হজের আধ্যাত্মিক চেতনা ধরে রাখার উপায়
হজের আধ্যাত্মিক চেতনা ধরে রাখার উপায়

ছবি: পেক্সেল

হজ মানুষের আত্মিক পুনর্জন্মের এক আধ্যাত্মিক সফর। পবিত্র কাবাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে, আরাফার ময়দানে অশ্রুসিক্ত দোয়ায় নিমগ্ন হয়ে কিংবা মিনার প্রান্তরে কোরবানির চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একজন মুমিন নতুন জীবনের অঙ্গীকার নিয়ে ফিরে আসেন। হাদিসে এসেছে, ‘কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৭৩) তাই হজের প্রকৃত সফলতা হজ-পরবর্তী জীবনে পরিবর্তন ধরে রাখার মধ্যেই নিহিত।

হজের আধ্যাত্মিক প্রভাব

হজ মানুষের হৃদয়ে খোদাভীতি ও আত্মশুদ্ধির গভীর বোধ সৃষ্টি করে। ইহরামের শুভ্রতা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, দুনিয়ার সব অহংকার ও বিভাজন একদিন মুছে যাবে। আরাফার ময়দান মানুষকে কেয়ামতের সমাবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। তওয়াফ শেখায়, জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক সময় দেখা যায়, হজ থেকে ফিরে আসার কয়েক মাস পরই সেই আবেগ ও পরিবর্তনের দীপ্তি ম্লান হয়ে যায়। হজ-পরবর্তী জীবনে পরিবর্তন ধরে রাখতে নিম্নোক্ত কাজগুলো করা যেতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইবাদতের ধারাবাহিকতা

সর্বাবস্থায় ইবাদতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। হজ মানুষের ভেতর ইবাদতের ব্যাপারে নতুন অনুরাগের জন্ম দেয়। নিয়মিত ইবাদত আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশি প্রিয়। নবীজি (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কাছে সেই আমলই সবচেয়ে প্রিয়, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা

নেক কাজ করার পাশাপাশি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকাও অত্যাবশ্যক। হজের সময় মানুষ যেমন অশ্লীলতা, ঝগড়া-বিবাদ ও অন্যায় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে, হজের পরও সেই সংযম অব্যাহত রাখা অতীব জরুরি। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ফজিলত সম্পর্কে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি সেই সব কবিরা (বড়) গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো, যা থেকে তোমাদের নিষেধ করা হয়েছে, তবে আমি তোমাদের ছোটোখাটো পাপসমূহ মোচন করে দেব এবং তোমাদের সম্মানজনক স্থানে (জান্নাতে) প্রবেশ করাব।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩১) গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা অনেক নফল ইবাদতের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। নবীজি (সা.) বলেন, ‘হারাম বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকো, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সর্বাধিক ইবাদতকারী হয়ে যাবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩০৫)

সৎসঙ্গ অবলম্বন

মানুষের জীবনে সৎসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইমান ও আমলের অবস্থা অনেকাংশে তার পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। তাই আল্লাহভীরু ও দ্বীনদার মানুষের সাহচর্য হজের চেতনাকে জীবিত রাখতে সহায়তা করবে। সৎসঙ্গ ও নেককার মানুষের সাহচর্য গ্রহণের ব্যাপারে কোরআন ও হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা এসেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি নিজেকে তাদের সঙ্গেই রাখো, যারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের রবকে ডাকে এবং তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করে।’ (সুরা কাহফ, আয়াত: ২৮) নবীজি (সা.) বলেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শ ও জীবনধারা অনুসরণ করে। অতএব, তোমাদের প্রত্যেকের লক্ষ রাখা উচিত, সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩৩) ভালো বন্ধু ও খারাপ উদাহরণ দিতে গিয়ে নবীজি (সা.) বলেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো আতর বিক্রেতা এবং কামারের হাপর ফুঁকনেওয়ালার মতো। আতর বিক্রেতার কাছ থেকে তুমি সুগন্ধ পাবে বা কিছু কিনতে পারবে, আর কামারের কাছে গেলে সে তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে অথবা অন্তত দুর্গন্ধ তোমার গায়ে লাগবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১০১)

হজের স্মৃতি জীবন্ত রাখা

হজ মূলত নতুন জীবনের সূচনা। হজ-পরবর্তী জীবনে পরিবর্তন ধরে রাখতে হলে হজের স্মৃতিগুলোও জীবন্ত রাখা উচিত। কাবার সামনে দাঁড়িয়ে করা দোয়া, আরাফার কান্না কিংবা মদিনার আবেগঘন মুহূর্তগুলো বারবার স্মরণ করলে হৃদয়ে ইমানি অনুভূতি জাগ্রত থাকবে। হজের পর মানুষ যদি নিজেকে আগের চেয়ে বেশি আল্লাহমুখী দেখতে পায়, তবে সেটিই কবুল হজের অন্যতম আলামত।

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ

আরও পড়ুন: যেভাবে তৈরি হয়েছিল বিদায় হজের রূপরেখা, ১৬ মে ২০২৬