অনেক সময় আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই দেখা যায় কেউ আমাদের কষ্ট দিচ্ছে, পেছনে কথা বলছে, ভুল বুঝছে কিংবা কোনো কারণে ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়, আত্মীয়তা রক্ষা করা শুধু তখনই নয়, যখন আত্মীয়স্বজন আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। বরং সম্পর্কের অন্য প্রান্তের মানুষ তাদের দায়িত্ব পালন না করলেও আমাদের কিছু না কিছু দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে।
কেন ভেঙে যায় আত্মীয়তা
কী কী কারণে মানুষ তার সবচেয়ে মূল্যবান পারিবারিক সম্পর্কগুলো নষ্ট করে ফেলে, তা অনুসন্ধান করলে কয়েকটি বাস্তব ব্যাধি সামনে আসে:
১. অন্যের ভালো সহ্য করতে না পারা
অনেকে অন্যের ভালো থাকা বা জীবনের সচ্ছলতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না। এই হিংসার বশবর্তী হয়ে তাঁরা এমন কিছু আচরণ ও কথাবার্তা বলেন, যা অন্য পক্ষের মন ভেঙে চুরমার করে দেয়। এই মানসিকতাই সম্পর্ক ভাঙার প্রধান কারণ।
২. সম্পদ ও উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ
টাকাপয়সা আর জমিজমার ভাগাভাগি যেখানে বড় হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে রক্তের টানও ফ্যাকাশে হয়ে আসে। পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব বহু পরিবারে স্থায়ী দূরত্ব তৈরি করে। অনেক সময় বোন বা দুর্বল ভাইদের ঠকানো হয়, যার ফলে নিরুপায় হয়ে তাঁরা চিরতরে সম্পর্ক ছিন্ন করে দূরে সরে যান।
৩. অহংকার ও আমিত্ব
‘ও আগে কেন কথা বলবে না?’ কিংবা ‘আমি কেন ছোট হব?’—এই জেদগুলোই বছরের পর বছর জমে থাকা ভালোবাসাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে। অথচ অহংকার ছেড়ে সামান্য একটা সালাম, একটা ফোনকল কিংবা একটা ‘দুঃখিত’ বলা নিমেষেই অনেক দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে।
৪. গিবত ও কানকথা
পরিবারের এক সদস্যের বিরুদ্ধে অন্য সদস্যের কাছে নেতিবাচক কথা বা গুজব ছড়ানো সম্পর্ক ভাঙার অন্যতম কারণ। অনেকে যাচাই না করেই এসব কথা বিশ্বাস করে বসেন, যার ফলে মনে সন্দেহ ও ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়।
৫. ‘যেমন আচরণ, তেমন জবাব’ মানসিকতা
‘ও আমার বিপদে আসেনি, আমিও যাব না’ কিংবা ‘সে খোঁজ নেয়নি, আমিও নেব না’—এই হিসাব-নিকাশ আসলে আমাদের অনেক সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার জন্য দায়ী।
যাদের সঙ্গে মিশলে মানসিক অশান্তি বেড়ে যায়, তাদের থেকে আমরা সামাজিকভাবে বা মানসিকভাবে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে পারি। প্রয়োজন হলে একটি সুস্থ সীমারেখা নির্ধারণ করতে পারি।
৬. অন্ধ পক্ষপাতিত্ব
অনেকে নিজের জীবনসঙ্গী বা শ্বশুরবাড়ির মানুষের কথায় প্ররোচিত হয়ে নিজের মা-বাবা ও ভাই-বোনের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। আবার এর উল্টোটাও ঘটে—মা-বোনের কথায় কান দিয়ে নিজের জীবনসঙ্গী ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা হয়।
৭. লেনদেনে অসততা
প্রায়ই দেখা যায় আমানতের খিয়ানত বা হিসাব-নিকাশের গরমিলের কারণে পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে ক্ষতির সময় একে অন্যের পাশে না থেকে দোষারোপ করার ফলে যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কটাও ভেঙে যায়।
৮. দীর্ঘদিনের যোগাযোগহীনতা
খোঁজখবর না নেওয়া বা দেখা-সাক্ষাৎ না করার ফলে আন্তরিকতা কমে যায়। একসময় এই নীরবতাই স্থায়ী দূরত্বে রূপ নেয়।
৯. আতিথেয়তায় সংকীর্ণতা
আত্মীয়স্বজন বাড়িতে এলে মন খারাপ করা, তাদের অবহেলা করা বা সামর্থ্য অনুযায়ী আপ্যায়ন না করা মারাত্মক এক মানসিক সংকীর্ণতা। মেহমানরা যখন বোঝেন যে তাঁদের আসাটাকে বোঝা মনে করা হচ্ছে, তখন তাঁরা পুনরায় আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
