আরাফার রোজা কবে রাখবেন? মুফতি আবদুল মালেকের স্পষ্ট ব্যাখ্যা
আরাফার রোজা কবে রাখবেন? মুফতি আবদুল মালেকের ব্যাখ্যা

প্রতি বছর জিলহজ মাস এলে আরাফার রোজা নিয়ে মুসলমানদের মনে নানা প্রশ্ন জাগে। কেউ কেউ জানতে চান, এই রোজা কি সৌদি আরবের আরাফাতের দিনের সঙ্গে মিলিয়ে রাখতে হবে, নাকি নিজ দেশের হিজরি তারিখ অনুযায়ী পালন করতে হবে? এই বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইসলামি আইন ও হাদিস বিশারদ, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। গত ১৫ মে জুমার খুতবায় তিনি জিলহজের আমল, আরাফার রোজা এবং তাকবিরে তাশরিকের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

আরাফাতের ময়দানে নবীজি (সা.) রোজা রাখেননি

মুফতি আবদুল মালেক বলেন, বিদায় হজের সময় আরাফাতের ময়দানে রাসুলুল্লাহ (সা.) রোজা অবস্থায় ছিলেন কি না—এ নিয়ে সাহাবিদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়েছিল। পরে সেই সংশয় দূর করতে নবীজির সামনে এক পেয়ালা দুধ আনা হয় এবং তিনি সবার সামনে তা পান করেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিদায় হজের দিন তিনি রোজা রাখেননি। এই ঘটনা সহিহ বুখারিতে এভাবে বর্ণিত হয়েছে—

أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ دَعَا بِقَدَحٍ مِنْ لَبَنٍ فَشَرِبَهُ يَوْمَ عَرَفَةَ وَالنَّاسُ يَنْظُرُونَ

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

‘নবী (সা.) আরাফার দিনে এক পেয়ালা দুধ আনতে বললেন এবং মানুষের সামনে তা পান করলেন।’ (বুখারি ১৯৮৮)

হাজিদের জন্য আরাফার রোজা সুন্নত নয়

তিনি বলেন, শরিয়তের বিধান অনুযায়ী হজ পালনকারীদের জন্য ৯ জিলহজে রোজা রাখা সুন্নত নয়। কারণ, আরাফার দিন হজের গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহ শক্তি ও মনোযোগের সঙ্গে আদায় করাই মূল বিষয়। তবে কোনো হাজি যদি মনে করেন রোজা রাখলেও তার শারীরিক সমস্যা হবে না এবং হজের রোকন আদায়ে ব্যাঘাত ঘটবে না, তাহলে তিনি রোজা রাখতে পারবেন। কিন্তু সুন্নত হলো—হাজিদের জন্য আরাফার দিন রোজা না রাখা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আরাফার রোজা কবে রাখতে হবে?

মুফতি আবদুল মালেক বলেন, আরাফার রোজা মূলত হাজিদের জন্য নয়; বরং সাধারণ মুসলমানদের জন্য বিশেষ ফজিলতপূর্ণ আমল। আর এই রোজা আরাফাতের ময়দানে হাজিদের অবস্থানের সময়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়, বরং ৯ জিলহজ তারিখের সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ, যে দেশে যখন ৯ জিলহজ হবে, সে দেশেই সেদিন আরাফার রোজা পালন করতে হবে।

জিলহজের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত

পবিত্র কুরআন ও হাদিসে জিলহজের প্রথম দশ দিনকে বছরের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সময়গুলোর একটি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ

‘এমন কোনো দিন নেই, যেসব দিনে নেক আমল আল্লাহর কাছে এই দশ দিনের আমলের চেয়ে বেশি প্রিয়।’ সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন—আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি এর চেয়ে উত্তম নয়? তখন নবীজি (সা.) বললেন—

وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ

‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে সেই ব্যক্তি ব্যতিক্রম, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে বের হয়েছে এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসেনি (অর্থাৎ শহীদ হয়েছে)।’ (বুখারি ৯৬৯)

১ থেকে ৯ জিলহজ পর্যন্ত রোজার আমল

মুফতি আবদুল মালেক বলেন, ১ জিলহজ থেকে ৯ জিলহজ পর্যন্ত নফল রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কারণ ১০ জিলহজ ঈদের দিন হওয়ায় ওইদিন রোজা রাখা হারাম। কেউ চাইলে পুরো নয় দিন রোজা রাখতে পারেন, আবার কেউ কয়েকদিন রাখলেও সমস্যা নেই। আর যদি কারও ৯ জিলহজের রোজা নিয়ে দ্বিধা থাকে, তাহলে তিনি ৮ ও ৯ জিলহজ—দুই দিনই রোজা রাখতে পারেন।

রাতের ইবাদত ও নফল আমল

তিনি আরও বলেন, শুধু রোজা নয়—জিলহজের প্রথম দশ রাতও ইবাদতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত, দরুদ শরিফ, ইস্তিগফার, তাহাজ্জুদ ও নফল নামাজ আদায় করা উচিত। এ ছাড়া মাগরিব ও ইশার মাঝখানে আউয়াবিনের নামাজ, নফল সদকা ও দান-খয়রাত আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় আমল।

তাকবিরে তাশরিকের গুরুত্ব

মুসনাদে আহমদের বর্ণনা অনুযায়ী, জিলহজের দিনগুলোতে বেশি বেশি জিকির করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে এই জিকিরগুলো বেশি বেশি পড়া উচিত—لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), اللَّهُ أَكْبَرُ (আল্লাহু আকবার), الْحَمْدُ لِلَّهِ (আলহামদুলিল্লাহ)। আর তাকবিরে তাশরিক—اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ (আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ)।

তিনি বলেন, ৯ জিলহজের ফজর থেকে ১৩ জিলহজের আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একবার এই তাকবির বলা ওয়াজিব। তবে নফল জিকির হিসেবে জিলহজের চাঁদ ওঠার পর থেকেই যত বেশি সম্ভব এই তাকবির পড়া উত্তম।

জিলহজের প্রথম দশ দিন একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বিশেষ সুযোগ। রোজা, নামাজ, জিকির, কুরআন তিলাওয়াত ও দান-সদকার মাধ্যমে এই সময়কে কাজে লাগানো উচিত। আরাফার রোজা নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করে মুফতি আবদুল মালেক স্পষ্ট করেছেন—এই রোজা নিজ নিজ দেশের ৯ জিলহজ অনুযায়ী পালন করতে হবে। তাই মুসলমানদের উচিত সঠিক জ্ঞান অর্জন করে সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা।