মৃত্যুর পর আপনজনদের করণীয়: ইসলামিক নির্দেশনা
মৃত্যুর পর আপনজনদের করণীয়: ইসলামিক নির্দেশনা

মৃত্যু একটি কঠিন বাস্তবতা, যা থেকে কারও পলায়ন সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত সময় লিখে রেখেছেন, যা কেউ এড়িয়ে যেতে পারে না। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, 'তাদের মৃত্যুর নির্ধারিত সময় যখন উপস্থিত হয় তখন তারা তা এক মুহূর্তও বিলম্বিত করতে পারবে না, এমনকি মুহূর্তকাল ত্বরান্বিতও করতে পারবে না।' (সুরা নাহল: আয়াত ৬১) নির্ধারিত সময়েই সবার মৃত্যু হবে। এখানে আমাদের কিছুই করার নেই। বরং আমাদের করণীয় হলো মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফন ও জানাজা সম্পন্ন করা। মৃত ব্যক্তিকে সুন্দরভাবে গোসল করিয়ে কাফন পরিয়ে জানাজার নামাজ আদায় করে দাফন করা। মাটি থেকেই মানুষের সৃষ্টি, দুনিয়ার জীবন শেষে মাটিতেই তার শেষ গন্তব্য। কুরআনে বলা হয়েছে, 'আমি তোমাদেরকে তা (অর্থাৎ মাটি) থেকেই সৃষ্টি করেছি, তাতেই আবার তোমাদের আমি ফিরিয়ে নেব এবং তা থেকেই পুনরায় তোমাদের জীবিত করব।' (সুরা ত্বহা: আয়াত ৫৫)

দ্রুত দাফন সম্পন্ন করা

শরিয়তের নির্দেশনা হলো, কেউ মারা গেলে দ্রুত তাকে দাফন করা। নানা কারণে দাফন বিলম্বিত হয়—দূরের আপনজনের অপেক্ষায়, অধিক মুসল্লির অংশগ্রহণের জন্য, বা মৃতদেহ অন্য কোথাও নেওয়ার প্রয়োজনে। কিন্তু হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমরা মৃতব্যক্তির জানাজা-দাফন ইত্যাদি দ্রুত করো। সে যদি নেককার মানুষ হয় তবে তার জন্য কল্যাণ ও পুরস্কার রয়েছে, তোমরা তাকে সেই কল্যাণের দিকেই এগিয়ে দিলে। আর যদি সে এমন না হয়, তবে (দাফনের মাধ্যমে) তোমরা তোমাদের ঘাড় থেকে মন্দকে নামিয়ে দেবে।' (বুখারি ১৩১৫) আরেক হাদিসে তিনি বলেন, 'হে আলী! তিনটি জিনিস বিলম্বিত করো না—নামাজ যখন সময় হয়, জানাজার নামাজ এবং উপযুক্ত পাত্র পাওয়া গেলে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া।' (তিরমিজি ১০৭৫)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জানাজায় উপস্থিত হওয়া

জানাজার নামাজ ফরজে কেফায়া, কিছু মানুষ পড়লেই দায়িত্ব আদায় হয়। তবে এটি মূলত দোয়া, মৃতের জন্য জীবিতদের দোয়া এবং এক মুসলমানের প্রতি অন্য মুসলমানের হক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'মুসলমানের ওপর মুসলমানের হক পাঁচটি—সালামের জবাব দেওয়া, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া, জানাজা ও দাফনে শরিক হওয়া, নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা এবং হাঁচির জবাব দেওয়া।' (বুখারি ১২৪০) জানাজার নামাজের পর দাফনের পর্ব। যারা জানাজার নামাজে অংশ নেয় তাদের জন্য এক কিরাত এবং দাফন পর্যন্ত থাকলে দুই কিরাত সওয়াব রয়েছে, যা দুটি বড় পাহাড়ের সমতুল্য। (বুখারি ১৩২৫)

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দাফনপরবর্তী সময়ে মৃতের অধিকার

দোয়া ও ইস্তেগফার

দাফনের পরপরই কবরের প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) এক দাফনের পর বলেছিলেন, 'তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ইস্তিগফার করো এবং তার জন্য প্রার্থনা করো—সে যেন সত্যের ওপর অবিচল থাকে। এখন তো তাকে প্রশ্ন করা হবে।' (আবু দাউদ ৩২২৩) তাই দাফনের পর মৃতের জন্য দোয়া করা, তার সুওয়াল-জবাব সহজ হওয়ার জন্য প্রার্থনা করা জীবিতদের কর্তব্য। আরেক হাদিসে এসেছে, 'মানুষ যখন মারা যায় তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, ব্যতিক্রম তিনটি—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেককার সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।' (মুসলিম ১৬৩১)

ওসিয়ত ও দেনা পরিশোধ

মৃতের দেনা তার সম্পদ থেকে পরিশোধ করতে হবে এবং ওসিয়ত সম্পদের এক তৃতীয়াংশ থেকে আদায় করতে হবে। এক সাহাবি হজ না করেই মারা গেলে তার ছেলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'তোমার বাবার যদি ঋণ থাকত, তবে কি তুমি তা আদায় করতে?' সাহাবি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, 'তবে আল্লাহর ঋণ আদায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ।' (নাসাঈ ২৬৩৯) অনুরূপভাবে, কোনো নারী সাহাবির মা হজের মান্নত করে তা আদায় না করেই মারা গেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন, 'তুমি তার পক্ষ থেকে হজ আদায় করো। তোমার মায়ের ঋণ থাকলে তুমি কি তা আদায় করতে না? আল্লাহর ঋণ আদায় করো।' (বুখারি ১৮৫২)

ঈসালে সওয়াব

মৃতের জন্য দান-সদকা, কুরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, রোজা, কুরবানি ও হজ করা যায়। দুনিয়ায় কেউ চিরস্থায়ী নয়, আখেরাতই আসল গন্তব্য। সেখানকার জীবন সুন্দর করার জন্য উপরোক্ত বিষয়গুলো সহায়ক। যার সঙ্গে সম্পর্ক যেমন, তার প্রতি অধিকারও তেমন। এ অধিকার আদায়ে যত্নবান হতে হবে।