গোপন দাওয়াত থেকে হিজরত: নবীজির প্রথম তিন বছর
গোপন দাওয়াত থেকে হিজরত: নবীজির প্রথম তিন বছর

ছবি: ফ্রিপিক

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন। আর সদয় হোন আপনার অনুসারী মুমিনদের প্রতি।’ (সুরা শুআরা, আয়াত: ২১৪-২১৫)

এক.

নবুয়তপ্রাপ্তির পর দীর্ঘ তিনটি বছর কেটে গিয়েছিল। আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী নবীজি (সা.) এই তিন বছর গোপনে ইসলামের দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন। সতর্কতার সঙ্গে তিনি এ আহ্বান কেবল তাঁর পরিচিত বন্ধুমহলেই সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন। যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল সব ধরনের বাহ্যিক প্রকাশ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আল্লাহ–তাআলার কোনো নির্দেশই যে প্রজ্ঞাশূন্য নয়, এর একটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ ছিল ইসলামের প্রাথমিক দাওয়াতের এই স্তরবিন্যাস। মক্কার তৎকালীন কট্টর পৌত্তলিক সমাজে সূচনাতেই প্রকাশ্যে তাওহিদের দাওয়াত দেওয়াটা ইসলাম এবং নবীজি (সা.)—কারও জন্যই কল্যাণকর হতো না।

অভিজাত, সম্ভ্রান্ত এবং সমাজের তথাকথিত নিচু শ্রেণি মিলিয়ে প্রথম তিন বছরে নবীজির আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন ৪০ জন মানুষ।

মক্কার লোকেরা যে নবীজিকে সহজে রাসুল হিসেবে স্বীকার করে নেবে না, তা আল্লাহর কাছে অস্পষ্ট ছিল না। মানুষের মানসিক পরিচর্যা ও ক্ষেত্র প্রস্তুত করার আগেই যদি তাদের দীর্ঘদিনের পৌত্তলিকতা ছাড়ার আহ্বান জানানো হতো, তবে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কাই ছিল বেশি।

তাহলে তারা নবীজিকে শুরুতেই অস্বীকার করত এবং সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করত। সে কারণেই প্রাথমিক পর্যায়ে দাওয়াতের সীমা আপনজন ও একান্ত স্বজনদের মধ্যে সীমিত রাখতে এবং কঠোরভাবে গোপনীয়তা রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এভাবে কেটেছিল নবুয়তের প্রথম তিনটি বছর। এর ফলও হয়েছিল সুদূরপ্রসারী। অভিজাত, সম্ভ্রান্ত এবং সমাজের তথাকথিত নিচু শ্রেণি মিলিয়ে প্রথম তিন বছরে নবীজির আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন ৪০ জন মানুষ। মক্কার সেই জাহেলি ও পৌত্তলিক সমাজে এই সংখ্যা নেহাত কম ছিল না; বরং এর মধ্য দিয়ে ইসলাম মক্কার জমিনে কিছুটা সামাজিক শক্তি ও ভিত লাভ করেছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দুই.

নবীজি (সা.) এবং সাহাবিদের তিন বছরের কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও ত্যাগের বিনিময়ে ইসলাম যখন একটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তির ওপর দাঁড়াল, তখন আল্লাহ–তাআলা গোপনীয়তার পর্দা উন্মোচনের আদেশ দিলেন। নির্দেশ এল প্রকাশ্যেই মানুষকে মহাসত্যের দিকে আহ্বান জানানোর।

নাজিল হলো, ‘আপনি আপনার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করুন। আর সদয় হোন আপনার অনুসারী মুমিনদের প্রতি। আর যদি তারা আপনার অবাধ্যতা করে, তবে বলে দিন, তোমরা যা করো, তা থেকে আমি মুক্ত। আপনি ভরসা করুন পরাক্রমশালী পরম দয়ালের ওপর।’ (সুরা শুআরা, আয়াত: ২১৪-২১৭)

নবীজি (সা.) এবার প্রকাশ্যে দাওয়াতের কাজে নেমে পড়েন। একটি ভোজসভার আয়োজন করে তিনি তাঁর স্বগোত্রীয় সবাইকে নিমন্ত্রণ করলেন। আপ্যায়নের পর সবিস্তার তাঁদের সামনে তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তির কথা তুলে ধরলেন।

কিন্তু উপস্থিতদের প্রায় সবাই একযোগে সেই তাওহিদের আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করল। তারা ইসলামের নবীকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে চাইল।

মুসলমানদের সামনে একটাই পথ খোলা ছিল—নিজেদের আত্মরক্ষা এবং ধর্ম ইসলামের পবিত্রতা বজায় রাখার খাতিরে ধনসম্পদ ও আত্মীয়স্বজন ত্যাগ করে অন্য কোথাও চলে যাওয়া।

উল্টো সেখানে উপস্থিত নবীজির আপন চাচা আবু লাহাব ফুঁসে উঠল। সে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বলে বসল, ‘আবদুল মুত্তালিব পরিবার, এটা অত্যন্ত মন্দ কথা, অন্যরা মুহাম্মদকে থামিয়ে দেওয়ার আগে তোমরা নিজেরাই তাঁকে থামিয়ে দাও।’ (নুরুদ্দিন আলি আল-হালাবি, সুবুলুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফি সিরাতি খাইরিল ইবাদ, ২/৩২৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৯৩)

এর কিছুদিন পর মানুষকে ধর্মের প্রতি আহ্বানের জন্য নবীজি (সা.) যখন সাফা পর্বতে আরোহণ করেন, সেখানেও বড় বাধা এই আবু লাহাব। চিৎকার করে নবীজির উদ্দেশে বলল, ‘ধ্বংস হও তুমি, মুহাম্মদ! এই জন্যই কি আমাদের এখানে ডেকেছ?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৭৭০)।

তবে কোরআন সাক্ষী—মুহাম্মদ (সা.) নন, বরং আবু লাহাব নিজেই ধ্বংসের অতলগহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। (সুরা লাহাব দ্রষ্টব্য)

তিন.

