পবিত্রতা ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান। অজু, গোসল ও নামাজের সঙ্গে পানির পবিত্রতার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— কারো যদি গোসল ফরজ হয়, আর সে অবস্থায় সে যদি বালতি বা পানির পাত্রে হাত ডোবায়, তাহলে কি সেই পানি নাপাক হয়ে যায়? আবার গোসলের সময় শরীর থেকে গড়িয়ে পড়া পানি বালতিতে পড়লে সেই পানির হুকুম কী? ইসলামী শরিয়তের আলোকে এ বিষয়ে সঠিক বিধান জানা জরুরি।
পবিত্রতা সম্পর্কে কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন— وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا ‘আর যদি তোমরা অপবিত্র (জানাবাতগ্রস্ত) হও, তবে পূর্ণরূপে পবিত্রতা অর্জন কর।’ (সুরা আল-মায়িদা: আয়াত ৬) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, জানাবাত বা গোসল ফরজ অবস্থায় মুসলমানকে গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করতে হবে। তবে এ অবস্থায় ব্যক্তির শরীর নিজেই নাপাক হয়ে যায় না; বরং নির্দিষ্ট ইবাদতের জন্য গোসল আবশ্যক হয়।
গোসল ফরজ অবস্থায় বালতিতে হাত ডোবালে কি পানি নাপাক হবে?
গোসল ফরজ অবস্থায় বালতিসহ যে কোনো পানির পাত্রে হাত ডোবালে ওই পাত্রের পানি নাপাক হয়ে যায় না; যদি হাতে কোনো বাহ্যিক নাপাকি যেমন মল, মূত্র, বীর্য বা অন্য কোনো অপবিত্র বস্তু লেগে না থাকে। শুধু আঙুল বা হাত পানিতে ডোবানোর কারণে পাত্রের পানি ‘মুস্তামাল’ বা ব্যবহৃত পানিও হয়ে যায় না। তাই গোসল ফরজ অবস্থায় গোসলের পানির পাত্রে হাত ডোবালেও সেই পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা বৈধ।
মুস্তামাল পানি কী?
যে পানি দিয়ে শরীরের নাপাকি ধোয়া হয়েছে এবং সেই নাপাকি পানির সঙ্গে মিশে গেছে, সে পানি নাপাক বা অপবিত্র। তবে শরীরে কোনো বাহ্যিক নাপাকি না থাকলে অজু বা ফরজ গোসলে ব্যবহৃত পানি অপবিত্র হয় না। শরঈ পরিভাষায় এ ধরনের পানিকে ‘মায়ে মুস্তামাল’ বা ব্যবহৃত পানি বলা হয়। ব্যবহৃত পানি দিয়ে অজু বা গোসল করা যায় না, তবে বাহ্যিক নাপাকি দূর করা যায়। অর্থাৎ শরীরে লেগে থাকা কোনো নাপাকি ব্যবহৃত পানি দিয়ে ধুলে শরীর পবিত্র হবে; কিন্তু কারো অজু না থাকলে বা গোসল ফরজ হলে সে ব্যবহৃত পানি দিয়ে অজু-গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করতে পারবে না।
ফরজ গোসলের ছিটা পড়লে পানি অপবিত্র হবে?
গোসলের পানি যেহেতু অপবিত্র নয়, তাই গোসলের সময় শরীর থেকে গড়িয়ে পড়া অল্প কিছু পানি বালতিতে পড়লে বালতির পানি অপবিত্র হবে না। একইভাবে ওই পানি দিয়ে অজু বা গোসল করাও অবৈধ হবে না। এ প্রসঙ্গে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে— فِي الرَّجُلِ يَغْتَسِلُ مِنَ الْجَنَابَةِ فَيَنْضَحُ فِي إِنَائِهِ مِنْ غُسْلِهِ، فَقَالَ: لَا بَأْسَ بِهِ ‘এক ব্যক্তি জানাবাতের গোসল করার সময় তার ব্যবহৃত পানির কিছু ছিটা পাত্রে পড়ে গেলে সে বিষয়ে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এতে কোনো অসুবিধা নেই।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ৭৮৯)
পবিত্রতা বিষয়ে হাদিসের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَا يَنْجُسُ ‘নিশ্চয়ই মুমিন কখনো নাপাক হয় না।’ (বুখারি ২৮৩, মুসলিম ৩৭১) এই হাদিস থেকে ফকিহগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে, জানাবাতের কারণে একজন মুসলমানের শরীর নিজে অপবিত্র হয়ে যায় না। তাই কেবল গোসল ফরজ থাকার কারণে তার স্পর্শে পানি নাপাক হয়ে যায় না।
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
তবে বালতিতে যদি ব্যবহৃত পানির পরিমাণ এত বেশি হয়ে যায় যে তা অব্যবহৃত পানির চেয়ে বেশি হয়ে পড়ে, তাহলে সেই পানি দিয়ে অজু বা ফরজ গোসল করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে তা ‘মায়ে মুস্তামাল’-এর হুকুমে গণ্য হবে। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে গোসল ফরজ অবস্থায় থাকা ব্যক্তি নিজে নাপাক নন। ফলে হাতে কোনো বাহ্যিক নাপাকি না থাকলে বালতি বা পানির পাত্রে হাত ডোবানোর কারণে পানি নাপাক হয় না। একইভাবে গোসলের সময় শরীর থেকে গড়িয়ে পড়া অল্প পানি বালতিতে পড়লেও তা পানিকে অপবিত্র করে না। তাই এ বিষয়ে প্রচলিত অনেক ভুল ধারণা থেকে দূরে থেকে কুরআন-সুন্নাহ ও ফকিহদের ব্যাখ্যার আলোকে সঠিক মাসআলা জানা এবং সে অনুযায়ী আমল করাই একজন মুসলমানের দায়িত্ব।



