মহানবী (সা.)-এর অনাড়ম্বর জীবনযাপনের শিক্ষা
মহানবী (সা.)-এর অনাড়ম্বর জীবনযাপনের শিক্ষা

মানব ইতিহাসে এমন অসংখ্য মহান ব্যক্তি আছেন, যাঁরা ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির চূড়ায় আরোহণ করেছেন। কিন্তু এই উচ্চতায় থেকেও যিনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সরলতা, সংযম ও অনাড়ম্বরতা বজায় রেখেছেন, তিনি হলেন মহানবী মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর জীবন সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য একটি অনুপম আদর্শ হিসেবে বিবেচিত। নিচে তাঁর অনাড়ম্বর জীবনযাপনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো।

দুনিয়াবিমুখতা

নবীজির জীবন ছিল অত্যন্ত সরল ও দুনিয়াবিমুখ। জাগতিক চাকচিক্য, বিলাসিতা বা আরাম-আয়েশকে তিনি কখনো নিজের জীবনের লক্ষ্য করেননি। বরং দুনিয়াকে একটি অস্থায়ী আবাসস্থল হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর কাছে দুনিয়া ছিল শুধু আখেরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র। হিজরতের পর মদিনায় রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার পরও তাঁর জীবনে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাঁর শয্যা ছিল খেজুর পাতার তৈরি, যা শরীরে দাগ ফেলে দিত। ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন তিনি নবীজি (সা.)-এর ঘরে উপস্থিত হলেন। তখন নবীজি খেজুর পাতার চাটাইয়ের ওপর শুয়েছিলেন। ওমর (রা.) দেখলেন তাঁর পিঠে চাটাইয়ের দাগ বসে গেছে। এটা দেখে তিনি কেঁদে ফেললেন। নবীজি (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কাঁদছ কেন, উমর?’ তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমি কেন কাঁদব না? কিসরা (পারস্য সম্রাট) ও কায়সারের (রোম সম্রাট) বাদশাহরা কত আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন করছে, অথচ আল্লাহর নবি এবং তাঁর মনোনীত প্রিয় বান্দা হওয়া সত্ত্বেও আপনার পার্থিব সামগ্রী হচ্ছে এই, এই।’ রাসুল (সা.) একথা শুনে বললেন, ‘হে ওমর, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে আমাদের জন্য রয়েছে আখেরাতের সুখ আর তাদের জন্য দুনিয়ার?’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪৭৯)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খাদ্যে সংযম ও অল্পে তুষ্টি

খাদ্যাভ্যাসে রাসুল (সা.) ছিলেন অত্যন্ত সংযমী। মাঝে মাঝে নবীজি (সা.)-এর ঘরে দীর্ঘদিন চুলা পর্যন্ত জ্বলত না। নবী–পরিবারের সবাই খেজুর ও পানি খেয়েই দিনাতিপাত করতেন। আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘আমাদের (নবি পরিবারের) ওপর কখনও এমনও দিন আসত, যখন মাসাধিককাল পর্যন্ত চুলায় আগুন জ্বলত না। আমরা খেজুর ও পানি খেয়ে জীবনধারণ করতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৫৮)। যবের রুটি ও সামান্য দুধ ছিল মহানবির খাবারের সাধারণ চিত্র। তিনি কখনো খাবার নিয়ে অভিযোগ করতেন না। যা সামনে থাকত, তা-ই গ্রহণ করতেন। কোনো খাবার পছন্দ না হলে তা খেতেন না, কিন্তু কখনো খারাপ বলতেন না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পোশাক-আশাকে সরলতা

নবীজির পোশাক ছিল অত্যন্ত সাধারণ। এতে কোনো জাঁকজমক কিংবা বিলাসিতার উপকরণ ছিল না। পোশাকগুলো হতো সহজলভ্য। তিনি স্বাভাবিকভাবে সাদা বা সাধারণ রঙের কাপড় পরতেন। কখনো খুব দামি বা আড়ম্বরপূর্ণ পোশাকের প্রতি আকৃষ্ট হননি। প্রায়শই নিজের কাপড় নিজেই সেলাই করে পরতেন। আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) নিজেই নিজের কাপড় সেলাই করতেন এবং জুতা মেরামত করতেন। ঘরের ভেতর একজন সাধারণ মানুষ যেমন কাজ করে, তিনিও তাই করতেন।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৫৩৯)

সাধারণ বাসস্থান

নবীজির বাসস্থান ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও ছোট। ঘরগুলো ছিল কাঁচা ইট ও খেজুর পাতার তৈরি। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি নবীজির সামনে (নামাজের জায়গায়) শুয়ে থাকতাম, আমার পা তাঁর সেজদার স্থানে পড়ে থাকত। তিনি সেজদায় গেলে আমাকে ইশারা করতেন, তখন আমি পা সরিয়ে নিতাম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৮২)

সম্পদের প্রতি অনাগ্রহ

রাসুল (সা.) কখনো দুনিয়াবি সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হননি। তিনি যা পেতেন, তা দ্রুত আল্লাহর পথে ব্যয় করে দিতেন। নবীজির ঘরে কোনো বিলাসবহুল আসবাবপত্র বা সাজসজ্জা ছিল না। এমনকি তাঁর ঘরের দরজাও ছিল খুব সাধারণ। ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘একবার আমি নবীজির ঘরে প্রবেশ করে চারদিকে তাকালাম। আল্লাহর কসম, এমন কোনো জিনিস চোখে পড়েনি, যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৯১)

নবীজির অনাড়ম্বর জীবন আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। যদি আমরা তাঁর এই জীবনাদর্শ অনুসরণ করতে পারি, তবে আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবন হবে আরও সুন্দর ও কল্যাণময়।