প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বহু দুঃখদুর্দশা ও জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ৪০ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন। নির্জনতা তার প্রিয় হয়ে উঠল, পার্থিব দুনিয়ার জঞ্জাল অসহ্য মনে হল তার কাছে। নিরবে নিভৃতে ধ্যান মগ্ন হলেন হেরা গুহায়। নিস্তব্ধে রবের স্মরণে সময় অতিবাহিত করেন সেখানে।
হেরা গুহায় ওহি লাভ
মহীয়সী রমণী খাদিজা (রা.) মাঝেমধ্যে সেই নির্জন গুহায় গিয়ে তার খোঁজ নিতেন। প্রিয় স্বামীর জন্য খাদ্য ও পানীয় নিয়ে উপস্থিত হতেন সেই ঐতিহাসিক গুহায়। এভাবেই গুহায় ইবাদত অবস্থায় নবীজির দিনাতিপাত হতে থাকে। হঠাৎ একদিন ফেরেশতাদের সরদার জিবরাইল (আ.) বড় ভারি বাণী নিয়ে উপস্থিত হলেন সৃষ্টির সরদার মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর সমীপে।
জিবরিল (আ.) হেরা পর্বতে এসে নবীজিকে (সা.) বললেন, 'পড়ুন!' আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আমি তো পড়তে পারি না! নবীজি (সা.) বলেন, ফেরেশতা তখন আমাকে ধরে এমন জোরে চাপ দিলেন যে, তাতে আমি প্রবল কষ্ট অনুভব করলাম। তারপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, 'পড়ুন!' আমি বললাম, আমি তো পড়তে পারি না। তখন দ্বিতীয়বার তিনি আমাকে ধরে আবারও খুব জোরে চাপলেন। এবারও আমি ভীষণ কষ্ট অনুভব করলাম। এরপর তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, 'পড়ুন!' এবারও আমি বললাম, আমি পড়তে পারি না। ফেরেশতা তৃতীয়বার আমাকে দৃঢ়ভাবে চেপে ধরলেন। এবারও আমি অত্যন্ত কষ্ট অনুভব করলাম। ফেরেশতা আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললেন, 'পড় তোমার রবের নামে; যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পড়, আর তোমার রব মহামহিম। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে তা শিক্ষা দিয়েছেন, যা সে জানত না।' (সুরা আলাক: ১-৫)
নবুয়তের দায়িত্ব ও দাওয়াত
নবুয়ত ও রিসালতের মহান দায়িত্ব লাভের পর নবীজি স্থবির হয়ে বসে থাকেননি। 'উঠুন এবং সতর্ক করুন' রবের এই মহান আদেশ পালনে ধনী-গরীব, ছোট-বড় নির্বিশেষে সকলকে আহ্বান করতে লাগলেন তাওহিদের দিকে। হেরার সেই ঐশী আলো ছড়িয়ে পড়ল দেশ হতে দেশান্তরে। সত্যের বাণী মানুষের দ্বারে পৌঁছে দিতে সর্বপ্রথম তিনি তার নিকটাত্মীয় ও বিশ্বস্তজনদের দাওয়াত দিলেন। তারা ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলে তিনি সাফা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মক্কাবাসীকে এক আল্লাহর আনুগত্যের আহ্বান জানালেন। তবে সবাই তার সেই আহ্বানে সাড়া দিল না। যারা তার দাওয়াতে ইমান আনলেন, তারা ধন্য হলেন সাহাবি হিসেবে।
নির্যাতন ও ধৈর্য
মক্কি জীবনে অধিকাংশ মানুষ নবীজির দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে, নানাভাবে তার প্রতি অমানবিক নির্যাতন শুরু করল, যেন তিনি সত্যের পথ ছেড়ে দেন এবং তাদের পূর্বপুরুষদের পৌত্তলিক ধর্ম নিয়ে মন্তব্য না করেন। কিন্তু নবীজি ছিলেন তার সংকল্পে অবিচল। নিজ মিশন নিয়ে ছুটে চলছেন দুর্বার। স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চাঁদ এনে দিলেও আমি এই মহাসত্য প্রচার থেকে বিরত হব না। মক্কার কাফেররা তার এ জবাবে নিরুপায় হয়ে নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিল। এমনকি দীর্ঘ তিন বছর রাসুল (সা.) ও তার গোত্রকে অবরুদ্ধ করে রাখে। অত্যাচার-নির্যাতনের এই কঠিন দিনগুলোতে নবীজি ও তার সাহাবিরা ধৈর্য ও অবিচলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
দুঃখের বছর ও তায়েফ সফর
দীর্ঘ তিন বছরের অবরোধ শেষে যখন তারা মুক্তি লাভ করলেন, তখনও দুঃখের মেঘ কাটল না। অল্প সময়ের ব্যবধানে তার প্রিয় সহধর্মিণী হযরত খাদিজা (রা.) এবং স্নেহময় অভিভাবক আবু তালিব ইন্তেকাল করেন। এ বছরটি ইতিহাসে আমুল হুযন বা দুঃখের বছর নামে পরিচিত। মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করার মহান লক্ষ্য নিয়ে তিনি তায়েফে গমন করলেন। কিন্তু সেখানকার লোকেরা তার আহ্বান গ্রহণ না করে তাকে অবজ্ঞা ও নির্যাতন করল। রক্তাক্ত শরীরে তিনি আল্লাহর দরবারে ধৈর্যের প্রার্থনা করলেন, তবুও তাদের বিরুদ্ধে কোনো বদদোয়া করলেন না।
মিরাজ ও হিজরত
এমন কঠিন সময়ে মহান আল্লাহ নবীজিকে দান করলেন মিরাজের মহাসম্মান। অতঃপর মক্কার অত্যাচার অসহনীয় হয়ে উঠলে আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করলেন। মদিনায় পৌঁছে তিনি ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণের ভিত্তিতে এক আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করলেন।



