দার্শনিক ও চিন্তক সরদার ফজলুল করিমের ১০১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে উইমেনস ভলান্টারি অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউভিএ) মিলনায়তনে আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সরদার ফজলুল করিম স্মৃতি পরিষদ।
মানুষ গড়ে ওঠে স্থান, কাল ও পরিবেশে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, যেকোনো মানুষ গড়ে ওঠে তাঁর স্থান, কাল ও পরিবেশের ওপর। সেখান থেকে আলাদা করে কাউকে দেবতা বানালে তাঁর নির্যাসটা থাকে না। কোনো মানুষ দেবতা নন, পূর্ণ বা নিখুঁতও নন। সরদার ফজলুল করিমও তা-ই। তিনি ছিলেন মানবতার দার্শনিক, শোষণহীন সমাজের প্রতিভূ।
এম এম আকাশ আরও বলেন, সরদার ফজলুল করিমকে দেখতে হবে তাঁর স্থান ও কালের পরিপ্রেক্ষিতে। কমিউনিস্ট আন্দোলন যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, সেই কালের মানুষ ছিলেন তিনি। সেই যুগ যে মানুষ তৈরি করেছিল, সে ধরনের মানুষ আর পাওয়া যাবে কি না, বলা কঠিন।
শোষণহীন সমাজের লড়াই
এম এম আকাশ বলেন, ‘আমরা যে সমাজের স্বপ্ন দেখি, সেটিকে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ইত্যাদি অনেক বিশেষণ আমরা দিই। সরদার ভাই শুধু একটি বিশেষণ দিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে আমরা লড়াই করি শোষণহীন সমাজের জন্য। তাঁর কথা ছিল পরিষ্কার-যে যেখানেই থাকুন, আমরা শোষণবিরোধী সংগ্রামে শোষিতের পক্ষে।’
সরলতা ও স্পষ্টতার প্রতীক
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, সরদার ফজলুল করিম অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা সহজভাবে বলে গেছেন। তাঁর সঙ্গে একবার সাক্ষাৎ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তখন স্যারের মানসিক অবস্থা অনেক খারাপ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। তাঁর ডিমেনশিয়া হয়েছিল, ফলে ভুলে যেতেন অনেক কিছুই। যে বিষয়টা খুবই মুগ্ধ করেছিল, সেটি হচ্ছে তিনি নিজের বিষয়গুলো নিজেই করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি কারও সাহায্য চাইছিলেন না।
এসেয়িস্ট ধারা
আলোচনায় অংশ নিয়ে মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সরদার ফজলুল করিমের ভাবনা ও দর্শন মানুষকে পথ দেখাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন দার্শনিকতার ইতিহাসের ধারাক্রমে সরদার ফজলুল করিমের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, জীবনজুড়ে তাঁর তর্ক ছিল যেকোনো নিশ্চয়তাবোধ ও সহজসাপ্টা উত্তরের বিরুদ্ধে। তিনি ছিলেন প্রশ্নের প্রক্রিয়ার মধ্যে। প্রশ্ন ও সংশয় দুটোকেই তিনি সঙ্গে রেখেছেন। সরদার স্যারের দার্শনিকতার ধারাটিকে বলা হয় এসেয়িস্ট ধারা (প্রাবন্ধিক ধারা)।
কাবেরী গায়েন আরও বলেন, দুঃখভোগের মধ্য দিয়ে গেলেও সরদার ফজলুল করিম অর্থপূর্ণ কাজ করেছেন। কারাবাস বা অন্য কোনো কিছুই তাঁকে ভাঙতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘তাঁর কাছ থেকে একটা কথা আমরা শিখেছি, সেটা হচ্ছে সততা ও স্পষ্টতার সঙ্গে চিন্তা করতে পারা। সমাজের বঞ্চনা কমিয়ে আনার জন্য নিরন্তর প্রশ্ন করা ছিল তাঁর কাজ।’
রচনাবলি ইংরেজিতে অনুবাদের প্রস্তাব
অনুষ্ঠানের আয়োজকদের পক্ষে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার। সরদার ফজলুল করিমের রচনাবলি ইংরেজিতে অনুবাদ ও তাঁকে নিয়ে সুসম্পাদিত একটি গ্রন্থ প্রকাশের প্রস্তাব দেন তিনি। এ ছাড়া সরদার ফজলুল করিমের দর্শনের চর্চা যাতে সারা বছর হয়, সেই উদ্যোগ নেওয়ার কথাও তিনি বলেন।
সারল্যের হাসি
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, দার্শনিক সরদার ফজলুল করিমের মুখে সব সময় সারল্যের হাসি থাকত। আজকে নগরায়ণ কিংবা সংস্কারের আলাপে কোনো দর্শন নেই।
পরিবারের স্মৃতিচারণ
সরদার ফজলুল করিমের মেয়ে আফসানা করিম স্বাতী অনুষ্ঠানে তাঁর মা সুলতানা রাজিয়া কলির কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৫৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বাবার জীবনসঙ্গী হয়েছিলেন মা। ২০০৯ সালের ২৩ আগস্ট তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগপর্যন্ত বাবার ছায়াসঙ্গী ছিলেন মা। বাবা যখন কারাগারে ছিলেন, তখন মা অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন। তিনি আরও জানান, তাঁর মা নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, আবার অধীর আগ্রহ নিয়ে উত্তম-সুচিত্রার সিনেমাও দেখতেন।
অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সরদার ফজলুল করিমের জামাতা শাকিল আখতার। আরও বক্তব্য দেন অধ্যাপক এম এ আজিজ মিয়া, বামধারার রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শাহীন রহমান ও সুব্রত ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানের শুরু ও শেষ হয় বাঁশির সুরে। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে ছিল আবৃত্তি পরিবেশনা।



