লা রিভের যাত্রা ও বর্তমান অবস্থান
১৬ বছর আগে যখন লা রিভ যাত্রা শুরু করে, তখন প্রতিষ্ঠাতা মন্নুজান নার্গিসের কোনো টেক্সটাইল ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না। শুরুর পরিকল্পনা ছিল পুরুষকেন্দ্রিক ব্র্যান্ড গড়ে তোলা, কিন্তু এক বছরের মধ্যেই বাজারের চাহিদা বুঝে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের বাজারে ফিউশন ফ্যাশনের একটি বড় শূন্যতা রয়েছে।' তখনই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য আধুনিক, আন্তর্জাতিক মানের ফিউশন পোশাক তৈরি করা।
বর্তমানে লা রিভের দেশজুড়ে ২৯টি শাখা রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি মিরপুরে, যার আয়তন প্রায় ১৬ হাজার বর্গফুট। প্রথম শাখাটি ২০০৯ সালে উত্তরার আরকে টাওয়ারে মাত্র ৫৫০ বর্গফুটের একটি ছোট আউটলেট ছিল, যা এখনো অন্যতম সফল। এছাড়া যমুনা ফিউচার পার্কসহ আরও কয়েকটি বড় শাখা রয়েছে। তবে গুলশানে শাখা না থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে নার্গিস বলেন, 'আমরা শুধু ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য কোনো শাখা খুলতে চাই না। প্রতিটি শাখা শুরু থেকেই টেকসই ও লাভজনক হতে হবে।' গুলশানের উচ্চ ভাড়ার কারণে পুলিশ প্লাজার আউটলেটের মাধ্যমেই ওই এলাকার গ্রাহকদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।
ডিজিটাল রূপান্তর ও করোনা মোকাবিলা
লা রিভ ডিজিটাল রূপান্তরে গুরুত্ব দিয়েছে। ওয়েবসাইটকে পূর্ণাঙ্গ স্টোর হিসেবে দেখা হয়, এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অ্যাপ রয়েছে। ভার্চুয়াল ট্রায়াল রুমের মতো নতুন প্রযুক্তি নিয়েও কাজ চলছে। করোনা মহামারির আগেই ইনভেন্টরি পরিকল্পনা নতুন করে সাজানো হয়। নার্গিস বলেন, 'অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন না করে সীমিত পরিসরে সংগ্রহ তৈরি করি এবং মৌসুমভিত্তিক পরিকল্পনা করে রাখি। এতে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।'
কঠিন সময়ে সহকর্মীদের ঐক্য ছিল বড় শক্তি। জ্যেষ্ঠ কর্মীরা স্বেচ্ছায় কয়েক মাস বেতনের অংশ ছেড়ে দিয়েছিলেন, যাতে কাউকে চাকরি হারাতে না হয়। লকডাউনের সময়ও অনলাইনে নানা কনটেন্ট, বৈশাখ ও ঈদের বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা হয়।
অনুপ্রেরণা ও ডিজাইন দর্শন
২০১৬ সালে প্যারিসের একটি ফ্যাশন কর্মসূচিতে ইভ সাঁ লরাঁর কাজ, তাঁর স্কেচ ও পোশাকের উপকরণ সংগ্রহের পদ্ধতি দেখে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন নার্গিস। মডেস্ট ফ্যাশনে ইন্দোনেশিয়ার ডিজাইনার দিয়ান পেলাঙ্গির কাজও তাঁর ভালো লাগে। এছাড়া ম্যাসিমো দুত্তি ও এইচঅ্যান্ডএমের ডিসপ্লে ও ফ্যাশন প্রেজেন্টেশন পর্যবেক্ষণ করেন।
নতুন সংগ্রহ তৈরির আগে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করা হয়, কিন্তু তা হুবহু অনুসরণ না করে বাংলাদেশের সংস্কৃতি, আবহাওয়া ও রুচির সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়। তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়: রং, প্রিন্ট ও সিলুয়েট। নার্গিস বলেন, 'একটি পোশাক দেখতে সুন্দর হলেই হবে না, সেটি পরেও আরাম লাগতে হবে।' তাই কাটিং, আর্মহোল, ফিটিং, পকেটসহ ছোট বিষয়গুলোর দিকেও নজর দেওয়া হয়। কোনো ডিজাইন বাজারে আনার আগে নিজেরা পরে পরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে পরিবর্তন আনা হয়।
