বিয়ে একজন মুসলিমের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি শুধু দু'জনের মিলন নয়; বরং দুটি পরিবার, দুটি জীবন এবং একটি নতুন দায়িত্বের সূচনা। অনেক যুবক বিয়ের প্রস্তুতি বলতে পোশাক, অনুষ্ঠান, বাসা কিংবা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে বুঝে থাকেন। অথচ একজন মুমিনের প্রকৃত প্রস্তুতি শুরু হয় অন্তর থেকে—ঈমান, আমল, চরিত্র ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে।
যে যুবক বিয়ের আগে নিজেকে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য বানানোর চেষ্টা করে, সে-ই পরবর্তীতে একজন উত্তম স্বামী, দায়িত্বশীল অভিভাবক এবং আদর্শ পরিবারের ভিত্তি হতে পারে। তাই একজন মুসলিম যুবকের বিয়ের আমল ও প্রস্তুতি নিম্নরূপ:
১. তাওবা ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে নতুন জীবনের সূচনা
বিয়ের আগে নিজের অতীত ভুল, গুনাহ এবং অবহেলার জন্য আন্তরিক তাওবা করা উচিত। কারণ পবিত্র জীবনের শুরু হওয়া উচিত পবিত্র হৃদয় দিয়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন— وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ 'হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।' (সুরা আন-নূর: আয়াত ৩১)
২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি যত্নশীল হওয়া
যে ব্যক্তি নিজের রবের হক আদায় করতে শেখেনি, তার পক্ষে মানুষের হক আদায় করাও কঠিন। তাই বিয়ের আগে নামাজকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা জরুরি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— أَوَّلُ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الصَّلَاةُ 'কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দার নামাজের হিসাব নেওয়া হবে।' (তিরমিজি ৪১৩)
৩. তাকওয়া ও আল্লাহভীতি অর্জন
সফল দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো তাকওয়া। যে ব্যক্তি গোপনে আল্লাহকে ভয় করে, সে স্ত্রীর প্রতি অবিচার করতে পারে না এবং সংসারের দায়িত্ব থেকেও পালিয়ে যায় না।
৪. কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা
বিয়ে শুধু দুনিয়াবি সম্পর্ক নয়; এটি ইবাদতেরও একটি মাধ্যম। তাই প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। বিশেষভাবে এই দোয়াটি পড়া যেতে পারে— رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا উচ্চারণ: 'রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াঝিনা ক্বুররাতা আ'ইউনিওঁ ওয়াঝআ'লনা লিলমুত্তাক্বিনা ইমামা।' অর্থ: 'হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানান।' (সুরা আল-ফুরকান: আয়াত ৭৪)
৫. হালাল উপার্জনের ব্যবস্থা করা
রাসুলুল্লাহ (সা.) যুবকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন— يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ 'হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে।' (বুখারি ৫০৬৬) সামর্থ্যের মধ্যে আর্থিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও অন্তর্ভুক্ত। তাই হালাল উপার্জনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
৬. চরিত্র ও আখলাক সুন্দর করা
বিয়ের আগে নিজের রাগ, অহংকার, অস্থিরতা ও খারাপ অভ্যাসগুলো সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত। কারণ সুন্দর চরিত্র ছাড়া সুখী সংসার গড়া সম্ভব নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا 'মুমিনদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ইমানের অধিকারী সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।' (তিরমিজি ১১৬২)
৭. স্ত্রীর হক ও পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন
বিয়ের আগে একজন যুবকের জানা উচিত— স্ত্রীর অধিকার কী, স্বামীর দায়িত্ব কী, পারিবারিক জীবনে ইসলামের নির্দেশনা কী। জ্ঞান ছাড়া দায়িত্ব পালন প্রায়ই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
৮. হারাম সম্পর্ক ও দৃষ্টির হেফাজত
বিয়ের প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো নিজের চোখ, মন এবং হৃদয়কে হারাম সম্পর্ক ও দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন— قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ 'মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।' (সুরা আন-নূর: আয়াত ৩০)
৯. ইস্তিখারা ও দোয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া
জীবনসঙ্গী নির্বাচন শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তাই ইস্তিখারা, মাশওয়ারা এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
বিয়ের জন্য প্রকৃত প্রস্তুতি শুরু হয় আয়নার সামনে নয়, সিজদার মাটিতে। একজন মুসলিম যুবকের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হলো— নিজেকে এমন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, যার হাতে একটি পরিবার নিরাপদ থাকবে, যার চরিত্রে একজন স্ত্রী সম্মান খুঁজে পাবে এবং যার আমলে আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রকাশ পাবে।
মনে রাখবেন, একজন নেককার স্ত্রী পাওয়ার জন্য নিজেকেও নেককার এবং নিষ্কলুষ চরিত্রের অধিকারী হতে হয়। তাই বিয়ের আগে ঘর সাজানোর চেয়ে নিজের ঈমান, আমল ও চরিত্রকে সাজানোই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা সকল যুবককে উত্তম আমল, সুন্দর চরিত্র এবং বরকতময় দাম্পত্য জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।



