নদী-হাওর রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে সচেতনতা বাড়াতে সম্প্রতি একটি ব্যতিক্রমধর্মী কায়াকিং কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন কিছু বাংলাদেশি ও চীনা তরুণ অভিযাত্রী ও শিক্ষার্থী। গত ৩১ মে নেত্রকোনার খালিয়াজুরি হাওরের আন্ধাইর গুচ্ছগ্রাম থেকে শুরু হয়ে ১ জুন কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা পর্যন্ত এই অভিযান চলে। ‘বাংলাদেশ-চীন ফ্রেন্ডশিপ কায়াকিং’ নামে এই উদ্যোগটি গ্রহণ করেন তারা।
অভিযানের উদ্দেশ্য
এই কায়াকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা নদী ও হাওরের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, পরিবেশগত সংকট তুলে ধরা এবং স্থানীয় জনগণের জীবনসংগ্রাম, কৃষিনির্ভর জীবনব্যবস্থা ও সংস্কৃতির চিত্র সামনে আনার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে নদী ও হাওরের পরিবেশগত গুরুত্ব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।
অংশগ্রহণকারীরা
ইউরোপের ককেশাস পর্বতমালা এবং এশিয়ার হিমালয় অঞ্চলের বিভিন্ন অভিযানে অংশগ্রহণকারী পর্বতারোহী বাংলাদেশি ও চীনা অভিযাত্রী ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত এই সামাজিক উদ্যোগে অংশ নেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইতিহাস ও এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগ এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের চীনা ভাষা বিভাগের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিযাত্রী জুনায়েদ সরকার, মাহজাবিন আহমেদ, চীনা শিক্ষার্থী লিনজিং লিউ ও তামিং ওয়াং এবং পর্বতারোহী অভিযাত্রী নূর মুহাম্মদ, শামীম সাব্বির, ডা. শাহানাজ আক্তার, লুৎফা নূর ও হাসিবুল হাসান।
নদী-হাওরের গুরুত্ব
অংশগ্রহণকারীদের মতে, নদী ও হাওর রক্ষা মানে শুধু একটি জলাভূমি বা ভূপ্রকৃতি সংরক্ষণ করা নয়; বরং একটি জীবনব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখা। পাশাপাশি এই আয়োজন বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং পরিবেশ সংরক্ষণে তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
হাওর অঞ্চলের সংকট
বাংলাদেশের হাওর অঞ্চল ভৌগোলিকভাবে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এক বিস্তীর্ণ জনপদ। পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলো যেমন নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, তেমনি বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি গ্রামও নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নিজস্ব জীবনধারা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে। নদী এখানে কেবল পানির প্রবাহ নয়; বরং মানুষের জীবন, জীবিকা, কৃষি, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই নদীকেন্দ্রিক জনপদগুলো নানা সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিবছর নদীভাঙনের ফলে অসংখ্য গ্রাম, বসতভিটা ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নদীর নাব্যতা হ্রাস, পলি জমে নদীপথ সংকুচিত হওয়া এবং আগাম বন্যার কারণে হাওর অঞ্চলের কৃষকেরা প্রতিবছর ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষ করে বোরো ফসল ঘরে তোলার আগেই আকস্মিক বন্যা অনেক কৃষকের বছরের একমাত্র অবলম্বন ধ্বংস করে দেয়। ফলে হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবনসংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তাই নদী ও হাওর রক্ষা এখন শুধু পরিবেশগত নয়; বরং মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
সচেতনতা তৈরির ধারাবাহিক পদক্ষেপ হিসেবে ভবিষ্যতেও এই কায়াকিং কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং পরিসর আরও বিস্তৃত করা হবে বলে জানান অংশগ্রহণকারীরা।