১০. সামাজিক বৈষম্য ও খোঁটা
আত্মীয়র মধ্যে কেউ একটু গরিব হলে তাঁকে পারিবারিক অনুষ্ঠানে অবহেলা করা কিংবা কথায় কথায় অন্য সফল মানুষের সঙ্গে তুলনা করে খোঁটা দেওয়া মানুষের আত্মসম্মানে আঘাত করে। তখন আত্মীয়দের থেকে দূরে থাকাটাই বেশি নিরাপদ মনে হয়।
ক্ষতিকর আত্মীয় হলে করণীয়
যারা সত্যিই আমাদের ক্ষতি করতে চায় বা মানসিক কষ্ট দেয়, তাদের সঙ্গে আমরা কীভাবে চলব? ইসলাম কখনোই আমাদের নিজের ক্ষতি করে সম্পর্ক বজায় রাখতে বলেনি।
যারা আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হয় বা যাদের সঙ্গে মিশলে মানসিক অশান্তি বেড়ে যায়, তাদের থেকে আমরা সামাজিকভাবে বা মানসিকভাবে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে পারি। প্রয়োজন হলে একটি সুস্থ সীমারেখা নির্ধারণ করতে পারি। কিন্তু সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়।
হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি অভিযোগ করে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আমার কিছু আত্মীয় আছে। আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখি, কিন্তু তারা সম্পর্ক ছিন্ন করে। আমি তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার করি, কিন্তু তারা আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে। আমি তাদের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করি, কিন্তু তারা আমার প্রতি মূর্খতাসুলভ আচরণ করে।’ তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘তুমি যেমন বলছ, যদি সত্যিই তেমন হয়ে থাকে, তবে যেন তুমি তাদের মুখে গরম ছাই ঢেলে দিচ্ছ। আর যতদিন তুমি এ অবস্থায় থাকবে, ততদিন তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার সঙ্গে একজন সাহায্যকারী থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৮)
অনেকেই মনে করেন, কেউ খারাপ ব্যবহার করলে তাকেও খারাপ ব্যবহার ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু রাসুল(সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত আত্মীয়তা রক্ষাকারী সে নয়, যে কেবল ভালো ব্যবহারের প্রতিদান দেয়। বরং প্রকৃত আত্মীয়তা রক্ষাকারী হলো সে, যার আত্মীয়রা সম্পর্ক ছিন্ন করলেও সে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৯১)
তাই দেখা হলে একটি সালাম, কোনো বিশেষ দিনে একটি মেসেজ, অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া কিংবা প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ানো—এসব ছোট ছোট কাজের মাধ্যমেও আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখা যায়।
দূরত্বের মাঝেও সম্পর্ক রক্ষা
অনেক সময় ভৌগোলিক দূরত্ব, কর্মব্যস্ততা কিংবা জীবনের নানা বাস্তবতার কারণে আত্মীয়কে নিয়মিত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু সম্পর্ক রক্ষা মানেই প্রতিদিন দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাটাতে হবে এমন নয়। অনেক সময় একটি আন্তরিক সালাম, একটি ফোনকল, একটি খোঁজখবর নেওয়ার মেসেজ কিংবা একটু দোয়া—এসব ছোটখাটো কাজই সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখতে যথেষ্ট।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য সবসময় বড় কিছু করতে হয় না; বরং ছোট ছোট আন্তরিক পদক্ষেপই অনেক সময় বড় দূরত্ব কমিয়ে দিতে পারে। রাসুল (সা.) আমাদের এই চমৎকার রহস্যটি শিখিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় যে তার জীবিকা প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ু বৃদ্ধি হোক, সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি, আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৫৬)
ইসমত আরা : শিক্ষক ও লেখক



