টিয়াপাখিরা কীভাবে মানুষের মতো কথা বলে?
টিয়াপাখিরা কীভাবে মানুষের মতো কথা বলে?

বাস্তবে কখনো এমন টিয়াপাখি দেখেছেন, যেটি অবিকল মানুষের কণ্ঠে গান গাইছে, কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করছে কিংবা রেগে গিয়ে মালিকের সঙ্গে ঝগড়া করছে? হয়তো কোনো পাখির দোকানে বা কোনো বন্ধুর বাসায় এমন টিয়া দেখে থাকবেন। অন্তত ভিডিওতে তো দেখেছেন নিশ্চয়ই! যখন কোনো পাখি হঠাৎ বলে ওঠে, ‘কেমন আছ?’ বা ‘তোমার নাম কী?’, তখন অবাক না হয়ে উপায় থাকে না। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, পাখি হয়েও তারা ঠিক মানুষের মতো কথা বলে কীভাবে? আর কেনই–বা তারা এই কাজ করে?

পাখির ভাষা বনাম মানুষের ভাষা

প্রথমেই একটা মজার বিষয় পরিষ্কার করা যাক। কারিগরি দিক থেকে দেখলে, পৃথিবীর প্রায় সব পাখিই কিন্তু ‘কথা’ বলে! তবে তাদের ভাষা আমাদের মতো নয়। তারা বিভিন্ন ধরনের শিস বা আওয়াজ করে একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে। যেমন, কোনো শিকারি প্রাণী কাছে এলে অন্য পাখিদের সতর্ক করতে তারা একরকম ডাক দেয়, আবার সঙ্গী খোঁজার জন্য অন্য রকম ডাক ব্যবহার করে। কিন্তু আমরা যখন ‘কথা বলা পাখি’ বলি, তখন মূলত সেই পাখিদের বোঝাই, যারা মানুষের কথা বা অন্য কোনো শব্দ নকল করতে পারে।

শব্দ নকল করার ক্ষমতা

পাখিদের এই শব্দ নকল করার ক্ষমতাটি খুবই বিরল। তবে টিয়াপাখির পাশাপাশি কাক, দাঁড়কাক, স্টার্লিং ও ময়না পাখিরও এই বিশেষ ক্ষমতা আছে। কিন্তু তারা এই কঠিন কাজটি করে কীভাবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের শরীর ও মস্তিষ্কের ভেতর।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সিরিংক্স: পাখির বিশেষ অঙ্গ

মানুষের গলা থেকে শব্দ বের হওয়ার জন্য ল্যারিংস বা ভয়েস বক্স থাকে। কিন্তু পাখিদের তো সেটা নেই! এর বদলে পাখিদের বুকে অনেক গভীরে সিরিংক্স নামে একটি বিশেষ অঙ্গ থাকে। এটি মানুষের ল্যারিংসের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত ও দক্ষ। এই সিরিংক্সের সাহায্যেই পাখিরা তাদের শ্বাস–প্রশ্বাস ও শরীরের ভেতরের কম্পনকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ফলে তারা এমন সব শব্দও তৈরি করতে পারে, যা তাদের নিজেদের প্রাকৃতিক ভাষার অংশ নয়। যেমন তারা মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে!

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মস্তিষ্কের সং সিস্টেম

শুধু শরীর থাকলেই তো হবে না, সেই শরীরকে চালানোর মতো বুদ্ধিও দরকার। যেসব পাখি মানুষের কথা নকল করতে পারে, তাদের মস্তিষ্কে সং সিস্টেম নামের একটি বিশেষ অংশ থাকে। এটি অনেকটা উন্নত কম্পিউটারের নিউরাল নেটওয়ার্কের মতো কাজ করে। এই সিস্টেমের কারণেই তারা মানুষের কঠিন ও জটিল শব্দগুলো শিখতে ও হুবহু মনে রাখতে পারে।

কেন তারা মানুষের কথা বলে?

এখন প্রশ্ন হলো, তারা কেন মানুষের মতো কথা বলার চেষ্টা করে? টিয়াপাখিরা কি তবে মানুষের সঙ্গে আড্ডা দিতে চায়? আসলে টিয়াপাখি হলো অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। বন্য পরিবেশে তারা অন্য টিয়াপাখিদের সঙ্গে খুব গভীর সম্পর্ক তৈরি করে, একসঙ্গে দল তৈরি করে থাকে। তারা নিজেদের মধ্যে সব সময় যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। কিন্তু যখন কোনো টিয়াপাখিকে খাঁচায় বা মানুষের বাড়িতে আটকে রাখা হয়, তখন তাদের সেই আপন দল আর থাকে না। তাই তারা মানুষকেই তাদের নতুন দলের সদস্য বলে ধরে নেয়!

যখন কোনো পোষা টিয়া আপনার বলা কথা নকল করতে শুরু করে, তখন সে আসলে শুধু মজার ছলে এটা করে না। সে আসলে আপনার সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি করতে চায়। তার এই কথা বলার মানে হলো, ‘বন্ধু, তুমি এখন আমার দলের অংশ, তাই আমি তোমার ভাষা শেখার চেষ্টা করছি।’ অর্থাৎ টিয়াপাখিরা আসলে তাদের ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের টানেই মানুষের ভাষা শেখে!

পাখিরা কি কথার অর্থ বোঝে?

তাহলে কি পাখিরা আমাদের কথার অর্থও বোঝে? বিজ্ঞানীদের মতে, ব্যাপারটা এতটা সহজ নয়। পাখিরা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারে যে কোন শব্দের পর কী ঘটে। যেমন সে হয়তো শিখেছে যে ‘হ্যালো’ বললে আপনি খুশি হয়ে হাসেন বা ‘বিস্কুট’ বললে তাকে খেতে দেওয়া হয়। তাই তারা নির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়ার জন্য ওই শব্দগুলো ব্যবহার করে। মানুষের মতো ব্যাকরণ বা ভাষার পুরো অর্থ তারা হয়তো বোঝে না। কিন্তু কোন কথা বললে কী পাওয়া যাবে, সেটা তারা খুব ভালোভাবেই জানে।

বিশেষ কিছু পাখির কীর্তি

তবে কিছু পাখি আবার বিজ্ঞানীদেরও তাক লাগিয়ে দিয়েছে। যেমন ১৯৯৪ সালে মারা যাওয়ার আগে ‘পাক’ নামে একটি বাজরিগর পাখি প্রায় ১ হাজার ৭২৮টি ইংরেজি শব্দ শিখেছিল! এর জন্য পাক গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসেও জায়গা করে নিয়েছিল। এমনকি সে ছোট ছোট বাক্যও তৈরি করতে পারত।

আবার গবেষকেরা এটাও দেখেছেন, কিছু টিয়াপাখি নিজেদের নাম পর্যন্ত মনে রাখতে পারে এবং অন্যদের ডাকতে পারে! মানুষের মতো টিয়াপাখিরাও খুব জটিল সামাজিক জীবন কাটায়। তাই দলের সবাইকে চিনে রাখার জন্য তাদের এই নাম মনে রাখার ক্ষমতাটি দারুণ কাজে লাগে। অনেক সময় মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য তারা নিজেরাই নিজেদের নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু করে দেয়!