২০২১ সালের আগস্ট মাসে চরকির সাবস্ক্রিপশন নেওয়ার পর থেকে লেখক খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার মনে করেন, বাংলাদেশি মানসম্মত কনটেন্টের জন্য আর অপেক্ষা করতে হলো না। চরকির পাঁচ বছরের যাত্রায় তিনি দেখেছেন, প্ল্যাটফর্মটি প্রতি মাসে গড়ে দুটি অরিজিনাল কনটেন্ট এনেছে—ড্রামা সিরিজ, শর্টফিল্ম, টেলিফিল্ম, ফিল্ম ও ডকুমেন্টারি মিলিয়ে ১২০টির বেশি। রোমান্স, রাজনীতি, অপরাধ, সায়েন্স ফিকশন, ভৌতিক-আধিভৌতিক—বিষয়বৈচিত্র্যে চরকি বিচরণ করেছে নির্দ্বিধায়।
থ্রিলার ও রোমান্সে সাফল্য
চরকির সবচেয়ে জনপ্রিয় কনটেন্ট তার থ্রিলার সিরিজ ও সিনেমা। ‘মরীচিকা’, ‘ঊনলৌকিক’, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘৭ নাম্বার ফ্লোর’, ‘রেডরাম’, ‘শাটিকাপ’, ‘কালপুরুষ’, ‘সিনপাট’, ‘গুটি’, ‘ক্যাকটাস’, ‘দাগি’, ‘তুফান’, ‘তাণ্ডব’ ও ‘দম’—এই কনটেন্টগুলো অশ্লীলতা বা গালাগালি ছাড়াই কাহিনি, অভিনয় ও পরিচালনার গুণে দর্শককে রোমাঞ্চ দিয়েছে। ‘সিন্ডিকেট’ সিরিজের স্পিন-অফ ‘মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন’ ও ‘অ্যালেন স্বপন ২’ খুব জনপ্রিয় হয়েছে। লেখকের মতে, ‘সিন্ডিকেট’ সিরিজের সিক্যুয়েল হলে আরও ভালো হতো।
রোমান্সেও চরকি টেলিভিশনের গৎবাঁধা ধারা ভেঙে এ সময়ের তরুণ-তরুণীদের রোমান্স ফুটিয়ে তুলেছে। ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’, ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’, ‘ফরগেট মি নট’, ‘৩৬-২৪-৩৬’ ও ‘লিটল মিস ক্যাওস’—এই কনটেন্টগুলো দেখে লেখকের তাই মনে হয়।
সামাজিক ইস্যুতে শক্তিশালী উপস্থাপন
লেখকের মতে, চরকির সেরা কনটেন্ট সেগুলোই যেগুলো নানা সামাজিক সমস্যাকে শিল্পসম্মতভাবে তুলে ধরেছে। নারীবিদ্বেষ, বৈষম্য, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কাজ করলেও চরকি কখনো গল্প বা শিল্পমানের সঙ্গে আপস করেনি। উদাহরণ হিসেবে ‘চা গরম’, ‘রেহানা মরিয়ম নূর’, ‘স্কুটি’, ‘তনয়া’, ‘দুই দিনের দুনিয়া’, ‘প্রিয় মালতী’, ‘আমলনামা’, ‘জয়া আর শারমিন’ ও সদ্য আসা ‘লাইফলাইন’-এর নাম উল্লেখ করেন তিনি।
চরকি গিয়াসউদ্দিন সেলিম, রায়হান রাফী, ভিকি জাহেদ, আদনান আল রাজীব, অনম বিশ্বাস, পিপলু আর খান, শিহাব শাহীনের মতো প্রতিষ্ঠিত পরিচালকদের বড় ক্যানভাসে কাজের সুযোগ দিয়েছে। পাশাপাশি মিজানুর রহমান আরিয়ান, নুহাশ হুমায়ূন, রবিউল আলম রবি, শঙ্খ দাশগুপ্ত, সৈয়দ আহমেদ শাওকী, মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের মতো পরিচালকদের কাজ দর্শকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বাংলাদেশ সরকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ নিয়ে ভাবছে—এটি আশার কথা। লেখকের মতে, চরকির মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্ম সরকারের জন্য ভালো সূচনাবিন্দু হতে পারে। রাজশাহীর তরুণ নাট্যজনরা চরকির প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নাটক ও সিনেমা তৈরির প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ অবকাঠামো তৈরি করতে শুরু করেছেন। সরকারি-বেসরকারি প্রণোদনা পেলে চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর, বরিশালেও এমন আঞ্চলিক অবকাঠামো গড়ে উঠতে পারে।
চরকিকে ব্যবসায়িকভাবে সফল হতে হলে বিশ্বমানের বাংলা কনটেন্ট তৈরি করতে হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আনার নীতিগত বাধা পার হতে হবে। সরকার নীতিগত ও কূটনৈতিক সহায়তা দিলে ক্রিয়েটিভ ইকোনমির বিস্তার ত্বরান্বিত হবে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে চরকির সঙ্গে কিছু কনটেন্ট সহ-প্রযোজনা করছে; এ ধারা অব্যাহত থাকুক এবং বাড়ুক।
দর্শকের দায়িত্ব
সবচেয়ে বড় দায়িত্ব দর্শকের। লেখক বলেন, “দেশের সমর্থ দর্শক যদি বেশি হারে চরকি সাবস্ক্রাইব করেন, তবেই চরকির পক্ষে আরও বেশি, আরও ভালো মানের কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব। বিনা মূল্যে যে ভালো কনটেন্ট উপভোগ করা যাবে না, দর্শক হিসেবে এত দিনে সে সত্য আমরা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করেছি।”
পাঁচ বছর পূর্তিতে চরকিকে শুভেচ্ছা জানিয়ে লেখক বলেন, স্ট্যান্ডআপ কমেডি নিয়ে চরকির আরও কাজ করা দরকার। বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসের মণিমুক্তাকে কনটেন্টে পরিণত করার কাজ আরও নিষ্ঠার সঙ্গে করাও চরকির পক্ষেই সম্ভব। “ফিল্ম, ফান, ফুর্তির এই যাত্রা আমাদের জন্য আরও উপভোগ্য, আরও হৃদয়গ্রাহী হবে—এই আশা নিয়ে চরকির দিকেই তাকিয়ে থাকব,” বলেন খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার।



