রাজধানীর গুলিস্তানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দশা এখনও বেহাল। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় সেখানে নেই নেতা নেতাকর্মীর উপস্থিতি। ছবি: প্রথম আলো
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর হতে চলেছে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে শিল্প-সাংস্কৃতিক, শিক্ষাঙ্গনসহ নানা জায়গায় একধরনের পরিবর্তন এসেছে, যা অতীতে কখনো হয়নি। মব সংস্কৃতির ঘেরাটোপে ইতিবাচক পরিবর্তনের জায়গায় নেতিবাচক পরিবর্তনের পাল্লা ভারী থাকলেও দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ফলে এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কি তাহলে ফিরছে?
আওয়ামী লীগ ফিরবে, নাকি ফিরবে না, সেটি নির্ভর করবে দলটির নেতৃত্ব ও এই দেশের জনগণের ওপর। তবে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকা দলটি গণতান্ত্রিক যাত্রায় যোগ দেওয়ার আগে আমাদের প্রশ্ন তুলতে হবে, স্বৈরাচারী তকমা পাওয়া দলটি গত দুই বছর নিজেদের মধ্যে ঠিক কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে, যা দেখে এই দেশের মানুষ তাদের রাজনীতিতে ফেরার পাটাতন তৈরি করবে।
দলটির জনপ্রিয়তা কমছে, না বাড়ছে, সেই প্রশ্ন তোলার আগে আমাদের জানতে হবে আওয়ামী লীগ গত দুই বছর রাজনৈতিকভাবে কতটা সক্রিয় থাকতে পেরেছে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে দেওয়া দেশের প্রাচীনতম এই রাজনৈতিক দলটির সাংগঠনিক কাঠামোয় যে নীতি ও আদর্শের জায়গা ছিল, সেই জায়গা থেকে গত এক দশক তারা সরে যায়। বিনা ভোটের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হওয়া ও মন্ত্রিত্বের ভাগাভাগি দলটির তৃণমূল কাঠামো একবারে ভেঙে দেয়। আমলাতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থায় হারিয়ে যায় রাজনৈতিক সরকার কাঠামো। ফলে আওয়ামী লীগের শাসনামল তৃণমূলের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় জর্জরিত হয়ে পড়ে। দুর্নীতি, গুম-খুন ও অলিগার্কিক ক্ষমতা চর্চার মধ্য দিয়ে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া দলটি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পড়ে যায়। ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার সরকার।
এখন প্রশ্ন হলো, যে কারণগুলোর জন্য আওয়ামী লীগ আজ স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখে, সেই কারণগুলো কি আদৌও দলটি ধরতে পেরেছে? তারা নিজেদের মধ্যে ঠিক কতটা শুদ্ধি আনতে পেরেছে? আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে দলটির সংসদ সদস্য–মন্ত্রীদের দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের খবর পত্রপত্রিকায় নিয়মিত আসত। পত্রিকায় খবর প্রকাশের পরও ব্যাংক লুটেরাদের থামাতে ব্যর্থ হওয়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নিশ্চয় এখন সেই বিষয় আমলে নিয়েছে। সংকটকালে দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মী যখন জেলহাজতে, তখন অর্থ লোপাটকারীরা ভিনদেশে বেশ সচ্ছলতায় দিন যাপন করার খবর পত্রিকার পাতায় এসেছে। দলের নেতা-কর্মীদের পাশে না দাঁড়ানো সেসব আওয়ামী সংসদ সদস্য, মন্ত্রীদের মধ্যে অনেকেই এখন ‘মিউট মুডে’ গেছেন। আলোচনা থেকে খসে পড়েছেন এককালের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা।
অনেকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতিও ঘটছে। অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে যেসব নেতা বক্তব্য দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে একটি অংশ নিজেদের কিছু ভুলভ্রান্তির কথা মৃদুস্বরে বললেও কাঠামোগতভাবে তাঁদের পরিবর্তন তেমন চোখে পড়ার মতো নয়। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশের কাছে আওয়ামী লীগের যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল, সেই ভাবমূর্তিকে ইতিবাচক করার জন্য দলটির কোনো কার্যক্রম ও কথাবার্তায় লক্ষণীয় ছিল না। পতনের পর দলটির ভেতর থেকে তরুণদের আকৃষ্ট করার মতো নেতৃত্ব ঠিক কতটা তারা তৈরি করতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক পাটাতন তৈরির বয়ান তরুণেরা কতটা গ্রহণ করছেন, সেটাও উপলব্ধির বিষয় হতে পারে।
পঁচাত্তর–পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের ভেতর দলাদলি কিংবা সংগঠনটিতে ফাটল ধরলেও এবার এই সংকটে তেমনটা আমরা দেখতে পাইনি। ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নিয়ে গুঞ্জন তৈরি হলেও দলটির নেতা-কর্মীরা সেখানে তেমনটা সাড়া দিয়েছে বলে মনে হয় না। বরং তাঁরা শেখ হাসিনাকে ঘিরে সামনে এগোতে চান। এটি অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে।
