যে ২ কারণে মানুষের পতন ঘটে: হাদিসের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
যে ২ কারণে মানুষের পতন ঘটে: হাদিসের আলোকে শিক্ষা

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন বাহ্যিক প্রাচুর্য থাকলেও ভেতরটা শূন্য লাগে। সংখ্যায় আমরা অনেক, সম্পদেও কমতি নেই, কিন্তু কোথায় যেন শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। এই আত্মিক দুর্বলতা তথা মানুষের পতনের কারণ কী—সে প্রশ্নের উত্তর বহু আগেই আমাদের সামনে তুলে ধরেছিলেন প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। তাঁর এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হাদিস আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়।

হাদিসের বাণী ও ব্যাখ্যা

হজরত সাওবান (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—"يُوشِكُ الأُمَمُ أَنْ تَدَاعَى عَلَيْكُمْ كَمَا تَدَاعَى الأَكَلَةُ إِلَى قَصْعَتِهَا"। কেউ জিজ্ঞাসা করল, ‘তখন কি আমরা সংখ্যায় কম থাকব?’ তিনি বললেন, ‘না, বরং তোমরা তখন অনেক হবে, কিন্তু তোমরা হবে স্রোতের ফেনার মতো (দুর্বল)... এবং আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ‘ওহান’ ঢুকিয়ে দেবেন।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘ওহান কী?’ তিনি বললেন, ‘দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা।’ (আবু দাউদ ৪২৯৭)

‘ওহান’— একটি আত্মিক ব্যাধি

এই হাদিসে ‘ওহান’ শব্দটি আমাদের অন্তরের এমন এক রোগের দিকে ইঙ্গিত করে যা মানুষকে দুর্বল করে দেয়। মানুষের পতন শুরু হয় এর দুটি মূল দিক থেকে—

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • দুনিয়ার প্রতি অতি ভালোবাসা: যখন মানুষের হৃদয় দুনিয়ার মোহে ডুবে যায়— অর্থ, আরাম, খ্যাতি ও বিলাসিতাই হয়ে ওঠে জীবনের লক্ষ্য—তখন সে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হয় এবং পতনের অতল গহবরে ডুবতে থাকে।
  • মৃত্যুকে ভয় করা: মৃত্যুর ভয় মানুষকে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেয়। ত্যাগ, কুরবানি এবং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে যায়। এটি মানুষের মূল পতনের কারণ।

কুরআনের আলোকে সতর্কতা

আল্লাহ তাআলা বলেন—"اِعۡلَمُوۡۤا اَنَّمَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَا لَعِبٌ وَّ لَهۡوٌ وَّ زِیۡنَۃٌ وَّ تَفَاخُرٌۢ بَیۡنَكُمۡ وَ تَكَاثُرٌ فِی الۡاَمۡوَالِ وَ الۡاَوۡلَادِ ؕ كَمَثَلِ غَیۡثٍ اَعۡجَبَ الۡكُفَّارَ نَبَاتُهٗ ثُمَّ یَهِیۡجُ فَتَرٰىهُ مُصۡفَرًّا ثُمَّ یَكُوۡنُ حُطَامًا ؕ وَ فِی الۡاٰخِرَۃِ عَذَابٌ شَدِیۡدٌ ۙ وَّ مَغۡفِرَۃٌ مِّنَ اللّٰهِ وَ رِضۡوَانٌ ؕ وَ مَا الۡحَیٰوۃُ الدُّنۡیَاۤ اِلَّا مَتَاعُ الۡغُرُوۡرِ" (সুরা আল-হাদীদ: আয়াত ২০)। অর্থাৎ দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, পারস্পরিক গর্ব-অহঙ্কার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা বৃষ্টির মতো, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদের আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, হলুদ বর্ণের হয়, শেষে খড়-কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আযাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। দুনিয়ার জীবন ধোকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।

হৃদয়ের জন্য কিছু শিক্ষা

এই হাদিস আমাদের শেখায়—সংখ্যা বা বাহ্যিক শক্তি নয়, প্রকৃত শক্তি আসে ঈমান, আত্মত্যাগ ও আল্লাহর ওপর ভরসা থেকে। দুনিয়াকে ভালোবাসা নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু সেটাই যদি জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে যায়, তখনই তা আমাদের দুর্বল করে দেয় এবং জীবনের চূড়ান্ত পতন ডেকে আনে। আজকের এই ব্যস্ত ও ভোগবাদী সময়ে নিজেদের দিকে তাকালে হয়তো এই হাদিসের প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। তাই প্রয়োজন আত্মসমালোচনার— আমাদের হৃদয় কি দুনিয়ার মোহে আবদ্ধ হয়ে গেছে? আমরা কি সত্যের পথে দাঁড়ানোর সাহস হারিয়ে ফেলছি? আমরা কি জীবনের চূড়ান্ত অধপতনের দিকে ধাবিত হচ্ছি?

আসুন, আমরা দুনিয়াকে প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, আর আখিরাতকে করি আমাদের মূল লক্ষ্য। হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করি ‘ওহান’ থেকে—তাহলেই ফিরে আসবে সেই হারানো শক্তি, ইনশাআল্লাহ।