কবি মাসুদ খানের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তিনি তাঁর কবিতার শুরু, শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি, বিদেশে জীবনযাপন, কবিতার বৈশিষ্ট্য, শব্দ ব্যবহার ও সাহিত্যচিন্তার নানা দিক সম্পর্কে বিস্তারিত কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন গবেষক ও লেখক সাথী নন্দী।
কবিতা লেখার শুরু ও প্রেরণা
মাসুদ খান জানান, তাঁর পরিবারে কেউ সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাঁর কবিতা লেখার শুরু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে, যখন তিনি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন এবং তিতুমীর হলে থাকতেন। সেখানে তাঁর সহপাঠী শামসুল হুদা বাদল তাঁকে কবিতার জগতে উদ্বুদ্ধ করেন। বাদল নিজে কবিতা লিখতেন না, কিন্তু প্রচুর পড়তেন এবং বন্ধুদের কবিতার প্রতি আগ্রহী করে তুলতেন। মাসুদ খানের প্রথম কবিতা ‘আমি স্বতন্ত্র’ দ্বিতীয় বর্ষে লেখা, যা হলো ম্যাগাজিনে ছাপা হয়।
তিনি বলেন, “বাদল ছিল কবিতাপাগল। সে নিজে কবিতা লিখত না, কিন্তু পড়ত প্রচুর; পড়ে শোনাত, বন্ধুদের উদ্বুদ্ধ–অনুপ্রাণিত করত কবিতারাজ্যে বিচরণের ব্যাপারে। আগাগোড়া কবিতা-অন্তঃপ্রাণ একজন মানুষ সে। সে-ই আমার সামনে প্রথম খুলে দিয়েছিল কবিতারাজ্যের দিগন্ত।”
শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি
মাসুদ খানের শৈশব কেটেছে বৃহত্তর বগুড়া জেলার বিভিন্ন জায়গায়, কারণ বাবার ছিল বদলির চাকরি। তিনি জন্মেছেন জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে, কিন্তু পৈত্রিক নিবাস সিরাজগঞ্জে। শৈশবের স্মৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন সোনাতলায় থাকার সময় আখবোঝাই মালগাড়ি থেকে আখ চুরি করে খাওয়া, এবং পাঁচবিবির শিরট্টি তহশিল অফিসে থাকার সময় আতাফল সংগ্রহের কথা। কৈশোর কেটেছে সিরাজগঞ্জের মেছড়া গ্রামে, যমুনা নদীর পশ্চিম পারে। নদীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গভীর ও আধ্যাত্মিক। তিনি একবার নৌকাডুবির সম্ভাবনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার স্মৃতিও বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, “যমুনা যেন আমার অলটার-ইগো। একবার ভাদ্র মাসে আমরা দুই ভাই আর এক ফুফাতো ভাই মিলে ছোট্ট একটি ডিঙিনৌকায় করে গরু-বাছুরের জন্য কাশ-ঘাস কাটতে গিয়েছিলাম সদ্য-জেগে-ওঠা এক অস্থায়ী চরে। ফেরার পথে নদী পাড়ি দিতে গিয়ে পড়ি ঝড়ের কবলে। যমুনায় জেগে ওঠে বড় বড় উথালপাতাল ঢেউ। তার ওপরে বৃষ্টিতে সবকিছু ঝাপসা। পরে একরকম অলৌকিকভাবে নৌকাডুবিতে নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছিলাম সে-যাত্রায়।”
বিদেশে জীবন ও লেখার প্রেরণা
বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে বসবাসরত মাসুদ খান জানান, তিনি টরন্টোর বাংলাপাড়ায় থাকেন, যেখানে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যেই তিনি বাস করেন। তিনি মূলধারা সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। তাঁর মতে, আন্তর্জালিক যোগাযোগের জগতে নিজ সংস্কৃতির মধ্যেই বসবাস সম্ভব।
কবিতার বৈশিষ্ট্য ও ব্যতিক্রমধর্মিতা
