয়ে যায় এবং তা মোচনের জন্য পর্যাপ্ত নেক আমল না থাকে, তখন আল্লাহ তাকে দুঃখ-কষ্টে নিপতিত করেন, যাতে সেই কষ্টের মাধ্যমে তার পাপগুলো ক্ষমা করে দেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৫২৭৫)

তাই বিপদের সময় আত্মসমালোচনা করে তওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা উচিত।

সদকা করা

বিপদের সময় সদকা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। হাদিসে সদকাকে বিপদ-আপদ থেকে নিরাপত্তা ও আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সদকা আল্লাহর রাগকে প্রশমিত করে এবং অপমৃত্যু রোধ করে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬৬৪) আরেক বর্ণনায় এসেছে, ‘সদকা গুনাহকে ঠিক সেভাবেই মুছে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬১৬)

সমাধানের চেষ্টা

বিপদ থেকে উত্তরণের পথ না খুঁজে আল্লাহর ভরসা করে বসে থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়। একজন মুমিন সর্বোচ্চ চেষ্টা ও যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্যের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যা তোমার উপকারে আসে, তার প্রতি আগ্রহী হও, আল্লাহর সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে বসে থেকো না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪)

বিপদের সময় মানুষকে বাস্তবমুখী পদক্ষেপও নিতে হবে। অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ, আর্থিক সংকটে উপার্জনের চেষ্টা এবং পারিবারিক বা সামাজিক সমস্যায় বিচক্ষণতার সঙ্গে সমাধানের পথ অনুসন্ধান করাও ইসলামের শিক্ষা।

বিপদ-আপদ মানুষের জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা। কিন্তু একজন মুমিন যখন বিপদে ভেঙে না পড়ে ধৈর্য, তাওয়াক্কুল, দোয়া, তওবা, সদকা ও যথাসাধ্য প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে, বিপদ তখন তার জন্য গুনাহ মোচন, নেকি অর্জন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম হয়ে ওঠে।

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা