প্যারিসের কথা দিয়েই শুরু করি, কারণ গল্পটা সেখানেই জন্মেছিল, আর গল্পের গোড়ায় যা ঘটেছিল তা শুনলে অনেকেই অবাক হবেন।১৯৮২ সালের একুশে জুন। গ্রীষ্মের দীর্ঘতম দিন। ফ্রান্সের সংস্কৃতিমন্ত্রী জ্যাক ল্যাং আর তাঁর সংগীত ও নৃত্য পরিচালক মরিস ফ্ল্যর একটা স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্বপ্নটা ছিল সহজ অথচ বারুদভরা। তাঁরা চেয়েছিলেন সংগীত মঞ্চ থেকে নেমে আসুক পথে, কনসার্ট হলের টিকিট-কাটা অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসুক খোলা আকাশের নিচে, পৌঁছে যাক প্রতিটি মানুষের নাগালে। ফ্ল্যরের একটা বাক্যেই পুরো দর্শনটা ধরা ছিল। তিনি বলেছিলেন, সংগীত থাকবে সবখানে, আর কনসার্ট কোথাও নয়।
সে রাতে কী ঘটেছিল? প্রায় কিছুই না। এ কথা বইয়ে বা প্রবন্ধে খুব একটা লেখা হয় না। জেনে রাখা ভালো, অন্য অনেক প্রথম আয়োজনের মতো এ প্রথম আয়োজনটাও তেমন সাড়া ফেলেনি। শৌখিন শিল্পীরা, যাঁদের জন্য পুরো উৎসবটা ভাবা হয়েছিল, সাহস করে তাঁরা রাস্তায় নেমে বাজানোর ঝুঁকি নেননি। গোটা পরিকল্পনাটাই হয়েছিল তাড়াহুড়োয়, কয়েকটা পোস্টার ছাপিয়ে দেয়ালে সেঁটে দিয়ে। অথচ মন খারাপ করা আয়োজকরা নিজেরাও জানতেন না এ ছোট্ট প্রয়াস একদিন কত বড় হয়ে উঠবে।
একটি ফাঁকা রাস্তা থেকে এক কোটি মানুষের উৎসব
এখন একটু লক্ষ করুন আজকের ছবিটা। প্রতি একুশে জুন ফ্রান্সে আঠারো হাজারের বেশি কনসার্ট হয়। হ্যাঁ, প্রায় আঠারো হাজার! প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ শৌখিন শিল্পী আর গায়ক গলা মেলান, যন্ত্র বাজান। দর্শক প্রায় এক কোটি ছুঁয়ে যায়। আর সেই ছোট্ট ফরাসি ভাবনাটা আজ ছড়িয়ে পড়েছে একশো কুড়িটিরও বেশি দেশে, যার একটা আমাদের এই বাংলাদেশ।
একটা ফাঁকা রাস্তা থেকে এক কোটি মানুষের উৎসব। এই যাত্রাটার দিকে তাকালে আমি প্রথম যে শিক্ষাটা পাই, তা সংগীত নিয়ে নয়, ধৈর্য নিয়ে। কোনো বড় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন রাতারাতি আসে না। বীজ বোনার দিন আর অরণ্য হয়ে ওঠার দিনের মাঝখানে অনেকটা সময় থাকে, যে সময়টায় বাইরে থেকে মনে হয় কিছুই হচ্ছে না। প্রথম রাতের নীরবতা দেখে যাঁরা হাল ছেড়ে দিতেন, তাঁরা কোনোদিন এই উৎসব দেখতে পেতেন না। সৃষ্টি জগতে এই কথাটা বারবার সত্যি হয়। একটা গান, একটা বই, একটা স্বপ্ন প্রথম দিনেই সবার মন জয় করবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। যা টেকে, তা ধৈর্যের ভেতর দিয়েই টেকে।
সংগীতের গণতন্ত্র: পেশাদার ও শৌখিনের ভেদ নেই
