হোদাইবিয়ার সন্ধি: পরাজয়ের মুখে লুকানো বিজয়ের শিক্ষা
হোদাইবিয়ার সন্ধি: পরাজয়ের মুখে লুকানো বিজয়

হোদাইবিয়ার সন্ধি ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা, যা আপাত পরাজয় হলেও পরিণত হয়েছিল সুস্পষ্ট বিজয়ে। ৬২৮ খ্রিস্টাব্দে (হিজরতের ষষ্ঠ বছর) নবী মুহাম্মদ (সা.) স্বপ্ন দেখেন তিনি ও তাঁর সাহাবিরা নিরাপদে মক্কায় ওমরাহ সম্পাদন করছেন। নবীর স্বপ্ন ওহির অংশ হওয়ায় তিনি মদিনায় এই সুসংবাদ জানান এবং ওমরার প্রস্তুতি নিতে বলেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অবশ্যই আল্লাহ তাঁর রাসুলের স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছেন। আল্লাহ চাইলে তোমরা নিরাপদে, মস্তক মুণ্ডিত করে, নির্ভয়ে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে।’ (সুরা ফাতহ, আয়াত: ২৭)

যাত্রা শুরু ও পথরোধ

প্রায় ১৪০০ সাহাবি ইহরাম পরে, কোরবানির পশু সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে রওনা হন। পশু সঙ্গে নেওয়াই প্রমাণ করে যে তাঁরা যুদ্ধে নয়, ইবাদতে যাচ্ছেন। কিন্তু হোদাইবিয়া পৌঁছাতেই কোরাইশরা পথ আটকে দেয় এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে মক্কায় ঢুকতে দেওয়া হবে না। উদ্দীপনায় শুরু হওয়া যাত্রা মুহূর্তে বদলে যায় অনিশ্চয়তায়।

চুক্তির শর্ত ও সাহাবিদের প্রতিক্রিয়া

দীর্ঘ আলোচনার পর একটি চুক্তি হয়, যা ‘হোদাইবিয়ার সন্ধি’ নামে খ্যাত। শর্তগুলো ছিল একপেশে: এ বছর ওমরাহ না করেই ফিরতে হবে, পরের বছর মাত্র তিন দিনের জন্য মক্কায় আসার অনুমতি। শর্তটি সবচেয়ে বেশি আঘাত করে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে। তিনি সরাসরি নবীজির (সা.) কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি সত্যিই আল্লাহর নবী নন?’ নবীজি শান্তভাবে বলেন, ‘অবশ্যই আমি নবী।’ ওমর আবার বলেন, ‘তাহলে আমরা কেন ধর্মের ব্যাপারে এই অপমান মেনে নেব?’ নবীজি দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দেন, ‘আমি আল্লাহর রাসুল, আমি তাঁর আদেশ অমান্য করি না, আর তিনি কখনো আমাকে ধ্বংস করবেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩১) ওমরের প্রশ্ন অবিশ্বাস থেকে নয়, বরং প্রবল নিষ্ঠাবান মুমিনের আবেগ থেকে এসেছিল। পরে তিনি সারা জীবন এই দিনের কথা মনে করে অনুশোচনা করতেন এবং নফল নামাজ, রোজা, দান-সদকা করতেন। (ইবনে হিশাম, আস–সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৩/৩২৬)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উম্মে সালামার পরামর্শ

চুক্তি সইয়ের পর নবীজি (সা.) সাহাবিদের বললেন কোরবানির পশু জবাই করে ইহরাম ভাঙতে। কিন্তু কেউ নড়ল না। তিনবার বলার পরও কেউ উঠল না। চিন্তিত মুখে নবীজি তাঁবুতে ফিরে স্ত্রী উম্মে সালামা (রা.)-কে পুরো ঘটনা জানালেন। উম্মে সালামা পরামর্শ দিলেন, ‘আপনি কাউকে কিছু না বলে বাইরে যান, নিজের পশুটি জবাই করুন, নাপিতকে ডেকে মাথা মুণ্ডন করে ফেলুন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩২) নবীজি তা-ই করলেন। নবীজিকে নিজে কাজটা করতে দেখে সাহাবিদের স্তব্ধতা কেটে গেল এবং সবাই একসঙ্গে উঠে পড়লেন।

বিজয়ের ঘোষণা

ভারী মন নিয়ে মুসলিমরা মদিনার পথ ধরলেন। ঠিক তখনই নাজিল হলো সুরা ফাতহের প্রথম আয়াত, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমার জন্য এক স্পষ্ট বিজয় উন্মোচন করে দিয়েছি।’ (সুরা ফাতহ, আয়াত: ১) সাহাবিরা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ওমরাহ না করে ফিরে যাওয়াটাও কি বিজয়? নবীজি বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর গ্রন্থের শপথ, এটাই আসল বিজয়।’ (মুহাম্মদ ইবনে আলী আশ-শাওকানি, ফাতহুল কাদির, ৫/৭০) সময়ই এর যথার্থতা প্রমাণ করে। যুদ্ধবিরতির ফলে আরবে শান্তি পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং মানুষ প্রথমবারের মতো নির্ভয়ে ইসলামের কথা শোনার সুযোগ পায়। ইমাম জুহরি লিখেছেন, হোদাইবিয়ার পর দুই বছরে যত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তা নবুয়তের প্রথম ১৯ বছরের মোট সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। (কুরতুবি, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৬/২৬০)

শিক্ষা

ওমরের মতো দূরদর্শী সাহাবিও যখন তাৎক্ষণিক প্রজ্ঞা ধরতে হিমশিম খেয়েছিলেন, তখন উম্মে সালামার পরামর্শের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। নবীজি নিজে ওহির বাহক হয়েও সেই পরামর্শ সানন্দে গ্রহণ করলেন। আমাদের জীবনেও যখন পরিকল্পনা ভেস্তে যায়, চাওয়াগুলো অধরা থেকে যায়, তখন হোদাইবিয়ার এই গল্পটা মনে রাখার মতো। নিজের ছকের ওপর ভরসা হারানো যায়, কিন্তু আল-হাকিমের প্রজ্ঞার ওপর ভরসা যেন না হারায়। তিনি যা নির্ধারণ করেন, শেষ পর্যন্ত সেটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো হয়ে দাঁড়ায়। বোঝাপড়া হয়তো পরে আসে, কিন্তু আনুগত্যটা আসতে হয় আগে—এটাই একজন মুমিনের আসল পরীক্ষা।