সবার জীবনেই এমন মুহূর্ত আসে, যখন আমরা ঠিক বুঝতে পারি না আমাদের কী করা উচিত। হোক সেটা চাকরি ছেড়ে দেওয়া, নতুন চাকরি খোঁজা, কোথাও ঘুরতে যাওয়া, শপিং করতে যাওয়া, কারও সঙ্গে দেখা করা! মন চাচ্ছে এটা করতে; পরমুহূর্তে মনে হলো না করি। জীবন যেন নির্দিষ্ট একটি চক্রে ঘুরতে থাকে। মনে হয় জীবন এগোচ্ছে না, আবার পেছাচ্ছেও না; এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে। প্রবলভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে থাকি।
এমন মুহূর্তে কী করা উচিত? কীভাবে বুঝবেন আপনি আসলে কী করতে চান?
১. যেভাবে একটা কাজ করেন, প্রায় সব কাজ সেভাবেই করেন
এটি বৌদ্ধধর্মের একটি বিখ্যাত উক্তি। জীবন ‘কী’ এবং ‘কীভাবে’ এর মধ্যে ভাগ হতে পারে। ‘কী’ হলো আমাদের প্রতিদিনের জীবনের কনটেন্ট—লাঞ্চে আমরা কী খাব, সিদ্ধান্ত নেওয়া বা চাকরিতে জয়েন করার মতো। ‘কীভাবে’ হলো প্রক্রিয়া—লাঞ্চে আপনি কী খাবেন সেটা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবেন বা চাকরিতে কাজ করার মতো।
উক্তিটি মূলত বলছে, কীভাবে আপনি সমস্যা মোকাবিলা করেন, সিদ্ধান্ত নেন, চাপ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মেনে জীবন পরিচালিত করেন। ধরা যাক, আপনার অতিরিক্ত আবেগ বা যেকোনো কিছুতে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন; অথবা খুব বেশি সতর্ক হয়ে পড়েন, ভুল করার ভয় বা অন্যকে কষ্ট দেওয়ার ভয় আপনাকে আটকে রাখে। হয়তো সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলায়; কিন্তু আপনার কাজ করার ধরন প্রায় একই থাকে।
করণীয় কী?
আপনি ‘কীভাবে কাজ করেন’—এটাই অনেক সময় আপনার দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া বা অতিরিক্ত ভয়, যা আপনার জীবনকে সীমাবদ্ধ করে বা খারাপ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়। একটু ভাবুন, কোন জিনিসটা বারবার আপনাকে সমস্যায় ফেলে, সেই সমস্যা থেকে কী শিখলেন। সেই একটি জিনিস বদলাতে পারলে আপনার জীবনও বদলে যাবে।
২. অনেক সময় সমস্যাগুলোর ভুল সমাধান হয়
আপনি যখন অন্য কারও মধ্যে বা নিজের মধ্যে কোনো সমস্যা দেখেন, সেটা অনেক সময় আসল সমস্যার সমাধান করার একটা ভুল উপায়ের ফল হতে পারে। যেমন আপনার রুমমেট হয়তো বাসার কাজ ফেলে রাখে, আপনি নিজেও একই কাজ করেন; সে হয়তো সিগারেট খায়, আপনি ফোনে জোরে কথা বলেন। সে হয়তো খাওয়ার পর প্লেট পরিষ্কার করে না, আপনি রুম ঝাড়ু দেন না।
দেখতে এগুলো সমস্যা মনে হলেও, আসলে আপনি ভুল জায়গায় মনোযোগ দিচ্ছেন। কাজ ফেলে রাখা আসলে সেই কাজ করার অনিচ্ছা বা কাজের চাপ সামলাতে না পারার একটা ‘ভুল উপায়’। আবার সিগারেট খাওয়া অনেক সময় দুশ্চিন্তা বা বিষণ্নতা সামলানোর একটি ভুল সমাধান।
করণীয় কী?
