ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মুহাররম। এটি আল্লাহ তাআলার সম্মানিত হারাম মাসগুলোর অন্যতম। শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, তাওবা, ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহামূল্যবান সুযোগ এনে দেয় এই মাস। কুরআন ও হাদিসের আলোকে এ মাসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে, যা একজন মুমিনের ইমানকে আরও দৃঢ় এবং জীবনকে আরও আল্লাহমুখী করে তুলতে পারে। জনপ্রিয় ইসলামিক স্কলার ড. মিজানুর রহমান আজহারী মুহাররম মাসের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় বিষয় তুলে ধরেছেন।
মুহাররমে আমাদের করণীয়
১. রোজার মাধ্যমে ইবাদতে নিমগ্ন হওয়া
বিশেষত ১০ মুহাররম তথা আশুরার দিনে এবং তার পূর্ববর্তী বা পরবর্তী একটি দিনে রোজা রাখা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। হজরত আবু কাতাদাহ (রা.) বর্ণিত হাদিসে এসেছে, আশুরার রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন। (মুসলিম ১১৬২)
২. নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্যবোধ বজায় রাখা
রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন জানতে পারলেন যে ইহুদিরাও আশুরার দিনে রোজা রাখে, তখন তিনি ঘোষণা করলেন, আগামী বছর বেঁচে থাকলে আমি ৯ তারিখেও রোজা রাখব। (মুসলিম:১১৩৪) রাসুলের (সা.) এই নির্দেশনা সুস্পষ্ট বার্তা দেয় যে, ইসলাম অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির অনুকরণ থেকে মুসলিম উম্মাহকে সর্বদা স্বাতন্ত্র্য রক্ষার নির্দেশ দেয়। সুতরাং ৯ ও ১০ মুহাররম একত্রে রোজা রাখা শুধুমাত্র আমল নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর স্বাতন্ত্র্য পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ বহিঃপ্রকাশ, যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলিম হিসেবে লালন করা আবশ্যক। পাশাপাশি হিজরি সাল মুসলিম উম্মাহর সভ্যতা ও সংস্কৃতিগত স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম অকাট্য দলিল। খ্রিস্টানদের যেমন নিজস্ব ইংরেজি সাল রয়েছে, তেমনি মুসলিমদের রয়েছে হিজরি সাল। তাই এই নতুন হিজরি বর্ষের সূচনায় কোনো অপসংস্কৃতির অনুকরণ না করে, ৯ ও ১০ মুহাররম একত্রে রোজা রাখা এবং হিজরি তারিখ ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের মুসলিম পরিচয়ের গৌরব ও স্বাতন্ত্র্যকে সমুন্নত রাখার সংকল্প করা উচিত।
৩. তাওবা ও ইস্তিগফারে সর্বোচ্চ মনোনিবেশ করা
এই মাসে এমন একটি দিন রয়েছে, যে দিন আল্লাহ তাআলা একটি সম্প্রদায়ের তাওবা কবুল করেছিলেন। (তিরমিজি ৭৪১) এই মাসটি ক্ষমা ও আত্মসমর্পণের মাস। এই সুযোগকে অবহেলায় হাতছাড়া করা কোনোভাবেই বিবেকসম্মত নয়।
৪. সকল প্রকার পাপাচার থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকা
হারাম মাসে পাপের ভার ও পরিণাম উভয়ই অধিকতর গুরুতর। কুরআনের নির্দেশ— ‘এই মাসগুলোতে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম কর না।’— এই নির্দেশ আমাদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা।
৫. আত্মসমীক্ষা ও আত্মপুনর্গঠনের সংকল্প গ্রহণ করা
হিজরি নববর্ষের সূচনা জীবনের সামগ্রিক গতিপথ পুনর্বিবেচনার এক সুবর্ণ মুহূর্ত। বিগত বছরের আমল ও চরিত্রের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করে নতুন বর্ষে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করাই হিজরি নববর্ষের প্রকৃত শিক্ষা। যে উম্মত তার নিজস্ব বর্ষপঞ্জির প্রতি উদাসীন, সে উম্মত আল্লাহর নির্ধারিত বরকতের মৌসুমগুলো থেকে অনিবার্যভাবে বঞ্চিত হয়। আসুন, এই মুহাররমে কেবল আচারিক উদযাপনে সীমাবদ্ধ না থেকে এই মাসের প্রকৃত দাবিগুলো পূরণে সচেষ্ট হই। তাওবার মাধ্যমে অতীতকে পরিশুদ্ধ করি, সুদৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে ভবিষ্যতকে আল্লাহমুখী করি।
হে আল্লাহ! আমাদের জন্য মহররম মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যারা আপনার সম্মানিত মাসগুলোকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে এবং আপনার দিকে তাওবার সাথে প্রত্যাবর্তন করে। আমিন।