কিন্তু ফ্ল্যরের ওই বাক্যটায় আরও গভীর একটা কথা লুকিয়ে ছিল, যেটা আমাকে আজও ভাবায়। সংগীত সবখানে, কনসার্ট কোথাও নয়। এর পেছনে যে জরিপটা কাজ করেছিল, সেটাই আসল চমক। ১৯৮২ সালের ওই সমীক্ষায় ধরা পড়েছিল, পঞ্চাশ লক্ষ ফরাসি মানুষ কোনো না কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজায়। প্রতি দুজন তরুণের একজন। অথচ আয়োজিত কনসার্টগুলো ছুঁতে পারত কেবল মুষ্টিমেয় কিছু মানুষকে। মানে, সংগীত মানুষের রক্তে ছিল, কিন্তু মঞ্চটা ছিল গুটিকয়েকের দখলে। এখানেই বিশ্ব সংগীত দিবসের আসল রাজনীতি। এটা আসলে সংগীতের গণতন্ত্র নিয়ে একটা নীরব ঘোষণা। যেখানে পেশাদার আর শৌখিনের ভেদ নেই, যেখানে ঘরানা বা শ্রেণির কোনো উঁচু-নিচু নেই, যেখানে মঞ্চ আর ফুটপাত সমান।
রিকশাচালক রাস্তা পেরোতে পেরোতে যে সুরে গুনগুন করেন, গৃহিণী রান্নাঘরে কাজ করতে করতে যে গান করেন, কলেজছাত্র যে গিটার বাজায় হোস্টেলের ছাদে—এই দিনটা তাঁদের সবার। সংগীত কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। যেখানে যুক্তি আর সৌন্দর্য সবার জন্য উন্মুক্ত হয়, সেখানেই গণতন্ত্র। সুরও তেমনই এক উন্মুক্ত আকাশ, যার নিচে দাঁড়ানোর অধিকার সবার আছে।
একটি গানের দ্বিতীয় জন্ম: লেখকের ভেতর থেকে শ্রোতার বুকে
এবার একটু ভেতরের কথা বলি, কারণ এই উৎসব নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি বাইরের পর্যবেক্ষক হয়ে থাকতে পারি না।চল্লিশ বছর ধরে আমি গান লিখছি। আমি গানের অন্যান্য কিছুর পাশাপাশি গান লিখিনি। আমি মনে করি, গানের পাশাপাশিই আমি বিচিত্র পেশা ও কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছি। আমি গান ছেড়ে যাইনি, এখনও আছি গানের সঙ্গেই, যতদিন বাঁচব, থাকব এই গানের সংস্পর্শেই। এতগুলো বছর পেরিয়ে এসে আমি একটা বিষয় বুঝেছি, যা প্রথম দিকে বুঝতাম না। একটা গান আসলে দুবার জন্মায়। প্রথমবার জন্মায় আমার ভেতরে, কোনো একটা একলা মুহূর্তে, যখন একটা শব্দ বা একটা অনুভূতি বুকের ভেতর কড়া নাড়ে। তখন সেটা শুধুই আমার। আমার ব্যথা, আমার আনন্দ, আমার না-বলা কথা। কিন্তু গানটা সত্যিকারের জন্ম নেয় দ্বিতীয়বার, যখন সেটা আমার হাত ছেড়ে সঙ্গীত পরিচালক, সব যন্ত্রী আর রেকর্ডিং স্টুডিও হয়ে কণ্ঠশিল্পীর কণ্ঠে শ্রোতার বুকে গিয়ে বাসা বাঁধে।
তখন সেটা আর আমার থাকে না। তখন কেউ একজন আমার লেখা লাইন গুনগুন করেন তাঁর নিজের কোনো হারানো মানুষের কথা ভেবে, যে মানুষটার কথা আমি কোনোদিন জানি না, জানবও না।এই জায়গাটায় এসে আমার কাছে সংগীতের সবচেয়ে বড় রহস্যটা ধরা দেয়। কথা যেখানে ফুরিয়ে যায়, সুর ঠিক সেখান থেকে শুরু হয়। আমরা যত কথাই বলি না কেন, একটা সীমার পর ভাষা হার মানে। তীব্র আনন্দ বা গভীর শোক, প্রবল প্রেম বা অসহ্য বিচ্ছেদ—এসব মুহূর্তে মানুষ কথা খুঁজে পায় না। তখনই সে গানের কাছে ফেরে। কারণ গান সেই ভাষায় কথা বলে যা মুখের ভাষার বাইরে।
মানুষ সুখে গায়, দুঃখে গায়, প্রার্থনায় গায়, অনুপ্রেরণায় গায়, এমনকি প্রতিবাদেও গায়। গান লেখা মানে তাই নিজের ভেতরের ঘরটা সবার জন্য একটু খুলে দেওয়া। আর আশ্চর্য এই যে, যত খুলি ততই দেখি মনের ঘরটা শুধু আমার একার ছিল না কোনোদিন।
বাংলাদেশের সংগীতের পথচলা: ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ
এই বিশ্বাস থেকেই আমি কিছু কাজে নিজেকে জড়িয়েছি, যেগুলো আমার ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে আরও অনেকের জীবন ছুঁয়েছে। ক্লোজআপ ওয়ান, তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ—এই আয়োজন দেশের আনাচকানাচে লুকিয়ে থাকা অসংখ্য কণ্ঠকে মঞ্চে তুলে এনেছিল, ঠিক যেমনটা মরিস ফ্ল্যর চেয়েছিলেন, লুকানো সুরগুলোকে সবার সামনে নিয়ে আসতে।
গ্রামের নিভৃত কোণ থেকে উঠে আসা একটা ছেলে বা মেয়ে যখন প্রথমবার লক্ষ মানুষের সামনে গান গাওয়ার সুযোগ পায়, তখন বদলে যায় শুধু তার জীবন নয়, বদলে যায় গোটা একটা পরিবারের স্বপ্নও। পরে গানচিল প্রতিষ্ঠা করে চেষ্টা করেছি সুরের জন্য একটা স্থায়ী ঘর গড়তে, যেখানে নতুন আর পুরোনো গান পাশাপাশি বাঁচতে পারে। আর লিরিসিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের দায়িত্ব আমাকে শিখিয়েছে, গীতিকারের কলম শুধু শব্দ সাজানোর হাতিয়ার নয়, একটা পেশার মর্যাদা রক্ষার অস্ত্রও।
বাংলা গানে গীতিকার বহুকাল আড়ালেই থেকে গেছেন, অথচ গানের প্রাণ তো লুকিয়ে থাকে তার কথায়।এই কথাগুলো লিখতে গিয়ে আমার বারবার একটা প্রশ্ন মনে আসে। ফ্রান্স যখন ১৯৮২ সালে সংগীতকে রাস্তায় নামানোর কথা ভাবছে, বাংলাদেশ তখন কোথায় ছিল?আমার মনে হয়, আমরা অনেক আগেই গানকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছিলাম, কোনো মন্ত্রীর ঘোষণা ছাড়াই, কোনো পোস্টার ছাপানো ছাড়াই। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পরপরই, ১৯৪৮ সালে যখন মাতৃভাষার অধিকার নিয়ে প্রথম প্রশ্ন উঠল, তখন থেকেই সুর হয়ে উঠেছিল আমাদের কণ্ঠস্বর।
এরপর বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আমাদের গান হয়ে উঠেছিল প্রতিরোধের ভাষা। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে যে সুর আজও আমাদের চোখ ভিজিয়ে দেয়, সেই সুর কোনো মঞ্চের অপেক্ষায় বসে থাকেনি, নেমে এসেছিল খালি পায়ে রাজপথে।একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গান ছিল আমাদের হাতিয়ার, শরণার্থী শিবিরে সান্ত্বনা, রণাঙ্গনে সাহস। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান শুনে যে মানুষটা যুদ্ধে গিয়েছিল, তার কাছে সংগীত বিনোদন ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার, স্বাধীনতা অর্জনের কারণ।আর নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে গণতন্ত্রের দাবিতে যখন মানুষ রাজপথে নামল, তখনও মিছিলের সামনের কাতারে গান গাইছিল আমাদের হয়ে।
বিশ্ব সংগীত দিবসের প্রাসঙ্গিকতা: সুরের মর্যাদা রক্ষা