তির যখন ধনুক থেকে বেরিয়ে যায়, তাকে আর ফেরানোর কোনো উপায় থাকে না। তখন সাহসিকতার সঙ্গে পরবর্তী পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

ইসলাম এত দিন গোপন থাকলেও প্রকাশের পর মক্কার পৌত্তলিক সমাজ জেনে গেল যে আবদুল্লাহর পুত্র মুহাম্মদ নিজেকে নবী দাবি করছেন এবং মূর্তিপূজা ছেড়ে এক আল্লাহর বন্দেগির আহ্বান জানাচ্ছেন। এই প্রকাশ্য ঘোষণায় মক্কার মুশরিক সমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়ল।

তারা তাওহিদে বিশ্বাসী ছোট্ট দলটিকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করতে যেন যুদ্ধ ঘোষণা করল। অসহায় মুসলমানদের ওপর তারা অমানুষিক নির্যাতন ও অবিচার শুরু করল। ‘মুসলমান হয়েছ, সুতরাং যন্ত্রণা ভোগ করো’—এমন পাশবিক মনোভাব নিয়ে তারা রক্তাপ্লুত করে চলল মক্কার মরুভূমি। এই নির্মমতার ইতিহাসে আমরা বিশেষভাবে স্মরণ করতে পারি ইসলামের প্রথম শহীদ সুমাইয়ার কথা। বনু মাখজুমের গোত্রপতি আবু হুজায়ফা বিন মুগিরা মাখজুমির দাসী ছিলেন সুমাইয়া (রা.)।

স্বামী ইয়াসির ও পুত্র আম্মারসহ তিনি সপরিবার ইসলাম গ্রহণ করেন। এ অপরাধে তাঁর ওপর নেমে আসে অত্যাচারের খড়্গ। তিনি নিজ বিশ্বাসের ওপর অবিচল ছিলেন। তাঁর এই দৃঢ়তা দেখে রাগে-গোস্‌সায় অন্ধ হয়ে আবু জাহেল নির্দয়ভাবে হামলে পড়ে এই পরিবারের ওপর।

শেষ পর্যন্ত সুমাইয়াকে বর্শা বিদ্ধ করে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়। সুমাইয়া (রা.) হলেন ইসলামের ইতিহাসের প্রথম নারী শহীদ। এই মাখজুম গোত্রেরই অন্য কন্যা হিন্দ (রা.) এবং তাঁর স্বামী আবদুল্লাহও (রা.) মক্কার জালিমদের এই রোষানল থেকে বাদ পড়েননি।

চার.

মক্কার বাতাস দিন দিন বিষিয়ে উঠছিল। আবু বকর, ওসমান, আলীর মতো সম্ভ্রান্ত ও বংশীয় মুসলমান থেকে শুরু করে আম্মার, ইয়াসির ও বেলালের (রাদিআল্লাহু আনহুম) মতো অসহায় ক্রীতদাস—কেউই রেহাই পাচ্ছিলেন না মুশরিকদের নিপীড়ন থেকে।

তখন পর্যন্ত মুসলমানদের সেই রাজনৈতিক বা সামরিক সামর্থ্য অর্জিত হয়নি যে তারা এই নির্যাতন প্রতিহত করবেন। আবার নবীজির অভিভাবক ও চাচা আবু তালিবের পক্ষেও একা সবার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব ছিল না।

তখন পর্যন্ত মুসলমানদের সেই রাজনৈতিক বা সামরিক সামর্থ্য অর্জিত হয়নি যে তারা এই নির্যাতন প্রতিহত করবেন।

এমন পরিস্থিতিতে মুসলমানদের সামনে একটাই পথ খোলা ছিল—নিজেদের আত্মরক্ষা এবং ধর্ম ইসলামের পবিত্রতা বজায় রাখার খাতিরে ধনসম্পদ ও আত্মীয়স্বজন ত্যাগ করে এমন কোনো ভূমিতে চলে যাওয়া, যেখানে তাঁরা নিরাপত্তার সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করতে পারবেন।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে নবীজি (সা.) সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন, ‘তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়ো।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কোথায় যাব?’ নবীজি (সা.) তখন আবিসিনিয়া বা হাবাশার দিকে ইশারা করে বললেন, ‘ওদিকে চলে যাও।’ (আবদুর রাজ্জাক আস-সানআনি, আল-মুসান্নাফ, ৫/৩৮৪, আল-মাকতাবুল ইসলামি, বৈরুত, ১৯৮৩)

তিনি আরও বললেন, ‘হাবাশায় এমন একজন বাদশাহ আছেন, যাঁর রাজত্বে কারও ওপর জুলুম করা হয় না। তোমরা তাঁর দেশে চলে যাও। যতক্ষণ না আল্লাহ তোমাদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ করে দেন, ততক্ষণ তোমরা সেই দেশে হিজরত করো এবং সেখানেই অবস্থান করো।’ (বাইহাকি, আস-সুনানুল কুবরা, ১৩/২০৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ২০০৩)

এই ঐতিহাসিক নির্দেশনাই ইতিহাসে ‘হাবাশার প্রথম হিজরত’ নামে পরিচিত, যা মুসলমানদের জন্য এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছিল।

আহমাদ সাব্বির : আলেম ও লেখক