মদিনার প্রান্তরে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল। পণ্যে বোঝাই সাতশো উট একসঙ্গে শহরে প্রবেশ করছে। উৎসুক হয়ে উঠল মানুষ। এত উটের শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল জনপদ। চারপাশ থেকে ভিড় জমাল মানুষ। সবার একটাই প্রশ্ন—এ কার কাফেলা?
উত্তর এল, আব্দুর রহমান ইবনে আউফের। মাত্র বছর কয়েক আগেই যিনি মদিনায় পা রেখেছিলেন সম্পূর্ণ শূন্য হাতে। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/৫০)
হিজরতের পর ভ্রাতৃত্ব
হিজরতের পর রাসুল (সা.) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করে দিয়েছিলেন। সে সূত্রে আব্দুর রহমানের ভাই হলেন আনসার সাহাবি সাদ ইবনে রবি। সাদ বললেন, ‘ভাই, আমি মদিনার সবচেয়ে সম্পদশালীদের একজন। আজ থেকে আমার সম্পদের অর্ধেক তোমার। এমনকি আমার দুই স্ত্রীর মধ্যে যাকে তোমার পছন্দ হয় বলো, তাকে তালাক দিই। তুমি বিয়ে করে নাও।’
আব্দুর রহমান হাসলেন। বললেন, ‘আল্লাহ তোমার সম্পদে বরকত দিন। আমার কিছু লাগবে না ভাই। তুমি শুধু আমাকে বাজারের পথটা দেখিয়ে দাও’। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৭৮০)
সততাই ছিল আসল পুঁজি
পরদিন থেকেই তিনি নেমে গেলেন ব্যবসায়। ঘি ও পনির নিয়ে বেচাকেনা শুরু। কিছুদিনের মধ্যে লাভ। লাভ থেকে আবার বিনিয়োগ। ধীরে ধীরে পরিধি বড় হলো এবং বাড়তে থাকল সম্পদ।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আব্দুর রহমান ইবনে আউফের ব্যবসায়িক দক্ষতা ছিল অসাধারণ। তবে এটাও সত্য যে শুধু বুদ্ধিমত্তা নয়, সততাই ছিল তাঁর আসল পুঁজি। ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ কখনো প্রতারিত হতেন না তাঁর কাছে। একসময় এমন হলো, তাঁর কাফেলা মদিনার বাজারে এলেই সাড়া পড়ে যেত পুরো শহরে। (আল-ইসাবা ফি তামিইজিস সাহাবা, ২/৯৯১)
দুনিয়ার প্রতি ভয়
এক সন্ধ্যায় তাঁর সামনে খাবার রাখা হলো। নানা পদের বাহারি আয়োজন। সুন্দর পরিবেশনা। কিন্তু হঠাৎ তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। কেউ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘মুসআব ইবনে ওমায়ের (ইসলাম গ্রহণের আগে মক্কার সবচেয়ে আয়েশি ব্যক্তি ছিলেন) যখন শহিদ হয়েছিলেন, তখন তাঁর শরীর ঢাকার মতো কাপড়ও ছিল না। আর আজ আমাদের সামনে এত আয়োজন। আমার ভয় হচ্ছে, দুনিয়ার পুরস্কার বুঝি আমাদের আগেই দিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’ (উসদুল গাবা ফি মারিফাতিস সাহাবা, ৩/৩১৩)
অথচ তিনি ছিলেন দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ পেয়ে যাওয়া ১০ সাহাবির একজন (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৪৭)
যে দান দেখে মদিনাবাসী অবাক
দানের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সীমাহীন উদার। একবার একসঙ্গে চল্লিশ হাজার দিনার দান করে দিলেন। আরেকবার পাঁচশত ঘোড়া ও দেড় হাজার উট আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দিলেন। আরেকবার তো জমি বিক্রি করে পাওয়া চল্লিশ হাজার দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) তৎক্ষণাৎ তিনি রাসুলের স্ত্রীদের এবং দরিদ্র ও অসহায় মুমিনদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। (সুনানুত তিরমিজি, হাদিস: ৩৭৫০)
জীবনের শেষ দিকেও থেমে যায়নি তাঁর দান। মৃত্যুর আগে অসিয়ত করলেন—আল্লাহর রাস্তায় পঞ্চাশটি ঘোড়া এবং সম্মানিত বদরি সাহাবিদের প্রত্যেককে যেন একশত স্বর্ণমুদ্রা করে দেওয়া হয়।
আয়েশা (রা.) তাঁর এই দান পেয়ে বললেন, ‘নবীজি তাঁর ব্যাপারে সুসংবাদ শুনিয়েছেন যে তিনি হামাগুড়ি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন।’ আয়েশা (রা.) তখন তাঁর জন্য দোয়া করলেন, ‘আল্লাহ যেন তাঁকে দৌড়ে জান্নাতে যাওয়ার তাওফিক দান করেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, ৬/১১৫)
জীবনের শেষ দিকেও থেমে যায়নি তাঁর দান। মৃত্যুর আগে অসিয়ত করলেন—আল্লাহর রাস্তায় পঞ্চাশটি ঘোড়া এবং সম্মানিত বদরি সাহাবিদের প্রত্যেককে যেন একশত স্বর্ণমুদ্রা করে দেওয়া হয়। এমনকি আস্ত একটি বাগান চার লক্ষ দিরহামে (রৌপ্যমুদ্রা) বিক্রি করে তার সবটাই বিলিয়ে দিলেন আল্লাহর রাস্তায়।
শেষ জীবন
এই মহান সাহাবি ইন্তেকাল করেন হিজরি ৩১ সনে। তৃতীয় খলিফা ওসমান (রা.)-এর ইমামতিতে জানাজার নামাজ শেষে তাঁকে জান্নাতুল বাকিতে কবরস্থ করা হয়। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত এই ধনী সাহাবির জীবন আমাদের শেখায়, হালাল উপায়ে সম্পদ উপার্জন দোষের নয়। বরং দোষ হলো হারাম পথে কামানো এবং ইসলামকে ভুলে গিয়ে সম্পদের অনুগামী হয়ে পড়া।
মদিনায় এসে তিনি শূন্য হাতে শুরু করেও জীবনসায়াহ্নে রেখে গেছেন কোটি টাকার সম্পদ। কিন্তু এত কিছুর মাঝেও তিনি আল্লাহর এত বেশি নৈকট্য অর্জন করেছেন যে দুনিয়ায় থাকতেই পেয়ে গেছেন বেহেশতের আগাম সুসংবাদ।