অথচ দলটির এসব হুমকির রাজনীতি থেকে বের হওয়ার বক্তব্যই সাধারণ মানুষ আশা করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানা ব্যর্থতায় ও মব সন্ত্রাসের কারণে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার পথ তৈরি হলেও দলটি এখনো নিজেদের ভেতর পরিবর্তনের বার্তা দিতে পারছে না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলটির নেতা-কর্মীদের গোছানোর কাজটি কতটা করতে পেরেছেন, আমরা তা জানি না, তবে তিনি যে নিয়মিত ভার্চ্যুয়াল বৈঠকগুলোতে যুক্ত হচ্ছেন, তার ক্লিপগুলো অনলাইনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব ক্লিপের বক্তব্যে এখনো বিষোদ্গার থাকছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানা অনিয়ম নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি ‘দেখে নেওয়ার’ যে প্রবণতা রয়েছে, মানুষ নিশ্চয় তা স্বাভাবিকভাবে দেখবে না।
প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রাজনৈতিক চর্চার একধরনের জোয়ার চলছে। এই জোয়ারে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব থেকে নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার বার্তা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে আগামী দিনের রাজনীতি যে সংঘাতময় হতে পারে, তার ইঙ্গিত মিলছে। অথচ দলটির এসব হুমকির রাজনীতি থেকে বের হওয়ার বক্তব্যই সাধারণ মানুষ আশা করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নানা ব্যর্থতায় ও মব সন্ত্রাসের কারণে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার পথ তৈরি হলেও দলটি এখনো নিজেদের ভেতর পরিবর্তনের বার্তা দিতে পারছে না। দুর্নীতিবাজ ও লুটেরাদের ফেলে দিয়ে সাধারণ মানুষ নিয়ে রাজনীতির কৌশল তৈরি করতে না পারলে আওয়ামী লীগ তার সংকটের খোলস থেকে বের হতে পারবে না।
ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে দলটির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে একধরনের পরিবর্তন লক্ষণীয় ছিল। দাপুটে হাইব্রিড নেতাদের কারণে বিতাড়িত নেতা-কর্মীরা দলের এই দুঃসময়ে পাশে এসেছেন। তাঁদের একটি বড় অংশেরই আগের নেতৃত্বের প্রতি ক্ষোভ ছিল। এই পতনের মধ্যে দিয়ে হয়তো আওয়ামী লীগ তাদের তৃণমূলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের খুঁজছে।
হ্যাঁ, এ কথা সত্য, আওয়ামী লীগ গত দুই বছর রাজপথে রাজনীতি করতে পারেনি। চব্বিশের আন্দোলনের পর দলটি কোনো বড় ধরনের সহিংসতায় জড়ায়নি। ফলে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পরও দলটির ভেতর যে রক্তপাতহীন রাজনীতির মাঠ তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেটি ঠিক কতটা তারা ধরে রাখতে পারবে, সেটিই বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
অন্যদিকে দেশের নানা প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনায় হামলা ও দলটির নেতা-কর্মীদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতনের ঘটনায় দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের একধরনের সহানুভূতি তৈরি হওয়ার বিষয়কে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে সেটিকে দলটির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি হিসেবে দাবি করলে সমস্যা বাড়বে। দলটির নেতৃত্বে চোর-বাটপার ও দুর্নীতিবাজদের আশ্রয় হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকবে।
আওয়ামী লীগকে বুঝতে হবে নতুন প্রজন্মের তরুণদের একটি বড় অংশ তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এবং এই অবস্থা কাটিয়ে উঠে আগামী দিনের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনঃপ্রতিষ্ঠা কঠিনতর হয়ে উঠতে পারে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার হত্যার অভিযোগ খণ্ডন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার আইনি জটিলতা কাটিয়ে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা কতটা সুখকর হবে, তা নির্ভর করবে ইতিবাচক নেতৃত্বের পরিবর্তনের ওপরই। সেই সুযোগ তার প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো কতটা দেবে, সেটাই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
ড. নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়



