বিবস্ত্র হয়ে ঘুমানো কি জায়েজ? ইসলামি বিধান ও সুন্নতের গুরুত্ব
বিবস্ত্র হয়ে ঘুমানো কি জায়েজ? ইসলামি বিধান

ঘুম মহান আল্লাহ তাআলার এক অনন্য নিয়ামত। সারাদিনের পরিশ্রম, ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদের পর মানুষের দেহ-মনকে পুনরায় কর্মক্ষম করে তোলে ঘুম। ইসলাম মানুষের জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে যেমন দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তেমনি ঘুমানোর আদব, শিষ্টাচার ও পদ্ধতিও শিক্ষা দিয়েছে। অনেকেই গরমের কারণে বা আরামবোধের জন্য সম্পূর্ণ বিবস্ত্র কিংবা খালি গায়ে ঘুমিয়ে থাকেন। এ বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের বিধান কী? এটি কি বৈধ, নাকি নিরুৎসাহিত? কুরআন-হাদিস ও ফকিহদের আলোচনার আলোকে বিষয়টি জানা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুম আল্লাহর একটি বিশেষ নিয়ামত

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন—وَجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا ۝ وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ لِبَاسًا ۝ وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا অর্থ: ‘আমি তোমাদের নিদ্রাকে করেছি বিশ্রামের মাধ্যম। আমি রাতকে করেছি আবরণস্বরূপ এবং দিনকে করেছি জীবিকা অর্জনের সময়।’ (সুরা আন-নাবা: আয়াত ৯-১১) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, ঘুম মানুষের শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ অনুগ্রহ।

বিবস্ত্র হয়ে ঘুমানোর বিধান

ইসলামি বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কেউ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও নিরাপদ স্থানে অবস্থান করেন এবং অন্য কারও দৃষ্টিতে পড়ার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে গায়ের ওপর চাদর বা অন্য কোনো আবরণ দিয়ে কিংবা খালি গায়ে ঘুমানো মুবাহ (জায়েজ)। অর্থাৎ, এতে সরাসরি কোনো গুনাহ নেই এবং কুরআন বা সহিহ হাদিসে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞাও পাওয়া যায় না। তবে যদি খালি গায়ে বা বিবস্ত্র অবস্থায় ঘুমানোর কারণে ঠান্ডা লাগা বা অন্য কোনো শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা পরিহার করাই উচিত। কারণ ইসলাম নিজের শরীরের ক্ষতি করা সমর্থন করে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেন ইসলাম বিবস্ত্র হয়ে ঘুমানো নিরুৎসাহিত করেছে?

যদিও এটি মূলত জায়েজ, তবুও ওলামায়ে কেরাম ও ফকিহগণ একে নিরুৎসাহিত করেছেন। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১. এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত নয়

রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো সম্পূর্ণ বিবস্ত্র অবস্থায় ঘুমাতেন— এমন কোনো সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায় না। বরং তিনি ঘুমানোর আগে ওজু করা, ডান কাতে শোয়া, দোয়া পড়া এবং শালীন পোশাক পরিধান করার শিক্ষা দিয়েছেন। অতএব, সুন্নতের অনুসরণ করতে চাইলে শালীন পোশাক পরে ঘুমানোই উত্তম। এতে যেমন সওয়াবের আশা করা যায়, তেমনি স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও এটি অধিক নিরাপদ।

২. ফেরেশতাদের প্রতি সম্মান ও লজ্জাবোধ

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—إِيَّاكُمْ وَالتَّعَرِّيَ، فَإِنَّ مَعَكُمْ مَنْ لَا يُفَارِقُكُمْ إِلَّا عِنْدَ الْغَائِطِ وَحِينَ يُفْضِي الرَّجُلُ إِلَى أَهْلِهِ، فَاسْتَحْيُوهُمْ وَأَكْرِمُوهُمْ ‘তোমরা নগ্নতা থেকে বিরত থাকো। কারণ তোমাদের সঙ্গে এমন (ফেরেশতা) রয়েছেন, যারা প্রাকৃতিক প্রয়োজন (প্রস্রাব-পায়খানা) এবং স্বামী-স্ত্রীর সহবাসের সময় ছাড়া কখনো তোমাদের ছেড়ে যান না। তাই তাদের সামনে লজ্জাশীল হও এবং তাদের সম্মান করো।’ (তিরমিজি ২৮০০) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া অযথা বিবস্ত্র থাকা ইসলাম পছন্দ করে না।

৩. লজ্জাশীলতা ইমানের অংশ

ইসলাম লজ্জাশীলতাকে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে মূল্যায়ন করেছে। এটি শুধু মানুষের সামনে নয়; বরং আল্লাহর সামনে এবং তার ফেরেশতাদের প্রতিও বজায় রাখার শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—الْإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ شُعْبَةً... وَالْحَيَاءُ شُعْبَةٌ مِنَ الْإِيمَانِ ‘ইমানের সত্তরেরও অধিক শাখা রয়েছে। সর্বোচ্চ শাখা হলো 'আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই'—এই সাক্ষ্য দেওয়া এবং সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া। আর লজ্জাশীলতা ইমানের একটি শাখা।’ (মুসলিম ৩৫)

ঘুম: এক অর্থে ছোট্ট মৃত্যু

ঘুমকে ইসলাম এক অর্থে মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করেছে। কারণ ঘুমের সময় মানুষের চেতনা স্থগিত থাকে এবং জেগে ওঠার মাধ্যমে সে যেন নতুন জীবন ফিরে পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا ‘আল্লাহ মানুষের প্রাণ কবজ করেন তার মৃত্যুর সময় এবং যে মারা যায়নি তারও (প্রাণ) ঘুমের সময়।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ৪২) এ কারণে একজন মুমিনের উচিত ঘুমানোর সময়ও যথাসম্ভব শালীনতা, পরিচ্ছন্নতা ও সুন্নতের আদব বজায় রাখা।

একজন মুসলিমের জন্য উত্তম করণীয়

  • সম্পূর্ণ বিবস্ত্র হয়ে না ঘুমিয়ে ঢিলেঢালা ও পরিচ্ছন্ন সুতি পোশাক পরিধান করা।
  • অন্তত একটি চাদর বা কাপড় দিয়ে শরীর আবৃত রাখা।
  • ঘুমানোর আগে ওজু করা, বিছানা ঝেড়ে নেওয়া এবং ঘুমের দোয়া পড়া।
  • ডান কাতে শোয়ার সুন্নত অনুসরণ করা।
  • প্রয়োজনে স্বাস্থ্যগত সুবিধা ও ইসলামের শালীনতার নির্দেশ—উভয়ের সমন্বয় করা।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, নির্জন ও নিরাপদ স্থানে বিবস্ত্র বা খালি গায়ে ঘুমানো শরিয়তের দৃষ্টিতে মূলত জায়েজ (মুবাহ); এতে সরাসরি গুনাহ নেই। তবে এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত নয় এবং ফেরেশতাদের প্রতি সম্মান ও ইসলামের লজ্জাশীলতার আদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণও নয়। তাই একজন সচেতন মুসলিমের জন্য শালীন পোশাক পরে অথবা অন্তত শরীর আবৃত রেখে ঘুমানোই অধিক উত্তম ও সুন্নতের নিকটবর্তী আমল। এতে যেমন ইসলামের আদব রক্ষা হয়, তেমনি স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও ব্যক্তিগত মর্যাদাও বজায় থাকে।