পোশাকের মান ও মূল্য নির্ধারণ
পোশাকের গুণগত মান নিশ্চিত করতে ভালো উপকরণ, প্রিন্ট, স্টিচিং ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক পরীক্ষা করা হয়। নার্গিস জানান, অনেক গ্রাহক বলেন ১০-১২ বছর আগের লা রিভের পোশাকও এখনো ভালো অবস্থায় আছে। মূল্য নির্ধারণের সময় কাঁচামাল, উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, শোরুমের ভাড়া, কর্মীদের বেতন, মূলধনের খরচ, পরিচালন ব্যয়সহ পুরো ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার খরচ বিবেচনা করা হয়, এরপর যৌক্তিক মুনাফা যোগ করা হয়।
কিছু ক্ল্যাসিক ডিজাইন সচেতনভাবেই ধরে রাখা হয়, কারণ সেগুলোর প্রতি গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের ভালোবাসা রয়েছে। তবে প্রতিটি মৌসুমে সিলুয়েট, প্রিন্ট, কাট ও রঙে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করা হয়। সলিড বা একরঙা পোশাক নিয়েও কাজ করা হয়েছে, কিন্তু গ্রাহকেরা প্লেইন পোশাকের চেয়ে এমন ডিজাইন বেশি পছন্দ করেন, যেখানে কাট, প্যাটার্ন বা প্রিন্টের মাধ্যমে আলাদা বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। তাই প্রিন্ট এখন লা রিভের ব্র্যান্ড পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাব-ব্র্যান্ড নার্গিসাস ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
উচ্চমধ্যবিত্ত ও প্রিমিয়াম গ্রাহকদের জন্য তৈরি করা হয়েছে সাব-ব্র্যান্ড 'নার্গিসাস'। এতে উন্নত মানের উপকরণ যেমন সিল্ক ও বিশেষভাবে সংগ্রহ করা কাপড় ব্যবহার করা হয়, এবং হাতের কাজ, সূক্ষ্ম কারুকাজ, বিশেষ প্রিন্ট ও নিখুঁত স্টিচিংয়ে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিটি কালেকশন সীমিত সংখ্যায় এবং যত্নের সঙ্গে তৈরি করা হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। সিঙ্গাপুরে লা রিভের নিজস্ব স্টোর রয়েছে, এবং ভবিষ্যতে আসিয়ান ও গালফ অঞ্চলে শক্ত অবস্থান তৈরি করাই লক্ষ্য। তবে ৬৪ জেলায় শাখা স্থাপনের ইচ্ছা এখনো অপূর্ণ। নার্গিস বলেন, 'দেশের আটটি বিভাগে আমাদের শাখা রয়েছে। আশা করি, একদিন ৬৪ জেলাতেই লা রিভের শাখা থাকবে।'
কর্মসংস্কৃতি ও নেতৃত্ব
লা রিভের কর্মসংস্কৃতি অন্যতম শক্তি। নার্গিস বলেন, 'এখানে সবাইকে সহকর্মী হিসেবে দেখা হয়, কর্মচারী হিসেবে নয়।' অফিসে প্রায় সবাই একে অপরকে 'আপনি' বলে সম্বোধন করেন এবং মতের অমিল সম্মান রেখেই প্রকাশ করা হয়। ওনারশিপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছে—প্রত্যেকে নিজের কাজের দায়িত্ব নিজেই নেয়। নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও সময়সীমা দেওয়া হয়, এরপর সবাই স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়। সৃজনশীল কাজে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ করা হয় না, কারণ স্বাধীনতা থাকলেই কাজের সেরাটা বেরিয়ে আসে।
সিইও ও ডিজাইনার—দুটি ভূমিকা একে অপরের পরিপূরক বলে মনে করেন নার্গিস। তিনি নিজে এখনো সোর্সিং করেন এবং প্রায় প্রতিটি নতুন ডিজাইন নিজে পরে ট্রায়াল দেন। তাঁর মতে, 'আপনি যদি কাজকে ভালোবাসেন, একসময় কাজই আপনাকে বলে দেবে পরের পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত।'



