জীবন বড়ই অনিশ্চিত। আজ যে মানুষ সুস্থ, স্বচ্ছল ও কর্মক্ষম, কাল হয়তো সে অসুস্থতা, বার্ধক্য কিংবা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে যাবে। দুনিয়ার ব্যস্ততা, স্বপ্ন আর মোহে ডুবে থাকতে থাকতে মানুষ অনেক সময় ভুলে যায়—প্রতিটি নিঃশ্বাসই তাকে আখিরাতের দিকে এগিয়ে নিচ্ছে। তাই একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা হলো সুযোগ থাকা অবস্থাতেই নেক আমলে দ্রুত হওয়া, তওবা করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নিজেকে প্রস্তুত করা। এ কারণেই মুহাম্মদ (সা.) উম্মতকে সতর্ক করে সাতটি ভয়াবহ পরিস্থিতি আসার আগেই নেক আমলে অগ্রসর হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
নেক আমলে দেরি নয়, দ্রুত হওয়ার আহ্বান
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— "তোমরা সাতটি বিষয় আসার আগে নেক আমলে দ্রুত হয়ে যাও—১. এমন দারিদ্র্য, যা তোমাদের সবকিছু ভুলিয়ে দেবে; ২. এমন সম্পদ, যা তোমাদের অবাধ্য ও অহংকারী করে তুলবে; ৩. এমন রোগ, যা তোমাদের দুর্বল ও অক্ষম করে দেবে; ৪. এমন বার্ধক্য, যা তোমাদের জ্ঞান ও শক্তি হ্রাস করবে; ৫. আকস্মিক মৃত্যু, যা তোমাদের (তওবা ও আমলের) সুযোগ কেড়ে নেবে; ৬. দাজ্জাল, যে প্রতীক্ষিত অনিষ্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর; ৭. আর কিয়ামত, যা অধিক ভয়াবহ ও তিক্ততর।" (তিরমিজি ২৩০৬)
সাতটি ভয়াবহ বাস্তবতা, যা মানুষকে আমল থেকে দূরে সরিয়ে দেয়
১. দারিদ্র্য: জীবনের কঠিন পরীক্ষা
অভাব মানুষের মনকে এতটাই ব্যতিব্যস্ত করে তোলে যে অনেক সময় সে ইবাদত ও আখিরাতের চিন্তা ভুলে যায়। তাই স্বচ্ছল অবস্থাতেই আল্লাহর পথে বেশি বেশি আমল করা উচিত।
২. সম্পদ: অহংকারের ফাঁদ
সম্পদ আল্লাহর নিয়ামত হলেও তা মানুষকে অনেক সময় গাফেল ও অহংকারী বানিয়ে দেয়। ধন-সম্পদ যেন মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে না সরিয়ে দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
৩. রোগ: ইবাদতের শক্তি কেড়ে নেয়
সুস্থতা মানুষের সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোর একটি। অসুস্থতা এসে গেলে নামাজ, রোজা কিংবা অন্যান্য নেক আমল আগের মতো সহজ থাকে না। তাই সুস্থ সময়কে ইবাদতের জন্য কাজে লাগানো জরুরি।
৪. বার্ধক্য: শক্তি ও স্মৃতির অবক্ষয়
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, স্মৃতিশক্তি কমে যায় এবং ইবাদতের শক্তিও হ্রাস পায়। যৌবনের সময়টিই তাই নেক আমলের সবচেয়ে উত্তম সুযোগ।
৫. আকস্মিক মৃত্যু: সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগে
মৃত্যু কখন, কোথায় ও কীভাবে আসবে— তা কেউ জানে না। অনেক মানুষ ভালো কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেও হঠাৎ মৃত্যুর কারণে সুযোগ পায় না। তাই আজকের আমল কাল পর্যন্ত ফেলে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
৬. দাজ্জাল: সবচেয়ে ভয়ংকর ফিতনা
রাসুলুল্লাহ (সা.) দাজ্জালের ফিতনাকে মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইমান রক্ষার জন্য আল্লাহর সাহায্য ও নেক আমলের বিকল্প নেই।
৭. কিয়ামত: চূড়ান্ত বাস্তবতা
কিয়ামত এমন এক ভয়াবহ দিন, যেদিন প্রতিটি মানুষকে তার আমলের হিসাব দিতে হবে। তাই দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনকে আখিরাতের প্রস্তুতির মাধ্যম বানানোই একজন মুমিনের দায়িত্ব।
আজকের কাজ কাল পর্যন্ত নয়
মানুষ প্রায়ই ভাবে—‘সময় হলে তওবা করব’, ‘বৃদ্ধ হলে ইবাদত বাড়াব’ কিংবা ‘আগামীকাল থেকে বদলে যাব।’ অথচ আগামীকাল আদৌ আমাদের জীবনে আসবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন— "কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে এবং কেউ জানে না কোন ভূমিতে তার মৃত্যু হবে।" (সুরা লুকমান: আয়াত ৩৪)
হাদিস থেকে শিক্ষণীয় বিষয়
- নেক আমলে দেরি করা উচিত নয়।
- সুস্থতা, যৌবন ও অবসর—এসব আল্লাহর বড় নিয়ামত।
- দুনিয়ার সম্পদ ও সমস্যা উভয়ই মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
- মৃত্যুর আগে তওবা ও নেক আমলের সুযোগ কাজে লাগানো জরুরি।
- দাজ্জালের ফিতনা ও কিয়ামতের ভয়াবহতার প্রতি সর্বদা সচেতন থাকতে হবে।
- প্রতিদিনকে আখিরাতের প্রস্তুতির শেষ সুযোগ মনে করে জীবন পরিচালনা করা উচিত।
দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। আজ আমরা যে সময়, শক্তি ও সুযোগ পেয়েছি— তা একদিন আর থাকবে না। হয়তো একটি অসুস্থতা, একটি দুর্ঘটনা কিংবা হঠাৎ মৃত্যু আমাদের সব পরিকল্পনা থামিয়ে দিতে পারে। তাই একজন মুমিনের প্রকৃত প্রজ্ঞা হলো— সুযোগ থাকা অবস্থাতেই আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, নেক আমলে দ্রুত হওয়া এবং প্রতিটি দিনকে আখিরাতের প্রস্তুতির দিন হিসেবে গ্রহণ করা। কারণ যে মানুষ আজকের আমলকে আগামীকালের জন্য ফেলে রাখে, সে হয়তো কখনো সেই আগামীকাল আর পাবে না।



