প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের একান্ত আপনজন। রাজধানীর আগারগাঁওস্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘সপ্তত্রিংশ (৩৭তম) জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত উৎসব’-এ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে নিজের বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন ও বাংলার সাথে সম্পর্ক
তিনি বলেন, “রবীন্দ্রনাথের যে রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠা, তিনি ছিলেন বাংলার মানুষ, বাংলার জলবায়ু, বাংলার নদ-নদী ও বাংলা শ্যামলিমার ভেতরে বিচরণ করার জন্যই। তার জীবনদেবতা তো এই বাংলার ওপরেই স্থাপিত হয়ে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। এবং তাকে ধীরে ধীরে উজ্জীবিত করে তুলেছিল পৃথিবীর সম্মুখে তার নিজস্ব দর্শন নিয়ে উপস্থিত হতে। তিনি ছিলেন মানুষের রবীন্দ্রনাথ, কল্যাণের রবীন্দ্রনাথ, সৌন্দর্যের রবীন্দ্রনাথ, অসাম্প্রদায়িক রবীন্দ্রনাথ। তাই রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের একান্ত আপনজন।”
উৎসবের আয়োজন ও তাৎপর্য
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তাঁর জীবনদর্শন ও কালজয়ী কর্মকে প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা। কবিগুরুর ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত ৩৭তম জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত উৎসব তাই কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে কবির প্রতি সংস্থার এক গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মিলিত প্রাণের শ্রদ্ধার্ঘ্য।
প্রথম দিনের অনুষ্ঠান
রাজধানীর আগারগাঁওস্থ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে ‘সপ্তত্রিংশ (৩৭তম) জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত উৎসব’-এর প্রথম দিনটি ছিল আনন্দ ও শোকের এক অনন্য সংমিশ্রণ। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশনে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শব্দসৈনিক শিল্পী তিমির নন্দীকে ‘কলিম শরাফী পুরস্কার ও সম্মাননা’ প্রদানের মধ্য দিয়ে উৎসবের জৌলুস ফুটে ওঠে।
বিকেলের এই অধিবেশনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা, বরেণ্য শিল্পী তিমির নন্দীর হাতে সম্মাননা তুলে দেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পিযুশ বড়ুয়া। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও উদ্বোধক অধ্যাপক আনোয়ারা সৈয়দ হকের হাতে শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেন সংগঠনের সহসভাপতি খন্দকার খায়রুজ্জামান কাইয়ূম।
তিমির নন্দীর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া
সম্মাননা গ্রহণের পর এক আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় তিমির নন্দী বলেন,“আমি হয়তো এতো বড় শিল্পী না।এই সম্মাননার যোগ্য কিনা আমি জানি না। কলিম শরাফী ভাইয়ের শুভ জন্মদিনে পুরস্কার এবং সম্মাননা আমি নিচ্ছি। আমি ভীষণভাবে আপ্লুত এবং গর্বিত। অনেক বছর আমি তাঁর সান্নিধ্যে ছিলাম। তিনি কোনোদিন কারও কাছে মাথা নোয়াননি। এক বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব—কলিম শরাফী একজন মানুষ নন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান।”
সাংস্কৃতিক পরিবেশনা
বিকেলের এই দ্বিতীয় পর্বটি ছিল কেবল সম্মাননা প্রদান নয়, বরং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে ভরপুর। অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের নানা পর্যায়ের গান, সমবেত সংগীত, নাচ ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মূর্ছনায় শিল্পীরা পুরো মিলনায়তন মাতিয়ে রাখেন। ধ্রুপদী নৃত্য ও সুরের আবেশে শ্রোতারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন রবীন্দ্র-চেতনার এক আধুনিক উপস্থাপন।
প্রথম দিনের সূচনা পর্ব
এর আগে দিনের প্রথম ভাগে সকাল ১০টায় প্রাতঃকালীন অধিবেশনের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয়। সূচনালগ্নে সমবেত কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন সংগীতাঞ্জলি পরিবার ও বুলবুল ললিতকলা একাডেমির শিল্পীরা। একক পর্বে গান শোনান মুক্তি নন্দী, কবিতা কর্মকার, জাফর সাদিকসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রয়াত কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোঁসলে, শাহজাহান হাফিজ এবং ডালিয়া নওশীনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন
দিনভর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণ মুখরিত ছিল রবীন্দ্রানুরাগীদের উপস্থিতিতে। উৎসবের দ্বিতীয় তথা শেষ দিন আগামীকাল শনিবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হবে প্রাতঃকালীন অধিবেশন, যেখানে থাকবে সমবেত ও একক গান। সমাপনী অধিবেশনে বিকেলে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মফিদুল হক। আবৃত্তি ও সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে দুই দিনব্যাপী এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের।



