বহুবিবাহ: প্রাচীন ইতিহাস থেকে শরিয়তের নিয়ন্ত্রণে
বহুবিবাহ: প্রাচীন ইতিহাস থেকে শরিয়তের নিয়ন্ত্রণে

মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই পরিবার ও বিবাহব্যবস্থা বিভিন্ন রূপে বিকশিত হয়েছে। বহুবিবাহ, বিশেষ করে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ, এই দীর্ঘ সামাজিক বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। এটি কোনো একক ধর্ম বা সভ্যতার সৃষ্টি নয়, বরং প্রাচীন পৃথিবীর বহু সমাজে স্বীকৃত একটি বাস্তবতা, যার শিকড় হাজার হাজার বছর আগে প্রোথিত।

প্রাচীন সভ্যতায় বহুবিবাহের প্রচলন

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, মিশর, চীন ও ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক ইতিহাসে দেখা যায়, শাসক, গোত্রপ্রধান ও ক্ষমতাবানদের মধ্যে বহুবিবাহ ছিল সাধারণ একটি রীতি। ব্যাবিলনের আইনসংগ্রহেও এর স্বীকৃতি ছিল। ইহুদি ঐতিহ্যেও বহু নবী ও শাসকের একাধিক স্ত্রীর উল্লেখ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, বহুবিবাহ মানবসমাজে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত একটি সামাজিক কাঠামো।

ইসলামপূর্ব আরবে অনিয়ন্ত্রিত বহুবিবাহ

আরব উপদ্বীপে ইসলাম আগমনের পূর্বে এই প্রথা ছিল সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত। কেউ কেউ অসংখ্য স্ত্রী গ্রহণ করতেন, যার কোনো নির্দিষ্ট সীমা ছিল না। এই প্রেক্ষাপটে ইসলাম এসে এটিকে সীমাবদ্ধ করে এবং ন্যায়বিচারের শর্ত আরোপ করে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কুরআনের নির্দেশনা

কুরআনে বলা হয়েছে, 'তোমরা তোমাদের পছন্দমতো নারী থেকে দুই, তিন বা চার পর্যন্ত বিবাহ করো, কিন্তু যদি আশঙ্কা কর যে ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একটিতেই সীমাবদ্ধ থাকো।' (সুরা নিসা, আয়াত ৩) এই আয়াত বহুবিবাহকে সর্বোচ্চ চার জনে সীমাবদ্ধ করে এবং ন্যায়বিচারকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করে।

ইমামদের মতামত

প্রখ্যাত আলেম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) উল্লেখ করেন, শরিয়তের বিধান মানুষের প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিলেও তা ন্যায়বিচারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, একাধিক বিবাহ বৈধ হলেও অধিকাংশ মানুষের জন্য একটিই উত্তম, যদি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ঐতিহাসিক ঘটনা: আলী (রা.) ও ফাতিমা (রা.)

ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো, আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) যখন ফাতিমা (রা.) জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন নবীজি (সা.) এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এতে বোঝা যায় বৈধতা থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক ন্যায় ও মানসিক ভারসাম্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক বাস্তবতা ও বিধবা সুরক্ষা

সামাজিক বাস্তবতায় বহুবিবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিধবা নারী ও এতিমদের সুরক্ষা দেওয়া। তবে ইসলাম এটিকে কোনো বাধ্যতামূলক বা বিশেষ মর্যাদার কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেনি।

বিবাহ নয়, জ্ঞান ও তাকওয়াই মর্যাদার মাপকাঠি

ইতিহাসে বহু আলেম আছেন, যারা বিবাহই করেননি, যেমন ইমাম নববী (রহ.), ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.), ইমাম ইবনে জারীর তাবারী (রহ.), বিশর আল-হাফি (রহ.)। এতে প্রমাণিত হয় ধর্মীয় মর্যাদা নির্ভর করে জ্ঞান ও তাকওয়ার ওপর, বিবাহের সংখ্যার ওপর নয়।

উপসংহার

অতএব, বহুবিবাহ একটি প্রাচীন সামাজিক ব্যবস্থা, যা পূর্ব থেকেই চলে আসছে। ইসলাম এসে এটিকে সীমিত, শর্তযুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে।

তথ্যসূত্র: সূরা নিসা ৩, সহিহ বুখারি হাদিস নং ৩৭১৪, মাজমু‘ আল-ফাতাওয়া (ইমাম ইবনে তাইমিয়্যা রহ.), শরহ সহিহ মুসলিম (ইমাম নববী রহ.), তারীখ আত-তাবারী (ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারী রহ.)।