জার্মানির মুসলমানদের ইতিহাস: শ্রম ও সংগ্রামের বিস্ময়কর অধ্যায়
জার্মানির মুসলমানদের ইতিহাস: শ্রম ও সংগ্রামের অধ্যায়

জার্মানির ইতিহাসে মুসলিমদের অবদান কেবল অভিবাসনের গল্প নয়; এটি জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও শ্রমের এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক যাত্রা। বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৫৩ থেকে ৫৬ লাখ মুসলিম বসবাস করেন, যা দেশটির বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই অবদানের অনেকটাই আজ বিস্মৃত, আর মুসলিম সমাজ নানা ধরনের বৈষম্য ও ইসলামোফোবিয়ার মুখোমুখি হচ্ছে।

জার্মানির মাটিতে ইসলামের শিকড় বহু পুরোনো

জার্মানির ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে মুসলিমদের সম্পর্ক কয়েক শতাব্দী পুরোনো। ১৮৬৭ সালের প্যারিস প্রদর্শনীতে প্রুশিয়া নিজের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একটি মসজিদকে বেছে নিয়েছিল। বাভারিয়ার ‘সোয়ান কিং’ দ্বিতীয় লুডভিগ সুলতানের পোশাক পরতে ভালোবাসতেন। শার্লেমেনের কাছে ‘আবু আব্বাস’ নামের একটি হাতি ছিল, যা আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের উপহার। মুসলিম গণিতবিদ ও দার্শনিকেরা দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের দরবারে শিক্ষক ছিলেন এবং প্রুশিয়ান সেনাবাহিনীতে একটি তাতার ইউনিট কর্মরত ছিল।

বাভারিয়ান স্টেট অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য প্রিজারভেশন অব লোকাল হিস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুডলফ নিউমায়ার বলেন, ‘স্বদেশ মানেই বৈচিত্র্য; যা কিছু এখানে আছে, তার সবকিছু নিয়েই আমাদের এই ঘর। আর ইসলাম এখানে রয়েছে অনেক দীর্ঘ সময় ধরে।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভাষায় ঐতিহাসিক সম্পর্কের ছাপ

জার্মান ভাষায় আরবি উপসর্গ ‘আল’ (al)-যুক্ত অসংখ্য শব্দ—যেমন অ্যালকোহল (Alkohol), অ্যালজেব্রা (Algebra), অ্যালম্যানাক (Almanach) এবং অ্যালগরিদম (Algorithmus)—প্রমাণ করে, আরব মুসলিম গণিতবিদ ও দার্শনিকদের হাত ধরেই এসব শব্দ ইউরোপীয় ভাষায় প্রবেশ করেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জার্মানি বিনির্মাণে মুসলিমদের শ্রম ও অবদান

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জার্মানিকে পুনর্গঠনের অর্থনৈতিক বিস্ময় ‘ভিরশাফটসভুন্ডার’-এর পেছনে ছিল মুসলিম শ্রমিকদের অসামান্য অবদান। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ‘অতিথি কর্মী’ জার্মানিতে আসেন, যার বড় অংশ তুরস্ক, প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়া, মরক্কো ও তিউনিসিয়ার মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ থেকে।

বর্তমানে তুর্কি বংশোদ্ভূতরা ৮০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে চার লাখেরও বেশি মানুষের। তারা জার্মানি ও তাদের পূর্বপুরুষের জন্মভূমির মধ্যে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছেন।

সামাজিক মূল্যবোধে মুসলিমদের সক্রিয় উপস্থিতি

জার্মানির প্রথম ইসলামিক উপদেষ্টা হুসেইন হামাদান বলেন, ‘জার্মান মুসলিমরা রাজনীতি, গণমাধ্যম, শিক্ষা ও বিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। ইসলাম এখন জার্মানির বাস্তবতারই একটি অংশ।’

স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডেও মুসলিমদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। রবার্ট বোশ স্টিফটুংয়ের সাবেক প্রকল্প অংশীদার আয়তেন কিলিচারসলান বলেন, ‘মুসলিমরা শুধু নিজেদের কমিউনিটির জন্য নয়, বরং স্কুল, সামাজিক সংগঠন, খেলাধুলা, প্রবীণ মানুষ, প্রতিবেশী এবং শরণার্থীদের সহায়তায়ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।’ তার নেতৃত্বাধীন নারীদের পরিচালিত দাতব্য সংস্থা ‘সোশ্যালডিন্সট মুসলিমশার ফ্রয়েন (SmF)’-এর সঙ্গে বর্তমানে ১,৩০০-এরও বেশি মানুষ যুক্ত রয়েছেন।

বৈষম্য যেন এখনো মুসলিমদের নিত্যসঙ্গী

অবদানের দীর্ঘ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও জার্মানিতে ইসলামভীতি ও মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানের পাশাপাশি CLAIM এবং জার্মান ফেডারেল অ্যান্টি-ডিসক্রিমিনেশন এজেন্সির প্রতিবেদনেও এই প্রবণতার প্রমাণ পাওয়া যায়। জনপরিসরে মুসলিমদের ‘বহিরাগত’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে।

রবার্ট বোশ স্টিফটুংয়ের অভিবাসী সমাজবিষয়ক সিনিয়র প্রজেক্ট ম্যানেজার ভলকার নুসকে বলেন, ‘বিশেষ করে হিজাব পরিহিত নারীরা প্রায়ই হয়রানি ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।’ তিনি জার্মান সমাজে মুসলিমদের দৃশ্যমানতা, সমঅধিকার এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন।

জার্মানির ইতিহাস কেবল রাজা-সম্রাট, যুদ্ধ কিংবা শিল্পবিপ্লবের ইতিহাস নয়; এটি বহু সংস্কৃতি, বহু জাতি ও বহু ধর্মের সম্মিলিত অবদানের ইতিহাস। বৈচিত্র্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যেই একটি জাতির প্রকৃত শক্তি নিহিত। জার্মানির ইতিহাসে মুসলিমদের উপস্থিতি সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।