আনিসুজ্জামানের সাক্ষাৎকার: রবীন্দ্রনাথ, মুক্তিযুদ্ধ ও সাহিত্যচর্চা
আনিসুজ্জামানের সাক্ষাৎকার: রবীন্দ্রনাথ থেকে মুক্তিযুদ্ধ

প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, গবেষক ও লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন, রবীন্দ্রচর্চা, ছাত্ররাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলা সাহিত্যের নানা দিক।

অবসর ও বর্তমান কর্মকাণ্ড

আনিসুজ্জামান জানান, তিনি ২০০৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন। এরপর বছরখানেকের বেশি সময় পর সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক হিসেবে পুনরায় যোগ দেন। গত বছরের জুনে বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ইমেরিটাস প্রফেসর পদে উন্নীত করে। ইমেরিটাস প্রফেসর হিসেবে তিনি আমৃত্যু এই অবস্থায় থাকবেন। এছাড়া তিনি ঢাকা থেকে প্রকাশিত মাসিক সাহিত্যপত্র কালি ও কলম-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ছাত্ররাজনীতি ও শিক্ষার অবনতি

ছাত্ররাজনীতির নামে নানা সুবিধাবাদী কর্মকাণ্ড, মারামারি ও চাঁদাবাজিকে রাজনীতি বলা যায় না বলে মন্তব্য করেন তিনি। শিক্ষকেরা যে স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিলেন, তা পাওয়ার পরেও রাজনৈতিক দলাদলিতে জড়িয়ে পড়েছেন। আগে শিক্ষকেরা বৃহত্তর আদর্শের ভিত্তিতে বিভক্ত থাকতেন, যেমন আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সময় একদল সরকারকে সমর্থন করতেন, আর অনেকে বিরোধিতা করতেন। তখন নিজেদের কোনো পদ বা সুবিধা পাওয়ার বিষয় ছিল না। বর্তমানে শিক্ষকেরা রাজনৈতিক দলকে পরামর্শ দেন এবং রাজনৈতিক নেতারা তাঁদের শ্রদ্ধার সঙ্গে ডেকে নিয়ে যান। এখন রাজনৈতিক দলই অনেকখানি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছাত্ররাজনীতি বন্ধের প্রসঙ্গ

ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করলে উপকার পাওয়া যাবে না বলে মনে করেন আনিসুজ্জামান। তাঁর মতে, সুষ্ঠু রাজনীতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। ছাত্ররা কথা বলুক, মতামত দিক, অ্যাকটিভিজমের মধ্যে থাকুক; কিন্তু তারা যেন সংঘাত, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিতে না জড়ায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রবীন্দ্রচর্চা ও প্রতিবাদ

পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথ যখন পরিত্যাজ্য ছিলেন, তখন আনিসুজ্জামান ও তাঁর বন্ধুরা প্রথম রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন শুরু করেন। তিনি নিজে রবীন্দ্র শতবর্ষের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত ছিলেন। বাংলা একাডেমি কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে তিনটি কমিটি গঠিত হয় এবং কর্মসূচি সমন্বয় করে কাজ করা হয়। ১৯৬৭ সালে তাঁর ছাত্র আহমদ ছফা ও কাজী সিরাজ তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে লেখার একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সংকলন করার প্রস্তাব দেন। তিনি প্রায় ৫০ জন লেখককে লিখতে বলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন বিবৃতি দেন যে বেতার-টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথের গান ক্রমশ হ্রাস করা হবে, কারণ এগুলো পাকিস্তানের আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তখন ১৯ জন এর প্রতিবাদ করেন। মুনীর চৌধুরী প্রতিবাদের বিবৃতি লেখেন, আর আনিসুজ্জামান বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেন। এর ফলে সংকলনটি সরকারি নীতির প্রতিবাদমূলক ইস্যুতে পরিণত হয়। ১৯৬৮ সালে রবীন্দ্রনাথ নামে সংকলনটি প্রকাশিত হয়, যা সাহিত্যচিন্তা ও রবীন্দ্রনাথের প্রতি গৌরববোধের প্রতিফলন।