তাহলে কি আমাদের আলাদা করে একটা দিবস দরকার? এই প্রশ্নটা আমি এড়িয়ে যেতে চাই না। আমার উত্তরটা একটু অন্যরকম। বিশ্ব সংগীত দিবস আমাদের কাছে নতুন কিছু শেখানোর জন্য আসে না। এটা আসে আমাদের নিজেদের পরিচয়টা মনে করিয়ে দিতে।লালন থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল থেকে হাছন রাজা, ভাটিয়ালি থেকে ভাওয়াইয়া—এই মাটির প্রতিটি স্তরে সুর গাঁথা আছে। আমরা সংগীত উদযাপন করি, এ কথা বললে আসলে কম বলা হয়। আমরা সংগীতের ভেতরেই বাঁচি।
জন্মের সময় ঘুমপাড়ানি গান, বিয়ের সময় গায়ে-হলুদের গীত, মৃত্যুর সময় শোকের সুর—একটা বাঙালির গোটা জীবনটাই সুরে বাঁধা, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত।তবু এই দিনটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটা একটা উপলক্ষ। আর উপলক্ষেরও দরকার আছে। আজকের দিনে, যখন সংগীত আঙুলের এক ছোঁয়ায় পাওয়া যায়, যখন কোটি গান হাতের মুঠোয় বন্দি, তখন একটা আশঙ্কাও বাড়ছে।
সুর সহজলভ্য হতে হতে কি আমরা সুরের মর্যাদা ভুলে যাচ্ছি? চটজলদি জনপ্রিয়তার দৌড়ে কথার গভীরতা কি হারিয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো আমাকে ভাবায়, একজন গীতিকার হিসেবে এবং একজন শ্রোতা হিসেবেও।আমি অভিযোগ করতে চাই না, কারণ প্রতিটি যুগের নিজস্ব সুর থাকে, নিজস্ব ভাষা থাকে। কিন্তু আমি একটা কথা মনে করিয়ে দিতে চাই—একটা গান যত সহজে বানানো যায়, একটা ভালো গান তত সহজে বানানো যায় না। সুর আর কথার সঙ্গম যত্ন চায়, সময় চায়, সততা চায়।
উপসংহার: সুর সবার হয়ে উঠুক
লেখাটা শেষ করার আগে আমি আবার সেই ফাঁকা প্যারিসের রাস্তায় ফিরে যাই।সেই রাতে যাঁরা স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁরা খালি রাস্তা দেখে ভেঙে পড়েননি। তাঁরা জানতেন, সুর কখনো হারিয়ে যায় না। সুর ফিরে ফিরে আসে, ঠিক যেমন বৃষ্টি ফিরে আসে, যেমন ঋতু ফিরে আসে।
আজ সেই খালি রাস্তা ভরে উঠেছে এক কোটি মানুষের গানে। আমার বিশ্বাস, আমাদের এই বাংলার গানও তেমনই বেঁচে থাকবে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, যদি আমরা একটু যত্ন করি, একটু ভালোবাসি, আর গানের কাছে একটু সৎ থাকি।
আজ বিশ্ব সংগীত দিবসে আমার একটাই অনুরোধ। আজ একটু সময় বের করুন। কোনো একটা পুরোনো গান শুনুন, যেটা আপনার কোনো একটা মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। অথবা নিজেই গুনগুন করুন, বেসুরো হলেও ক্ষতি নেই।কারণ যে মুহূর্তে আপনি গাইছেন, সেই মুহূর্তে আপনি ফ্ল্যরের সেই স্বপ্নটাকে সত্যি করে তুলছেন। সংগীত সবখানে, কনসার্ট কোথাও নয়। সুর তখন আর মঞ্চের নয়, টিকিটের নয়, বিশেষজ্ঞের নয়। সুর তখন আপনার, আমার, আমাদের সবার।
আর গান যেদিন সবার হয়ে ওঠে,সেদিনই সংগীত তার আসল ঘরে ফেরে।



