নামাজের প্রতিটি আমলের নির্দিষ্ট বিধান ও আদব রয়েছে। তাকবিরে তাহরিমার পর সানা পাঠ করাও নামাজের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতগুলোর একটি। অনেক সময় অসাবধানতাবশত কেউ সানা উচ্চস্বরে পড়ে ফেলেন। তখন প্রশ্ন দেখা দেয়— এ কারণে কি নামাজে সাহু সিজদা দিতে হবে? ইসলামী শরিয়তের আলোকে এ বিষয়ে সঠিক বিধান জানা প্রত্যেক মুসল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নামাজে সানা জোরে পড়লে কি সাহু সিজদা দিতে হবে?
নামাজে সানা অনুচ্চস্বরে বা নিম্নস্বরে পড়া সুন্নত। তাই ইচ্ছাকৃতভাবে সানা উচ্চস্বরে পড়া উচিত নয়। তবে কেউ যদি ভুলবশত বা অসাবধানতাবশত সানা জোরে পড়ে ফেলেন, তাহলে তার ওপর সাহু সিজদা ওয়াজিব হবে না। কারণ সানা নামাজের সুন্নত আমল। সুন্নতের আদায়ে ভুল হলে সাধারণত সাহু সিজদা ওয়াজিব হয় না। তাই এমন অবস্থায় সাহু সিজদা ছাড়াই নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে।
সানার গুরুত্ব ও বিধান
নামাজের শুরুতে তাকবিরে তাহরিমার পর সানা পড়া সুন্নতে মুআক্কাদা। তাকবিরে তাহরিমার পর হাত বাঁধার পর প্রথম আমলই হলো সানা পাঠ করা। একাকী নামাজ আদায়কারী, ইমাম এবং মুক্তাদি— সবার জন্যই সানা পড়া সুন্নত। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমল হাদিসে বর্ণিত হয়েছে—
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ قَالَ: سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ...
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন নামাজ শুরু করতেন, তখন বলতেন—‘সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা...’। (আবু দাউদ ৭৭৫, তিরমিজি ২৪৩)
মুক্তাদির জন্য সানা পড়ার বিধান
মুক্তাদি যদি ইমাম সানা পড়ে ফেলার পর নামাজে শরিক হন এবং ইমাম উচ্চস্বরে কেরাত পড়তে থাকেন, তাহলে মুক্তাদি সানা না পড়ে ইমামের তিলাওয়াত মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। তবে ইমাম যদি নিম্নস্বরে কেরাত পড়তে থাকেন, তাহলে মুক্তাদি নামাজে শরিক হয়ে সানা পড়তে পারবেন। এর কারণ হলো, ইমামের কেরাত শ্রবণ করা মুক্তাদির জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ
‘যখন কুরআন তিলাওয়াত করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং নীরব থাকো, যাতে তোমাদের প্রতি দয়া করা হয়।’ (সুরা আল-আরাফ: আয়াত ২০৪)
ইমাম রুকুতে চলে গেলে করণীয়
ইমাম রুকুতে চলে যাওয়ার পর কেউ যদি জামাতে শরিক হন, তাহলে তার উচিত সানা না পড়ে সরাসরি তাকবির বলে রুকুতে চলে যাওয়া। অনেকেই এ সময় সানা পড়তে গিয়ে রুকু মিস করেন এবং পুরো রাকাত হারিয়ে ফেলেন। এটি সঠিক পদ্ধতি নয়। জামাতের রাকাত পাওয়ার জন্য ইমামকে অনুসরণ করে দ্রুত রুকুতে চলে যাওয়া জরুরি।
সানার আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلَا إِلٰهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ: ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাসমুকা, ওয়া তাআলা জাদ্দুকা, ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আপনার নাম অত্যন্ত বরকতময়। আপনার মর্যাদা সর্বোচ্চ। আপনি ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।’ (আবু দাউদ ৭৭৫)
নামাজে ভুলত্রুটি হলে সাহু সিজদার মূলনীতি
ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন, নামাজের কোনো ওয়াজিব কাজ ভুলবশত ছুটে গেলে বা বিলম্বিত হলে সাহু সিজদা ওয়াজিব হয়। কিন্তু সুন্নত আদায়ে ত্রুটি হলে সাধারণত সাহু সিজদা ওয়াজিব হয় না। এ কারণেই ভুলক্রমে সানা উচ্চস্বরে পড়ে ফেললে সাহু সিজদা প্রয়োজন হয় না এবং নামাজ শুদ্ধ থাকে।
সানা নামাজের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত হলেও তা নিম্নস্বরে পড়া সুন্নতের অংশ। তাই ভুলবশত সানা জোরে পড়ে ফেললে নামাজ নষ্ট হয় না এবং সাহু সিজদাও ওয়াজিব হয় না। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে সুন্নতের খেলাফ কাজ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। নামাজের প্রতিটি আমল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত অনুযায়ী আদায় করার মধ্যেই রয়েছে নামাজের সৌন্দর্য, পরিপূর্ণতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।



