নরওয়েতে ইসলাম: ইতিহাস, বিকাশ ও সম্প্রীতির গল্প
নরওয়েতে ইসলাম: ইতিহাস, বিকাশ ও সম্প্রীতির গল্প

নরওয়েতে ইসলামের অবস্থান

ইউরোপের উত্তর প্রান্তের নরডিক দেশ নরওয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, দীর্ঘ শীত এবং ‘নিশীথ সূর্যের দেশ’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু এই দেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো, এখানে ইসলাম এখন খ্রিষ্টধর্মের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম। অভিবাসন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিবেশে নরওয়ের মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে তারা যেমন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তেমনি সম্প্রীতি ও সহাবস্থানেরও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলা

নরওয়েতে ইসলামের পরিচয় আধুনিক যুগের কোনো ঘটনা নয়। আইসল্যান্ডীয় ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ত্রয়োদশ শতাব্দীর ১২৬০-এর দশকে নরওয়ের রাজা হ্যাকন হ্যাকনসন তিউনিসের মুসলিম সুলতানের কাছে মূল্যবান উপহারসহ একটি কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছিলেন। জবাবে তিউনিসের সুলতানও তাঁর প্রতিনিধিদল নরওয়েতে পাঠান। এই ঘটনাকে দুই অঞ্চলের প্রাচীন কূটনৈতিক যোগাযোগের অন্যতম নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়।

তবে নরওয়েতে স্থায়ী মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে মূলত বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। ১৯৬৭ সালে দেশটির তেলশিল্পের দ্রুত বিকাশের ফলে শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যায়। সে সময় প্রথম দফায় পাকিস্তান থেকে বহু শ্রমিক নরওয়েতে অভিবাসন করেন। ১৯৭৫ সালে শ্রম অভিবাসন বন্ধ হয়ে গেলেও ফ্যামিলি রিইউনিয়ন কর্মসূচি এবং পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে বলকান অঞ্চল—বিশেষ করে বসনিয়া, পাশাপাশি সোমালিয়া ও ইরাক থেকে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের আগমনের ফলে নরওয়ের মুসলিম জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুসলিম জনসংখ্যা ও বৈচিত্র্য

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত নরওয়েতে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮২ হাজার ৬০৭, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। নরওয়ের মুসলিম সমাজ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এখানে কোনো একক জাতিগোষ্ঠীর আধিপত্য নেই। মুসলিমদের বড় অংশের শিকড় পাকিস্তান, সোমালিয়া, ইরাক, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, ইরান এবং তুরস্কে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক কয়েক দশকে জাতিগত নরওয়েজিয়ানদের মধ্যেও ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫৫ শতাংশ রাজধানী অসলো এবং পার্শ্ববর্তী ভিকেন অঞ্চলে বসবাস করেন।

ধর্মীয় জীবন ও মসজিদকেন্দ্রিক কার্যক্রম

বর্তমানে নরওয়েজুড়ে ১৫০টিরও বেশি মসজিদ রয়েছে। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানি প্রবাসীদের উদ্যোগে রাজধানী অসলোতে প্রতিষ্ঠিত হয় দেশটির প্রথম আনুষ্ঠানিক মসজিদ ইসলামিক কালচারাল সেন্টার। এরপর ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সুফি ধারার সেন্ট্রাল জামাত-এ আহলে সুন্নত, যা বর্তমানে পাঁচ হাজারেরও বেশি সদস্য নিয়ে নরওয়ের অন্যতম বৃহৎ ইসলামিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।

নরওয়ের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানকার মুসলিমদের একটি ব্যতিক্রমধর্মী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। গ্রীষ্মকালে রমজান মাসে অনেক এলাকায় রোজার সময় প্রায় ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। দীর্ঘ সময় সিয়াম পালন করেও মুসলিমরা উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে রমজান ও ঈদ উদযাপন করেন। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক কাউন্সিল অব নরওয়ে দেশটির সরকারের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের যোগাযোগ ও সমন্বয়ের প্রধান ছাতা-সংগঠন হিসেবে কাজ করছে।

চ্যালেঞ্জ ও সম্প্রীতির উদাহরণ

ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো নরওয়েতেও ইসলামোফোবিয়া, হিজাব এবং হালাল খাবার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক দেখা গেছে। ২০১৮ সালে নরওয়ের পার্লামেন্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুখাবয়ব ঢাকা পোশাক (নিকাব) নিষিদ্ধ করে আইন পাস করে, যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নরওয়ের মুসলিমরা আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ২০১৫ সালে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে সন্ত্রাসী হামলার পর নরওয়ের মুসলিম তরুণেরা রাজধানী অসলোর প্রধান ইহুদি সিনাগগের চারপাশে ‘শান্তির বলয়’ (Ring of Peace) গড়ে তোলেন। ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি সংহতি প্রকাশ এবং তাদের নিরাপত্তার বার্তা দিতে গৃহীত এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে আন্তধর্মীয় সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে প্রশংসিত হয়।

নরওয়ের মুসলিম সমাজ আজ শুধু একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নয়; বরং দেশটির বহুসাংস্কৃতিক সমাজব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘ ইতিহাস, অভিবাসনের অভিজ্ঞতা, ধর্মীয় চর্চা, সামাজিক অবদান এবং সম্প্রীতির নানা উদ্যোগের মাধ্যমে তারা নরওয়ের সমাজে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। যদিও ইসলামোফোবিয়া ও পরিচয়সংক্রান্ত কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে, তবু পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা এবং ইতিবাচক সামাজিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে নরওয়ের মুসলিমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন।

তথ্যসূত্র: ইসলাম অ্যাওয়ারনেস অবলম্বনে।