ইসলাম শুধু উপার্জনের নির্দেশ দেয়নি, বরং সেই উপার্জন যেন অবশ্যই হালাল হয় এবং হারামের প্রতিটি ছায়া থেকে মুক্ত থাকে, তার প্রতি কঠোর তাগিদ দিয়েছে। এটি মূলত ‘তাকওয়া’র অংশ। কারণ, হারামের সংমিশ্রণ ঘটলে মানুষের আমল কবুল হয় না এবং তার দোয়া আরশে পৌঁছায় না।
দোয়া কবুলের জন্য হালাল খাবার
একবার রাসুল (সা.)-এর সামনে কোরআনের এই আয়াতটি পাঠ করা হলো, “হে মানবজাতি, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে তা থেকে তোমরা ভক্ষণ করো” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮)। তখন সাহাবি সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আমাকে ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’ (যার দোয়া কবুল হয়) বানিয়ে দেন।’ নবীজি (সা.) তাকে চমৎকার একটি মূলনীতি শিখিয়ে দিলেন, “হে সাদ, তোমার খাবারকে পবিত্র (হালাল) করো, তবেই তুমি মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ হতে পারবে। সেই সত্তার কসম যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, বান্দা যখন তার পেটে এক লোকমা হারাম খাবার ফেলে, তখন ৪০ দিন পর্যন্ত তার কোনো আমল কবুল হয় না।” (তাবারানি, আল-আওসাত; যদিও এটি সনদের দিক থেকে দুর্বল, তবে এর মূল বক্তব্য সহিহ মুসলিমের ১০১৫ নম্বর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত)
হালাল উপার্জনের বহুমুখী সুফল
হালাল উপার্জন কেবল পরকালেই নয়, দুনিয়াতেও মানুষের জীবনে প্রশান্তি নিয়ে আসে। এর সুফলগুলো হলো:
- বিপদ-আপদ থেকে সুরক্ষা: হালাল খাবার মানুষের জীবন, সম্পদ এবং সন্তান সন্ততিকে বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা করে।
- ইবাদতে একাগ্রতা: হালাল রিজিক অন্তরকে আলোকিত করে, ফলে ইবাদতে স্বাদ পাওয়া যায়।
- সন্তানের সঠিক গঠন: হালাল উপার্জনে লালিত সন্তানরা নেককার হয়। যেমন—ইমাম বুখারি (র.)-এর পিতা মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন, ‘আমার উপার্জনে একটি দিরহামও (রৌপ্যমুদ্রা) সন্দেহজনক নেই।’
নিজের হাতের কামাই করা নবীদের সুন্নাহ
ইসলাম শ্রমের মর্যাদা দিয়েছে এবং ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, “নিজের হাতের উপার্জিত খাবারের চেয়ে উত্তম খাবার কেউ কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজের হাতের কামাই খেতেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৭২) অন্যত্র তিনি চারিত্রিক উৎকর্ষের চারটি নিশানার কথা বলতে গিয়ে ‘খাবারে পবিত্রতা’ বা হালাল উপার্জনকে অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ৬৬৫২)।
পরকালীন জবাবদিহি
কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষকে তার উপার্জনের উৎস সম্পর্কে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। নবীজি (সা.) সতর্ক করে বলেছেন, “কিয়ামতের দিন কোনো বান্দা তার স্থান থেকে এক কদমও নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে তার সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে—সে তা কোথা থেকে উপার্জন করেছে এবং কোন পথে ব্যয় করেছে?” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪১৭) যারা অবৈধভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করে, তাদের সম্পর্কে নবীজি (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যারা অন্যায়ভাবে আল্লাহর সম্পদ ভোগ করবে, কিয়ামতের দিন তাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১১৮)
কখন দোয়া কবুল হয় না
হারাম উপার্জন আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে জনৈক ব্যক্তির কথা উল্লেখ আছে, যে দীর্ঘ সফর করে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত, ধুলোবালি মাখা শরীরে দুই হাত তুলে ‘ইয়া রব, ইয়া রব’ বলে ডাকছে। দোয়া কবুল হওয়ার সব উপকরণ (সফর, ক্লান্তি, মিনতি) সেখানে বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও নবীজি (সা.) বললেন, “তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারামেই লালিত-পালিত হয়েছে; তবে কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে?” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫) সালাফদের (পূর্বসূরিদের) মতে, গোনাহ এবং হারাম উপার্জনের মাধ্যমে আমরা নিজেরাই আমাদের দোয়া কবুলের পথ বন্ধ করে দিই।
সারকথা
হালাল রিজিক কেবল পেট ভরার মাধ্যম নয়, এটি ইমানের অংশ। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দ্রুত ধনী হওয়ার নেশায় হারামে লিপ্ত হওয়া মানে নিজের ইহকাল ও পরকাল উভয়ই ধ্বংস করা। একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো অল্পে তুষ্ট থাকা এবং উপার্জনের প্রতিটি পয়সা হালাল কিনা তা নিশ্চিত করা।