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণা

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রি ও স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য সম্পর্কে আনিসুজ্জামান বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর নামে একটি স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়, যা আওয়ামী লীগ নেতা হান্নান স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচার করেন। চট্টগ্রামে সেটা মুদ্রিতও হয়েছিল। এরপর জিয়াউর রহমান ঘোষণা দেন, প্রথমে নিজেকে রাষ্ট্রপতি বলে অভিহিত করে, পরে সংশোধন করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা দেন। জিয়াউর রহমানের ঘোষণা অনেক সাহস জুগিয়েছিল, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর জায়গা তিনি নিতে পারেন না।

বাংলা সাহিত্যের অবস্থান

বাংলা ভাষা বিশ্বের পঞ্চম স্থানে থাকলেও বাংলা সাহিত্য সে তুলনায় কোথায় দাঁড়িয়ে আছে—এ প্রশ্নের জবাবে আনিসুজ্জামান বলেন, বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করা কঠিন। তবে আমাদের সাহিত্য যখন অনুবাদ হয়, বাইরে তা ভালোভাবে গৃহীত হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লালসালু-র ইংরেজি অনুবাদ ট্রি উইদাউট রুটস-এর কথা বলেন, যা ইউনেসকো থেকে প্রকাশিত হয়। হাইনেম্যান প্রকাশনীর মডার্ন এশিয়ান লিটারেচার সিরিজে রবীন্দ্রনাথের চতুরঙ্গ ও শওকত ওসমানের জননী অন্তর্ভুক্ত ছিল। শামসুর রাহমানের মৃত্যুর পর গার্ডিয়ান-এ উইলিয়াম রাদিচের বিস্তৃত শোকবার্তা থেকে সাহস করে বলা যায়, আমাদের সাহিত্য সমাদৃত হয়। তবে পর্যাপ্ত অনুবাদ না হওয়ায় তা বাইরে যাচ্ছে না।

নিজের সাহিত্যচর্চা

আনিসুজ্জামান অল্প বয়সে ছোটগল্প লিখে শুরু করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে উপলব্ধি করেন যে গল্প না লিখলে কারও ক্ষতি হবে না, তাই প্রবন্ধের দিকে ঝুঁকেন। তাঁর প্রথম বই মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয়, যা তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের গ্রন্থরূপ। তিনি মূলত তিনটি স্তরে কাজ করেছেন: প্রথমত, ঊনবিংশ শতাব্দীর মুসলমান লেখকদের চিন্তাধারা; দ্বিতীয়ত, বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়; তৃতীয়ত, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের আগের ২০০ বছরের বাংলা গদ্যের ধারা। এ বিষয়ে তাঁর বই পুরোনো বাংলা গদ্য। এখন তিনি উপকরণ সংকলন করে সবার সামনে উপস্থিত করতে চান। এছাড়া বাংলা একাডেমি থেকে পাঁচ খণ্ডে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে, যার প্রধান সম্পাদক তিনি। প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে, দ্বিতীয় খণ্ড এ বছর বের হবে। জীবদ্দশায় তৃতীয় খণ্ড বের করতে পারলে সন্তুষ্ট হবেন। তাঁর স্মৃতিকথামূলক লেখায় কাল নিরবধি-তে পূর্বপুরুষ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়, আমার একাত্তর-এ মুক্তিযুদ্ধ, এবং বর্তমানে বিপুলা পৃথিবী-তে ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত সময় নিয়ে লিখছেন।

বড় পালাবদলের অভিজ্ঞতা

ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ—এক জীবনে তিনটি বড় পালাবদল দেখা প্রসঙ্গে আনিসুজ্জামান বলেন, তিনি আর বড় কোনো রূপান্তর দেখবেন বলে মনে করেন না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মুহূর্তের আবেগ তাঁর জীবনের পরম সম্পদ। তিনি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যেদিন স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন, নিজে গাড়ি চালিয়ে সীমান্ত পার হয়ে দুহাতে মাটি তুলে নিয়েছিলেন। তিনি স্বভাবতই খুব সেন্টিমেন্টাল নন, কিন্তু সেই তৃপ্তি ও অর্জনের অনুভূতি অতুলনীয়।