বেলজিয়ামে মুসলিম নারীরা হিজাব পরিধানের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। জাতীয়ভাবে হিজাব নিষিদ্ধ না হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সরকারি দপ্তরে ‘নিরপেক্ষতা’ নীতির আওতায় ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহারে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ফলে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ মুসলিম জনগোষ্ঠীর অনেক নারী বৈষম্য ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
হিজাবের বর্তমান বাস্তবতা
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসসহ বিভিন্ন শহরে মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকলেও হিজাব পরিধানকারী নারীরা শিক্ষা, চাকরি ও সামাজিক অংশগ্রহণে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন। প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, কর্মক্ষেত্রে দৃশ্যমান ধর্মীয় প্রতীক না থাকাই নিরপেক্ষতার পরিচয়। তবে মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত নিরপেক্ষতা মানে ধর্মীয় পরিচয় ত্যাগে বাধ্য করা নয়, বরং সব ধর্মের প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করা।
আইনি লড়াই: সমীরা আছবিতা মামলা
বেলজিয়ামে হিজাব বিতর্কের অন্যতম আলোচিত ঘটনা সমীরা আছবিতা বনাম জি৪এস মামলা। হিজাব পরার কারণে চাকরি হারানোর পর আছবিতা আদালতে যান, যা শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় বিচার আদালতে (ইসিজে) গড়ায়। আদালত নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরপেক্ষতা নীতিকে বৈধ বলে মত দিলেও, এই মামলা ইউরোপজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে।
শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন
২০২০ সালে বেলজিয়ামের সাংবিধানিক আদালতের এক রায়ের পর মুসলিম ছাত্রীরা #LaisseMoiEtudier (আমাকে পড়তে দাও) হ্যাশট্যাগে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করেন। ব্রাসেলসে শত শত শিক্ষার্থী ও অধিকারকর্মী বিক্ষোভে অংশ নেন। একই সময়ে #HijabisFightBack প্রচারণাও সামাজিক মাধ্যমে সাড়া ফেলে, যা ধর্মীয় স্বাধীনতা ও শিক্ষার অধিকার নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস
দীর্ঘ আইনি লড়াই ও সচেতনতার ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ব্রাসেলস, ঘেন্টসহ কয়েকটি স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারি প্রতিষ্ঠান হিজাবসংক্রান্ত নীতিমালা পুনর্বিবেচনা বা শিথিল করার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে আশা সঞ্চার করেছে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের সম্ভাবনাকে জোরালো করেছে।
ইসলামের নির্দেশনা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর আপনি মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশ পায় তা ছাড়া।” (সুরা আন-নুর: আয়াত ৩১) আরও বলেন: “হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়।” (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৫৯) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “লজ্জাশীলতা (শালীনতা) ঈমানের একটি শাখা।” (বুখারি ৯, মুসলিম ৩৫)
সমস্যা সমাধানে করণীয়
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের সমান শ্রদ্ধা নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্যহীন নীতিমালা প্রণয়ন, বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, মুসলিম নারীদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বিদ্বেষ ও হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। মুসলিম সমাজের উচিত ধৈর্য ও আইনসম্মত উপায়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
বেলজিয়ামে হিজাব নিয়ে চলমান আলোচনা ও সংগ্রাম প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় স্বাধীনতা কেবল আইনি বিষয় নয়, এটি মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক অধিকারের অংশ। একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী সমাজ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন প্রত্যেক নাগরিক ভয় বা বৈষম্য ছাড়াই নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারেন।



