হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপে আজ বুধবার ভোরে ১৭ লাখের বেশি মুসলিম মিনায় সমবেত হয়েছেন। তাঁরা প্রতীকী শয়তানকে পাথর মারছেন, যা নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর শয়তানকে পাথর ছুড়ে মারার ঘটনার স্মৃতিচারণা।
হজের তৃতীয় দিন: ইয়াওমুন্নাহর
হজের তৃতীয় দিন, যা ‘ইয়াওমুন্নাহর’ বা কোরবানির দিন নামে পরিচিত, সেদিন ভোরে হাজিরা মুজদালিফা থেকে মিনায় ফিরে আসেন। তাঁরা গতকাল মঙ্গলবার রাতে আরাফাত থেকে মুজদালিফায় যান এবং সেখানে রাতভর ইবাদত-বন্দেগি ও পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন।
প্রতীকী শয়তান পাথর মারার তাৎপর্য
নবী ইব্রাহিম (আ.) নিজের সন্তান ইসমাইলকে কোরবানি করার জন্য আল্লাহর আদেশ মানতে যাওয়ার পথে শয়তান তিনটি জায়গায় এসে তাঁকে বাধা দেওয়ার ও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। সেই ঘটনার স্মৃতিতে হাজিরা প্রতীকী তিনটি স্তম্ভের মধ্যে সবচেয়ে বড় স্তম্ভ ‘জামরাত আল-আকাবা’তে পাথর মারেন।
ব্যাপক নিরাপত্তা ও সমন্বয়
সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার (এসপিএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বার্ষিক এই মানবসমাবেশকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে ব্যাপক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। আরাফাত থেকে মুজদালিফায় রাতারাতি স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। ধবধবে সাদা কাপড়ের ইহরাম পরা লাখ লাখ হাজি প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটার পথ দিয়ে এগিয়ে যান, যা বিশ্বের দীর্ঘতম হাঁটার পথ হিসেবে পরিচিত।
গরম থেকে রক্ষায় পানি ছিটানো
পবিত্র স্থানগুলোর মধ্য দিয়ে হাজিরা যখন হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন মরুভূমির তীব্র গরম কমাতে এই পথের বিভিন্ন অংশে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
হজের ধাপসমূহ
প্রথম বড় শয়তানকে পাথর ছোড়ার পর আজ হাজিরা পশু কোরবানি দিচ্ছেন এবং মাথা ন্যাড়া বা চুল ছোট করছেন। এরপর ইহরামের পবিত্র অবস্থা থেকে আংশিক মুক্তি নেবেন। অনেকেই মক্কার মসজিদুল হারামে (কাবা শরিফ) গিয়ে ‘তাওয়াফ আল-ইফাদাহ’ এবং সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে ‘সাঈ’ বা ধর্মীয় রীতি পালন করবেন। পরবর্তী সময়ে তাশরিকের দিনগুলোতে আরও পাথর মারতে হাজিরা আবার মিনায় ফিরে আসবেন।
আরাফাতের ময়দানে ইবাদত
এর আগে গতকাল মঙ্গলবার হাজিরা হজের মূল স্তম্ভ ‘আরাফাতের ময়দানে’ সমবেত হন। সেখানে তাঁরা ইবাদত-বন্দেগি করেন এবং নামিরাহ মসজিদে হজের খুতবা শোনেন। মক্কার পবিত্র কাবা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত আরাফাত ময়দান ইসলামি ঐতিহ্যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি আদম ও হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলনের স্মৃতিবিজড়িত স্থান।
হাজির সংখ্যা ও ব্যবস্থাপনা
সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের হজে ১৭ লাখ ৭ হাজার ৩০১ জন হাজি অংশ নিয়েছেন, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ২ দশমিক ০৪ শতাংশ বেশি। এঁদের মধ্যে ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৬৫৫ জন সৌদি আরবের বাইরে থেকে এসেছেন এবং ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৪৬ জন স্থানীয় হাজি ও বাসিন্দা। আন্তর্জাতিক হাজিদের বেশির ভাগই আকাশপথে ভ্রমণ করেছেন। সৌদি কর্মকর্তারা এই হাজি বৃদ্ধির কারণ হিসেবে উন্নত সেবাব্যবস্থা, হজের ডিজিটাল পদ্ধতি এবং নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও লজিস্টিক সংস্থাগুলোর মধ্যকার আরও জোরালো সমন্বয়কে কৃতিত্ব দিয়েছেন।
মক্কা রুট ইনিশিয়েটিভ
সৌদি আরব তাদের ‘মক্কা রুট ইনিশিয়েটিভ’ কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি করেছে। এ ব্যবস্থার ফলে হাজিরা নিজ দেশ থেকেই অভিবাসন ও কাস্টমসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আসতে পারেন। এ বছর প্রায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার হাজি এই সুবিধা ব্যবহার করেছেন, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি।
কর্মী নিয়োজিত
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই মৌসুমে হজের কার্যক্রম পরিচালনায় ৪ লাখ ৪১ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। হাজিরা যখন হজের চূড়ান্ত প্রধান ধাপগুলোর মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তখন এই কর্মীরা ভিড় ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছেন।



