ছবি: এএফপি
পরকালের চিরস্থায়ী জীবনে মুমিনরাই হবে একমাত্র সফল, যাদের আল্লাহ–তাআলা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। অতএব, ইহকাল ও পরকালে চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করতে হলে মানুষকে অবশ্যই আদর্শ মুমিনের গুণাবলি অর্জন করতে হবে। কোরআনের বিভিন্ন সুরায় ইমানদারদের এমন কিছু গুণের আলোচনা করা হয়েছে, যা মানবজীবনকে এক বরকতপূর্ণ জিন্দেগিতে রূপান্তর করে।
১. নামাজে বিনয় ও একাগ্রতা
মুমিনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তারা যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন তাদের অন্তরে বিনয়, নম্রতা ও একাগ্রতা জাগ্রত হয়। আল্লাহ–তাআলা বলেন, “মুমিনরা সফল হয়েছে; যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্রতা অবলম্বন করে।” (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ১-২)
নামাজে দাঁড়িয়ে নিজের ক্ষুদ্রতা ও আল্লাহর মহানুভবতা উপলব্ধি করাই খুশুর মূল কথা। মহানবী (সা.) বলেছেন, “কোনো মুসলিম যখন ফরজ নামাজের সময় উত্তমরূপে অজু করে বিনয় ও মনোযোগের সঙ্গে রুকু-সিজদা সম্পন্ন করে, তখন তা তার পূর্ববর্তী পাপের কাফফারা হয়ে যায়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৮; সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৪৫)
২. অনর্থক কথা ও কর্ম পরিহার
ইমানদার ব্যক্তিরা অযথা-অনর্থক কথাবার্তা ও সময় নষ্টকারী কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের সর্বদা দূরে রাখেন। কোরআনের ভাষায়, “যারা অসার কথাবার্তা এড়িয়ে চলে।” (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৩)
মুমিনরা কথা বলার আগে ভেবে নেন যে তা কোনো উপকার বয়ে আনবে কি না। যদি কোনো অনর্থক বিষয়ের মুখোমুখি হন, তবে তাঁরা নিজেদের আত্মমর্যাদা বজায় রেখে তা সুকৌশলে এড়িয়ে চলেন।
আরও পড়ুন: মুমিনের সফল হওয়ার শর্ত কী কী এবং প্রধান বাধাগুলো কী? ২১ মে ২০২৬
৩. নিয়মিত জাকাত প্রদান করা
মুমিনরা শুধু নিজেদের ইবাদত-বন্দেগি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন না, বরং সমাজের প্রতিও লক্ষ্য রাখেন। কোরআনে বলা হয়েছে, “আর যারা জাকাত প্রদানে সক্রিয়।” (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৪)
মহানবী (সা.) বলেছেন, “সাদাকা হলো ইমানের দলিল।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩)
অর্থাৎ দান-সাদাকা ও জাকাত আদায়ের মাধ্যমে বান্দার অন্তরের ইমান ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা প্রমাণিত হয়। জাকাত ধনী ব্যক্তির সম্পদকে পবিত্র ও বরকতময় করে।
৪. যৌনাঙ্গের হেফাজত
চারিত্রিক পবিত্রতা সুরক্ষায় ইসলাম নর-নারী উভয়কে দৃষ্টি সংযত রাখার এবং পর্দা বজায় রাখার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। বিশ্বাসী মুমিনরা পবিত্রতাপ্রিয় হয়ে থাকেন। তারা তাদের লজ্জাস্থানকে শরিয়তসম্মত বৈধ ক্ষেত্র ছাড়া অন্য সব ধরনের ব্যভিচার, পঙ্কিলতা ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখেন। এটি তাদের বংশধারা ও পারিবারিক বন্ধনকে সুরক্ষিত রাখে। (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৫-৭)
৫. আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা
আদর্শ মুমিনের অন্যতম ভূষণ হলো তারা আমানতদারি ও অঙ্গীকার পূর্ণ করে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, “আর যারা নিজেদের আমানতসমূহ ও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করতে যত্নবান।” (সুরা মুমিনুন, আয়াত: ৮)
মুমিনদের কাছে কোনো অর্থ-সম্পদ কিংবা গোপন কথা আমানত রাখা হলে তারা কখনো তার খেয়ানত করে না এবং কাউকে কোনো কথা দিলে বা চুক্তি করলে তা ভঙ্গ করে না। আমানতের খেয়ানত করা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা মোনাফেকের স্পষ্ট আলামত। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩)