মাসুদ খানের কবিতায় প্রকৃতিবিজ্ঞান, জ্যোতিঃপদার্থবিদ্যা ও ব্রহ্মাণ্ডবিদ্যা থেকে উপমা-রূপক এসেছে। তাঁর অনেক কবিতাই মহাজাগতিক ও অধিবাস্তব ঘরানার। তিনি বলেন, “যেকোনো তুচ্ছ, আটপৌরে বিষয়কে এক বড় প্রেক্ষাপটে, কখনো কখনো মহাজাগতিক প্রেক্ষাপটে, যুক্ত করা ও মিলিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা, ভূমিকে ভূমার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার একটা ঝোঁক আছে আমার কবিতায়—এ রকমটা বলে থাকেন কেউ কেউ।”
তিনি বাংলার বাগ্ভঙ্গিমা, বাগ্ধারা, ছন্দভঙ্গি, অলংকার, আচার ও ব্রত, ধর্মপুরাণ, লোকপুরাণ, রূপকথা, উপকথা—এসবের প্রতিফলন ঘটাতে চান তাঁর কবিতায়। তিনি মনে করেন, ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে বাংলা সাহিত্যে পশ্চিমা আধুনিকতা কৃত্রিমভাবে এসেছে, এবং তিনি স্বাভাবিক সমাজবিকাশের ধারায় বাংলা কবিতার গতিপথ কী হতো, সেই প্রশ্ন মাথায় রেখে কাজ করেন।
শব্দ ব্যবহার ও নির্মাণ
মাসুদ খান তাঁর কবিতায় নতুন শব্দ ও শব্দবন্ধ তৈরি, ক্লিশে শব্দের অপ্রথাগত ব্যবহার, নতুন উপমা-উৎপ্রেক্ষা সৃজন করেছেন। যেমন ‘আলকাতরার জলাশয়’, ‘কীটপুত্র’, ‘ক্রোমোজোমের উল্লাস’, ‘সাদা হিংসা’, ‘ছাইরঙা সন্ন্যাস’, ‘অগ্নিপাহাড়’ প্রভৃতি। তিনি বলেন, “ভাষার সর্বোত্তম ব্যবহার ঘটে কবিতায়। নতুন নতুন শব্দ ও শব্দবন্ধ তৈরি, প্রথাগত এমনকি একেবারে ক্লিশে হয়ে যাওয়া শব্দের অপ্রথাগত ব্যবহার, শব্দ থেকে অভিধানসিদ্ধ অর্থের অতিরিক্ত অন্য অর্থ নিষ্কাশন, নতুন নতুন উপমা-উৎপ্রেক্ষা সৃজন, একটি বস্তু বা বিষয়ের রূপ ও গুণ অপর বস্তু বা বিষয়ের ওপর আরোপণ অর্থাৎ মেটাফর…নতুন নতুন মেটাফর সৃজন, এসবই তো ঘটে কবিতায়।”
প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পাখিতীর্থদিনে’
১৯৯৩ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পাখিতীর্থদিনে’র প্রথম কবিতা ‘কুড়িগ্রাম’ নিয়ে তিনি বিস্তারিত বলেন। কবিতাটির প্রেক্ষাপট ছিল ১৯৯১ বা ’৯২ সালে অফিসের কাজে উত্তর বাংলায় ঘুরে বেড়ানোর সময়। তিনি কুড়িগ্রাম শহরের মায়া ও কুহকের বর্ণনা দেন, এবং কবিতায় বাস্তব ও অবাস্তবের মিশেলের কথা বলেন।
তিনি বলেন, “এই সেই কুহকশহর কুড়িগ্রাম। শহরবাঁধের ধারে কংক্রিটের বড় একটি ব্লকের ওপর একদিন এক তারাভরা বসন্তসন্ধ্যায় শুয়ে আছি চুপচাপ। চারদিকে ছোপ ছোপ অন্ধকার, হাওয়া ও নীরবতা। ওপরে নিখিল নভোভারতের রাজ্যে রাজ্যে তখন অন্ধকার ঝোপঝাড়ের মধ্যে জোনাকির মতো জ্বলছে–নিভছে ছড়ানো নক্ষত্ররাজি। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ ধরে লীলালাস্য অবলোকন করছি নক্ষত্রজোনাকির। একসময় হঠাৎ ওজনহীনতার বোধ জাগে। যেন কুড়িগ্রাম তার আলাভোলা আধপাগলা ধরলাকে সঙ্গে নিয়ে ধরণির সব অভিকর্ষ ছিন্ন করে আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছে ওপরে।”
পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ ও কাব্যভাবনার বিবর্তন
মাসুদ খানের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নদীকূলে করি বাস’ (২০০১) প্রথম বইয়ের দীর্ঘ ৭-৮ বছর পরে প্রকাশিত হয়। এতে নানা সময়ের নানা মেজাজের কবিতা সংযোজিত হয়েছে। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সরাইখানা ও হারানো মানুষ’ (২০০৬) থেকে তাঁর কাব্যভাবনা বদলাতে শুরু করে। তিনি বলেন, “কবিতাচর্চার অভিজ্ঞতা থেকে এবং দেশ-বিদেশের নানা কবিতা ও কবিতাবিষয়ক লেখাপত্র পড়ে আমার মধ্যে ধীরে ধীরে এই উপলব্ধি জাগে যে কেবল নিরীক্ষা করে করে কিংবা গাঁথুনি দিয়ে দিয়ে হয় না কোনো ভালো কবিতা। কবিতার মধ্যে আবশ্যিকভাবে থাকতে হয় রুহদারি একটা ব্যাপার, যাকেই হয়তো বলা হয় ‘দুয়েন্দে’, যা কবিতার বিষয়বস্তু ও শৈলী—অতিরিক্ত এক অনির্বচনীয় সৌন্দর্য, যা আত্মার মতো ছাপিয়ে ওঠে কবিতার শরীরকে, তার আধার ও আধেয়কে।”
চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি’ (২০১১) রোমান্টিক ভাব, আধুনিক আঙ্গিক ও মেটাফিজিকসের মিশেলে বিস্ময়কর মিথস্ক্রিয়া তৈরি করেছে। পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ‘এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায়’ (২০১৪) মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বৈষ্ণব পদাবলীর রাধাকৃষ্ণের প্রেমময়তা ও সুফিতত্ত্ব ব্যবহার করা হয়েছে।
গদ্য-আলেখ্য ও উপন্যাস
‘দেহ-অতিরিক্ত জ্বর’ (২০১৫) গ্রন্থটি গদ্য-আলেখ্য, যা কবিতা, কাহিনি, নিবন্ধ বা জার্নাল—কোনোটিই নয়, আবার সবগুলোকেই ছুঁয়ে গেছে। তিনি বলেন, “কিছু বিষয় আছে যেগুলোকে যেভাবে বলতে চাই, সেভাবে বলা যায় না কবিতায়। মূলত কবিতায় যা কিছু বলা সম্ভব হয়নি, যা কিছু থেকে গেছে অকথিত, সেসব অকথিত কথা নিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে বলার প্রয়াস ও ফলাফল হচ্ছে এই গদ্য-আলেখ্যগুলো।”
‘প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান’ (২০১৬) উপন্যাসটি বগুড়া ও জয়পুরহাট অঞ্চলের পটভূমিতে রচিত। এতে বাস্তব ও ফ্যান্টাসির মিশেল রয়েছে। উপন্যাসের মধ্যভাগ থেকে আবির্ভূত হয়েছে হকসেদ নামে এক অদ্ভুত চরিত্র, যে ছিঁচকে চোর কিন্তু মহাজ্ঞানী। উপন্যাসটি চেতনাপ্রবাহধর্মী নয় বলে মন্তব্য করেন মাসুদ খান।
সাহিত্যচর্চা ও বইপড়া
মাসুদ খান নিজেকে সবচেয়ে কম-বই-পড়া লেখক হিসেবে দাবি করেন। তাঁর পড়া সিস্টেমেটিক নয়, অগোছালো। তিনি বলেন, “সাধারণভাবে একজন সংবেদনশীল ও আগ্রহী মানুষ নানা রকম ডিসিপ্লিন থেকে যতটুকু বই পড়ে, সে রকমই পড়া আমার। বেশি কিছু নয়।”
প্রকাশিত গ্রন্থ
মাসুদ খানের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: ‘পাখিতীর্থদিনে’ (১৯৯৩), ‘নদীকূলে করি বাস’ (২০০১), ‘সরাইখানা ও হারানো মানুষ’ (২০০৬), ‘আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি’ (২০১১), ‘এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায়’ (২০১৪), ‘দেহ-অতিরিক্ত জ্বর’ (২০১৫), ‘প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান’ (২০১৬), ‘প্রসন্ন দ্বীপদেশ’ (২০১৮), ‘গদ্যগুচ্ছ’ (২০১৮), ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (২০১৮), ‘পাখপাখালির গান পাগলাঝোরার তান’ (২০১৯), ‘ঊর্মিকুমার ঘাটে’ (২০২০), ‘দুঃস্বপ্নের মধ্যপর্ব’ (২০২২), ‘কবিতাসংগ্রহ’ (২০২৫) ও ‘বিছুটিপাতার অটোগ্রাফ’ (২০২৬)।
পরিচিতি
মাসুদ খানের জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ। তিনি প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক ও ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। পেশায় তড়িৎ ও ইলেকট্রন প্রকৌশলী। বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে বসবাস করেন এবং টরন্টোর সেন্টেনিয়াল কলেজে শিক্ষকতা করেন।



