অনেকের ধারণা, প্রতিদিন না ধূমপান করলে কিংবা শুধু আড্ডা বা বিশেষ উপলক্ষে কয়েকটি সিগারেট খেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তেমন থাকে না। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মাঝেমধ্যে ধূমপানও শরীরে গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, তামাকের ধোঁয়ায় ৭ হাজারেরও বেশি রাসায়নিক উপাদান রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলোই বিষাক্ত ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী। ধূমপানের পরিমাণ কম হলেও এসব ক্ষতিকর উপাদানের প্রভাব থেকে শরীর রেহাই পায় না।
হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির ওপর প্রভাব
ধূমপানের কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিকোটিন রক্তনালিকে সংকুচিত করে, হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে কার্বন মনোক্সাইড রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে মাত্র কয়েকটি সিগারেট খেলেও হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। মাঝেমধ্যে ধূমপানের ফলে—
- হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে
- স্ট্রোকের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়
- রক্তনালির অভ্যন্তরীণ আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়
- ধমনিতে চর্বি জমার প্রক্রিয়া দ্রুততর হয়
- রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ে
এসব পরিবর্তন অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায়।
ফুসফুসের ক্ষতি
প্রতিবার ধূমপানের সময় ফুসফুস সরাসরি তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসে। অনিয়মিত ধূমপানও শ্বাসনালিতে প্রদাহ ও জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। সামাজিক বা মাঝে মধ্যে ধূমপানকারীদের মধ্যে সাধারণত যেসব উপসর্গ দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- দীর্ঘস্থায়ী কাশি
- শ্বাস নেওয়ার সময় সাঁই সাঁই শব্দ
- শারীরিক পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট
- ঘন ঘন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ
এছাড়া ধূমপান ফুসফুসের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়, ফলে দূষণ ও সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়।
ক্যানসারের ঝুঁকি শুরু হয় অল্পতেই
তামাকের ধোঁয়ায় থাকা ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান অল্প সময়ের সংস্পর্শেও ডিএনএর ক্ষতি করতে পারে। সময়ের সঙ্গে এই ক্ষতি জমতে জমতে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্বজুড়ে ফুসফুসের ক্যানসার সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্যানসারগুলোর একটি। গবেষণায় দেখা গেছে, মাঝে মধ্যে ধূমপানকারীদেরও ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় অনেক বেশি। এ ছাড়া খাদ্যনালী, মূত্রথলি, মুখগহ্বর ও গলার ক্যানসারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের সঙ্গেও তামাক ব্যবহারের সম্পর্ক রয়েছে।
নিকোটিন আসক্তির গোপন ফাঁদ
অনেক সামাজিক ধূমপায়ী নিজেদের আসক্ত মনে না করলেও নিকোটিন বিশ্বের অন্যতম আসক্তিকর পদার্থ। নিয়মিত বা অনিয়মিত গ্রহণের ফলে এটি মস্তিষ্কের পুরস্কার ও নির্ভরশীলতা-সংক্রান্ত কার্যক্রমে পরিবর্তন আনে। ফলে সামাজিক আড্ডায় সীমিত ধূমপান ধীরে ধীরে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ নিয়মিত ধূমপায়ীই শুরুতে ছিলেন অনিয়মিত ধূমপায়ী।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- ধূমপানের কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই।
- দিনে ১ থেকে ৪টি সিগারেটও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- অনিয়মিত ধূমপায়ীরাও ফুসফুসের ক্ষতি ও ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকেন।
- অল্প সময়ের ধূমপানও রক্তনালিতে পরিমাপযোগ্য ক্ষতি করতে পারে।
- মাঝেমধ্যে ধূমপান করলেও নিকোটিনের প্রতি নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঝে মধ্যে ধূমপান ক্ষতিকর নয়—এমন ধারণা অনেককে ধূমপান ছাড়ার উদ্যোগ থেকে দূরে রাখে। যদিও কম ধূমপান কিছুটা ঝুঁকি কমাতে পারে, তবে তামাকজনিত রোগ থেকে সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সম্পূর্ণভাবে ধূমপান ত্যাগ করা।



