কাবিননামায় স্বাক্ষর করলেই কি বিয়ে সম্পন্ন হয়? ইসলামী শরিয়তের ব্যাখ্যা
কাবিননামায় স্বাক্ষর করলেই কি বিয়ে সম্পন্ন হয়?

বর্তমান সময়ে অনেকেই মনে করেন, কাজী অফিসে গিয়ে কাবিননামায় স্বাক্ষর করলেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ ধারণা করেন, নিবন্ধনপত্রে স্বাক্ষরের পর দাম্পত্য জীবন শুরু করাও বৈধ। কিন্তু ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ে কেবল একটি কাগজে স্বাক্ষরের নাম নয়; বরং এটি নির্দিষ্ট শর্ত ও পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। তাই বিয়ে সংঘটিত হওয়ার জন্য কাবিননামার ভূমিকা কী এবং মৌখিক ইজাব-কবুল ছাড়া শুধু স্বাক্ষরের মাধ্যমে বিয়ে বৈধ হয় কি না—এ বিষয়টি জানা জরুরি।

প্রশ্ন: কাবিননামায় স্বাক্ষর করলেই কি বিয়ে সম্পন্ন হয়?

কোনো ছেলে-মেয়ে যদি কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ের জন্য কাবিননামায় স্বাক্ষর করে এবং সেখানে বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়-স্বজনও উপস্থিত থাকে, কিন্তু মৌখিকভাবে কোনো ইজাব-কবুল না হয়, তাহলে কি বিয়ে সম্পন্ন হবে? আর কাবিননামায় স্বাক্ষরের পর তারা যদি দাম্পত্য জীবন শুরু করে, তাহলে তা কি বৈধ হবে?

কাবিননামা কি বিয়ে সম্পন্ন করে?

কাবিননামা মূলত একটি নিবন্ধন সনদ। কোনো বিবাহ শরিয়তসম্মতভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর তা সরকারিভাবে নথিভুক্ত করার জন্য কাবিননামা তৈরি করা হয়। অতএব, কাবিননামায় স্বাক্ষর করার মাধ্যমে বিয়ে সংঘটিত হয় না। কারণ কাবিননামা বিবাহের প্রমাণপত্র, বিবাহের মূল আকদ (চুক্তি) নয়। তাই প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় শুধু কাবিননামায় স্বাক্ষর করা হলেও যেহেতু মৌখিক ইজাব-কবুল হয়নি, সেহেতু শরিয়তের দৃষ্টিতে ওই বিয়ে সহিহ হয়নি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিয়ে সহিহ হওয়ার জন্য শর্তাবলী

ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে সহিহ হওয়ার জন্য পাত্র-পাত্রীর পক্ষ থেকে অথবা তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে মৌখিক ইজাব ও কবুল হওয়া আবশ্যক। ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন, বিয়ে সহিহ হওয়ার জন্য—

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ সাক্ষী; অথবা
  • একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষীর উপস্থিতি প্রয়োজন।

এদের সামনে স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব (ইজাব) এবং গ্রহণ (কবুল) সম্পন্ন হতে হবে। এ মৌখিক ইজাব-কবুলই মূলত বিয়ের আকদ বা চুক্তি সম্পন্ন করে।

কুরআনে বিবাহের গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা বলেন— وَأَخَذْنَ مِنْكُمْ مِيثَاقًا غَلِيظًا ‘আর তারা (স্ত্রীরা) তোমাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ২১) এই আয়াতে বিবাহকে ‘মীসাকান গালীযা’ বা দৃঢ় ও গুরুতর অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই শরিয়ত নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করেই এ চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে।

হাদিসে সাক্ষীর উপস্থিতির গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— لَا نِكَاحَ إِلَّا بِشَاهِدَيْ عَدْلٍ ‘দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিয়ে (পূর্ণাঙ্গ ও বৈধ) নয়।’ (বায়হাকি, দারাকুতনি) আরেক হাদিসে এসেছে— أَعْلِنُوا هَذَا النِّكَاحَ ‘তোমরা এ বিবাহ প্রকাশ্যভাবে সম্পন্ন করো।’ (তিরমিজি ১০৮৯) এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, বিবাহ একটি প্রকাশ্য ও সাক্ষীসম্মত চুক্তি; কেবল নথিতে স্বাক্ষর করাই এর জন্য যথেষ্ট নয়।

দাম্পত্য জীবন শুরু করলে তার বিধান

প্রশ্নে উল্লিখিত ক্ষেত্রে যেহেতু শরিয়তসম্মত বিবাহ সম্পন্ন হয়নি, তাই তাদের পারস্পরিক দাম্পত্য জীবন বৈধ হবে না। এ অবস্থায় তাদের উচিত আল্লাহ তাআলার কাছে আন্তরিকভাবে তাওবা ও ইস্তিগফার করা এবং শরিয়তের বিধান অনুযায়ী নতুন করে বিবাহ সম্পন্ন করা।

এখন কী করতে হবে?

যদি তারা বৈধভাবে সংসার করতে চান, তাহলে নতুন করে বিয়ের আকদ সম্পন্ন করতে হবে। এর জন্য—

  • মহর নির্ধারণ করতে হবে।
  • দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে।
  • পাত্র-পাত্রীর পক্ষ থেকে মৌখিক ইজাব ও কবুল সম্পন্ন করতে হবে।

এভাবে নতুন আকদের মাধ্যমে সঙ্গে সঙ্গেই বিবাহ সম্পন্ন করা যাবে। এর জন্য কয়েক মাস বা নির্দিষ্ট কোনো সময় অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।

উপসংহার

ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে কাবিননামা বিবাহের নিবন্ধনপত্র মাত্র; এটি নিজে বিবাহ সম্পন্ন করে না। বিয়ে সহিহ হওয়ার জন্য সাক্ষীদের উপস্থিতিতে মৌখিক ইজাব-কবুল অপরিহার্য। তাই শুধু কাবিননামায় স্বাক্ষর করে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে মনে করা একটি ভুল ধারণা। মুসলমানদের উচিত বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক চুক্তি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সম্পন্ন করা, যাতে পারিবারিক জীবন বৈধ, বরকতময় ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উপযোগী হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ইসলামের বিধান সঠিকভাবে বুঝে তা অনুসরণ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

তথ্য সূত্র: (ফাতহুল কাদীর ৩/১০২, আল-বাহরুর রায়েক ৩/৮৩, মাজমাউল আনহুর ১/৪৬৮, রদ্দুল মুহতার ৩/১২, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৭০)