৬. মিতব্যয়ী ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনধারা
তারা পরিবারের প্রয়োজনীয় হক ও জীবিকা নির্বাহে যেমন কৃপণতা করে না, তেমনি লৌকিকতা, অহংকার বা অনর্থক কোনো কাজে এক পয়সাও অপচয় করে না। বরং তারা সবসময় মধ্যপন্থা অবলম্বন করে। আল্লাহ–তাআলা তাদের প্রশংসা করে বলেন, “আর যখন তারা ব্যয় করে, তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না; বরং এ দুয়ের মধ্যবর্তী সুষম পন্থা গ্রহণ করে।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৭)
আরও পড়ুন: মুমিনের জীবনে আত্মসমালোচনা কেন জরুরি? ১৫ জুন ২০২৬
৭. শেষ রাতের ইবাদত
ইমানদারদের পুরো রাত নিছক ঘুমের ঘোরে কেটে যায় না। রাতের শেষ প্রহরে তারা আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে যায়। কোরআনে বলা হয়েছে, “তারা রাত কাটায় তাদের প্রতিপালকের উদ্দেশে সিজদাবনত হয়ে ও (নামাজে) দাঁড়িয়ে থেকে।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৪)
এই নির্জন ইবাদত মানুষের আত্মশুদ্ধির জন্য সবচেয়ে বেশি কার্যকর।
৮. জীবনে নম্রতা বজায় রাখা
মুমিনরা পৃথিবীর বুকে ঔদ্ধত্য, অহংকার বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বেড়ান না। তারা লৌকিকতাহীন স্বাভাবিক বিনয় নিয়ে সমাজে বিচরণ করে এবং কোনো মূর্খ লোক তাদের সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হতে চাইলে তারা ‘সালাম’ বলে সুকৌশলে তা এড়িয়ে চলে। তাঁদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন, “আর দয়াময়ের বান্দা তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে...” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৬৩)
৯. মিথ্যা সাক্ষ্য ও পাপের মজলিস পরিহার
মুমিনরা কখনো কোনো মিথ্যাচার, প্রতারণা, জালিয়াতি বা অন্যায় কাজ সমর্থন করে না। আর এটি মুমিনের অন্যতম গুণ। আল্লাহ বলেন, “আর যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না...” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭২)
মহানবী (সা.) মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া এবং মিথ্যা বলাকে কবিরা পাপ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। কোনো ইমানদার জেনেশুনে অন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে না। তাই যেখানে আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপের কাজ হয়, মুমিনরা সেই মজলিস বর্জন করে।
১০. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণচিন্তা
মুমিনরা তাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, সেই কল্যাণচিন্তায় মগ্ন থাকে। তারা আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলে, “হে আমাদের প্রতিপালক, আপনি আমাদের এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন, যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন।” (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭৪)
তারা এমন নেক সন্তান রেখে যেতে চায়, যারা মৃত্যুর পরও তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবে (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬৩১)।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই গুণাবলি অর্জন করে খাঁটি মুমিন হওয়ার তাওফিক দান করুন।
ইলিয়াস মশহুদ: লেখক ও গবেষক
আরও পড়ুন: বিপদে মুমিনের প্রথম করণীয় কী? ০৩ জুন ২০২৬
প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।
ইসলাম থেকে আরও পড়ুন: মুমিন, কোরআনের কথা, আল্লাহ বিশ্বাসী, কোরআনের মানুষ, ইমান, কোরআনের বাণী।