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—আপনি নিজের মধ্যে বা অন্য কারও মধ্যে যে সমস্যা দেখছেন, সেটা কি আসলে আরও গভীর কোনো সমস্যার ওপর থাকা শুধু বাইরের স্তর। তাহলে সত্যিকারের সমস্যাটা খুঁজে বের করে সেটার সমাধান করার চেষ্টা করুন।
৩. অস্পষ্ট জায়গা বা ফাঁকগুলো খুঁজে বের করা
আপনি যদি একটি কমলালেবুর ছবি দেখেন, তাহলে কমলালেবুটি হলো প্রধান বা পজিটিভ অংশ, আর তার চারপাশের ফাঁকা জায়গা বা ব্যাকগ্রাউন্ড হলো নেগেটিভ স্পেস।
একজন থেরাপিস্ট যখন প্রথমবার কোনো ক্লায়েন্টের সঙ্গে বসেন, তখন তিনি শুধু যা বলা হচ্ছে তা-ই শোনেন না, বরং কী বলা হচ্ছে না, সেটাও খেয়াল করেন। অর্থাৎ ফাঁক বা অস্পষ্ট জায়গাগুলোও দেখেন। যেমন কেউ যদি ডিভোর্স নিয়ে কথা বলার সময় কেবল পার্টনারের দোষ নিয়েই কথা বলে, কিন্তু নিজের দোষ বলে না—এটাই হলো অস্পষ্ট জায়গা বা ফাঁক। এই না বলা বিষয়গুলোই অনেক সময় সমাধানের পথ আটকে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত এগুলো নিয়েই কাজ করতে হয়।
করণীয় কী?
আপনি নিজের জীবনে এমন কোন কোন অস্পষ্টতার জায়গা রেখেছেন? কোন বিষয়গুলো নিয়ে কখনো কথা বলেন না বা বলতে চান না? কোন অনুভূতিগুলো খুব কম প্রকাশ করেন বা করতে চান না? কোন আচরণগুলো এড়িয়ে চলেন এবং কেন? যদি ধীরে ধীরে এসব বিষয়কে জীবনে জায়গা দেন, তাহলে আপনার জীবন কীভাবে বদলে যেতে পারে?
৪. জীবনে ভুল কিছু নেই আসলে
আমরা এমন অনেক মানুষকে চিনি, যাঁরা সবকিছু পারফেক্টভাবে করতে চান। তাঁরা ছোট ছোট ভুলের জন্যও নিজেকেই দোষ দেন। এর ফলে এ ধরনের মানুষেরা প্রায়ই হতাশায় ভোগেন বা উদ্বেগে থাকেন। কারণ, তাঁরা নিজের নির্ধারিত চাহিদা কখনোই পূরণ করতে পারেন না।
সাধারণত এই চাহিদাগুলো তাঁদের নিজের তৈরি নয়; এগুলো আসে মা–বাবা, কোনো কর্তৃপক্ষ বা প্রভাবশালী মানুষের কাছ থেকে। ভালো জীবন কেমন হওয়া উচিত, সেই ধারণা তাঁরা চাপিয়ে দেন। কিন্তু জীবন আসলে একধরনের শেখার প্রক্রিয়া; যেখানে ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। নতুন কিছু শেখা; যেমন আঁকা, ক্যারিয়ার বা জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই ভুল একটি অংশ। একটি কথা আছে—জ্ঞান আসে অভিজ্ঞতা থেকে আর অভিজ্ঞতা আসে ভুল থেকে।
করণীয় কী?
ভুল হতেই পারে। এটা স্বাভাবিক। তাই ভুল করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা শিখুন। নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত চেষ্টা ও দুশ্চিন্তা কমাতে হবে। নিজের ভেতরের কঠোর সমালোচনামূলক কণ্ঠটাকে ধীরে ধীরে শান্ত করুন। এর বদলে নিজেকে শেখার সুযোগ দিন এবং নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হন।
৫. সৎ থাকা
সততা হলো সবচেয়ে বড় সমাধান। যখন আপনি বুঝতে পারবেন না কী করবেন, তখন সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নিজের ও অন্যের প্রতি সৎ থাকা। অর্থাৎ দোষ শুধু নিজের ঘাড়ে না নেওয়া বা সব সময় ক্ষমা না চাওয়া, আবার নিজের সমস্যাগুলো অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও নয়। সততা মানে হলো আপনার যা ভাবনা, যা ইচ্ছা এবং যা বিশ্বাস, তা সাহস করে প্রকাশ করা। নিজের কথা স্পষ্টভাবে বলা, ভয় পেয়ে সবকিছু মেনে না নেওয়া এবং নিজের বাউন্ডারি ঠিক করে দেওয়া।
করণীয় কী?
আগের সব ধারণাকে একসঙ্গে প্রয়োগ করতে হবে। যেমন সমস্যার পেছনের আসল কারণ খুঁজে বের করা, আপনি যা পারেন না তা স্বীকার করা, ভুল করতে শেখা এবং অন্যের অনুভূতির প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া; কিন্তু তাঁদের খারাপ আচরণকে সমর্থন না করা।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে



