হারাম শরিফের পবিত্র স্থানসমূহ: হাজরে আসওয়াদ, হাতিম, জমজম ও আরাফাত
হারাম শরিফের পবিত্র স্থান: হাজরে আসওয়াদ, হাতিম, জমজম ও আরাফাত

সৌদি আরবের মক্কা নগরীর আরাফাতের ময়দানে হাজিরা অবস্থান করেন। হজ সম্পাদনের এলাকাকে হারাম শরিফ বলা হয়। পবিত্র মক্কা ও মদিনা নগরে অমুসলমানদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এখানে জীবজন্তু শিকার করা নিষিদ্ধ; এমনকি গাছপালা ও তৃণলতা ছেঁড়াও নিষেধ। হারাম এলাকার কেন্দ্র হলো মসজিদুল হারাম, যার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত কাবা শরিফ।

হাতিম ও মিজাবে রহমত

কাবা শরিফের উত্তর পাশের অর্ধবৃত্তাকার দেয়ালঘেরা স্থানকে ‘হাতিম’ বলা হয়। এই স্থান আগে কাবাঘরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখানে নামাজ পড়া মানে কাবাঘরের ভেতরে নামাজ পড়ার সমতুল্য। দোয়া কবুলের জন্য হাতিমকে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ স্থান মনে করা হয়। হাতিমের ঠিক ওপরে কাবা শরিফের ছাদের সঙ্গে একটি সোনার পরনালা রয়েছে। বৃষ্টির সময় এই পরনালা দিয়ে ছাদের পানি পড়ে। এ কারণে এর নাম ‘মিজাবে রহমত’।

হাজরে আসওয়াদ

‘হাজরে আসওয়াদ’ অর্থ কালো পাথর। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি একটি জান্নাতি পাথর, যা হজরত আদম (আ.)-এর সঙ্গে পৃথিবীতে আনা হয়েছিল। এই পবিত্র পাথরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৭ ইঞ্চি। বর্তমানে এটি কয়েকটি খণ্ডে বিভক্ত। এটি মাটি থেকে প্রায় চার ফুট উচ্চতায় কাবাঘরের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের দেয়ালের বহির্ভাগে স্থাপিত রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নবী করিম (সা.) অত্যন্ত বিনয় ও মহব্বতের সঙ্গে এই পাথর স্পর্শ ও চুম্বন করতেন। মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এটি স্পর্শ করা ও চুম্বন করা গুনাহ মাফ ও দোয়া কবুলের একটি উপলক্ষ। হাজরে আসওয়াদ ও কাবাঘরের দরজার মধ্যবর্তী স্থান ‘মুলতাজিম’ নামে পরিচিত। এ স্থানেও দোয়া কবুল হয় বলে বিশ্বাস করা হয়।

মাকামে ইব্রাহিম ও জমজম কূপ

কাবা শরিফের পূর্ব দিকে মাকামে ইব্রাহিমে যে পাথরটি সংরক্ষিত আছে, তার ওপর দাঁড়িয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) কাবাঘরের প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন বলে ইসলামি বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। সব ধরনের তাওয়াফের পর এই পবিত্র স্থানের পেছনে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা হয়। এই নামাজ ওয়াজিব। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৫)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পবিত্র কাবাঘরের পূর্ব দিকে মসজিদুল হারাম চত্বরেই জমজম কূপ অবস্থিত। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, শিশু হজরত ইসমাইল (আ.)-এর পদাঘাতে আল্লাহর কুদরতে মরুভূমিতে এই কূপের সৃষ্টি হয়েছিল। এর গভীরতা প্রায় ৬০ গজ এবং মুখের প্রশস্ততা প্রায় ৪ গজ। বর্তমানে তাওয়াফের স্থান সম্প্রসারণের কারণে জমজম কূপটি ঢাকা রয়েছে।

সাফা-মারওয়া ও সাঈ

মসজিদুল হারামের সংলগ্ন পূর্ব দিকে সাফা পাহাড় এবং পশ্চিম-উত্তর দিকে মারওয়া পাহাড় অবস্থিত। এই দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে বিবি হাজেরা (আ.) তাঁর শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-এর জন্য পানির সন্ধানে ব্যাকুলভাবে ছোটাছুটি করেছিলেন। সেই স্মৃতির স্মরণে হাজিরা এই দুই পাহাড়ের মধ্যে সাতবার যাতায়াত করেন, যাকে ‘সাঈ’ বলা হয়। সাঈ করা ওয়াজিব। (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৮)

আরাফাত ময়দান ও জাবালে রহমত

আরাফাত ময়দান একটি বিস্তীর্ণ ময়দান, যার আয়তন প্রায় ৩১ বর্গকিলোমিটার। খানায়ে কাবা থেকে আরাফাতের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার এবং মিনা থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার। ৯ জিলহজ হাজিদের আরাফাত ময়দানে অবস্থান করতে হয়। ‘আরাফাত’ শব্দের অর্থ পরিচয়। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, এখানে হজরত আদম (আ.) ও হজরত হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলন হয়েছিল এবং তাঁরা নিজেদের ভুলের জন্য আল্লাহ–তাআলার দরবারে দোয়া করেছিলেন, যা কবুল হয়েছিল। (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৭; সুরা আরাফ, আয়াত: ২৩)

জাবালে রহমত বা ‘করুণার পাহাড়’ আরাফাত ময়দানে অবস্থিত। এর উচ্চতা প্রায় ৩০০ ফুট। পাহাড়টির চূড়ায় একটি সাদা স্তম্ভ রয়েছে। প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, এখান থেকেই আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিদায় হজের ভাষণ দিয়েছিলেন। এই পাহাড় দৃষ্টিগোচর হলে লাব্বাইক ও দরুদ শরিফ পাঠ করা হয়।

মিনা, কোরবানি ও জামারাত

আল্লাহ–তাআলার আদেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে যে স্থানে কোরবানির জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই স্থানের নাম মিনা। মক্কা শরিফ থেকে মিনার দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। মিনার প্রান্তরে হজের আগের দিন এবং হজের পরবর্তী তিন দিন হাজিদের তাঁবুতে অবস্থান করতে হয়। এখানেই কোরবানি সম্পন্ন করা হয়।

মিনার পাশেই তিনটি জুমরা বা স্তম্ভ (বহুবচনে ‘জামারাত’) অবস্থিত। এগুলো হলো ছোট শয়তান (জুমরায়ে উলা), মধ্যম শয়তান (জুমরায়ে উসতা) এবং বড় শয়তান (জুমরায়ে আকাবা)। ইসলামি বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার পথে শয়তান এই স্থানগুলোতে বাধা সৃষ্টি করেছিল এবং হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাকে পাথর নিক্ষেপ করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই ঘটনার স্মরণে ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ হাজিরা এখানে কঙ্কর নিক্ষেপ করেন, যা ওয়াজিব।

লেখক: অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম।