দক্ষিণি সিনেমায় নারীদের ‘পিতৃতান্ত্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তামান্নার মন্তব্য
দক্ষিণি সিনেমায় নারীদের পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তামান্নার মন্তব্য

দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পে নারী তারকাদের উপস্থাপনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অভিনেত্রী তামান্না ভাটিয়া সম্প্রতি ফোর্বস ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন, দক্ষিণি সিনেমায় নারীদের যে দৃষ্টিতে দেখা হয়, তা অনেক সময় ‘প্রশংসাসূচক নয়’; বরং ‘পিতৃতান্ত্রিক’। এই মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে—নারী অভিনেত্রীরা কি এখনো মূলত পুরুষ দর্শকের বিনোদনের উপকরণ হিসেবেই বিবেচিত হন?

আইটেম গান বনাম পার্টি সং

বলিউডে ‘আইটেম গান’ শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত। তামান্না ভাটিয়া স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তিনি কখনো এসব গানকে ‘আইটেম সং’ হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে এগুলো ‘পার্টি সং’। তিনি বলেন, অনেক সময় একটি সিনেমা দর্শকের মনে না থাকলেও সেই সিনেমার গান বছরের পর বছর জনপ্রিয় থাকে। উদাহরণ হিসেবে তিনি কারিনা কাপুর খানের ‘ছাম্মাক ছাল্লো’, ক্যাটরিনা কাইফের ‘শীলা কি জওয়ানি’ এবং নিজের ‘কামলি’ গানের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এসব গানে অভিনেত্রীরা দেবীর মতো উপস্থিতি তৈরি করেছেন, যা সিনেমার চেয়েও বেশি স্থায়ী হয়ে উঠেছে।

গ্ল্যামার ব্যক্তিত্বের অংশ

অনেক অভিনেত্রী গ্ল্যামারকে পেশাগত প্রয়োজন হিসেবে দেখেন, কিন্তু তামান্না সেটিকে নিজের ব্যক্তিত্বের অংশ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, “আমি ঘুম থেকে উঠেই গ্ল্যামারাস অনুভব করতে চাই।” এই বক্তব্য ভারতীয় চলচ্চিত্রের পটভূমিতে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দীর্ঘদিন ধরে নারী তারকাদের ক্ষেত্রে দ্বৈত মানদণ্ড কাজ করেছে—একদিকে দর্শক গ্ল্যামার দেখতে চান, অন্যদিকে সেই গ্ল্যামারের জন্যই সমালোচনা করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দক্ষিণি সিনেমায় পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি

তামান্নার মতে, দক্ষিণ ভারতে কাজ শুরু করার পর তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কেন অনেক মানুষ এই শিল্পকে ‘একধরনের নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির’ জন্য সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সেখানে একটি ‘পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি’ রয়েছে, যা সব সময় নারীদের জন্য ইতিবাচক নয়। এই ধারণা ব্রিটিশ চলচ্চিত্র গবেষক লরা মুলভের ১৯৭৫ সালের তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বলা হয়, অনেক চলচ্চিত্রে ক্যামেরা নারীদের এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন তাঁরা মূলত পুরুষ দর্শকের দেখার জন্যই পর্দায় উপস্থিত। নারীর চরিত্র, চিন্তা বা অনুভূতির চেয়ে তাঁর শরীর ও সৌন্দর্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দক্ষিণি সিনেমার নায়িকাদের সংকট

ভারতীয় মূলধারার দক্ষিণি সিনেমায় বহু বছর ধরে নায়িকাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নায়ক গল্পের কেন্দ্রবিন্দু—তিনি লড়াই করেন, প্রতিশোধ নেন, সমাজ বদলান। আর নায়িকার কাজ অনেক সময় সীমাবদ্ধ থাকে প্রেমে পড়া, গান গাওয়া বা নায়কের প্রশংসা করার মধ্যে। অবশ্য গত এক দশকে নয়নতারা, সাই পল্লবী, কীর্তি সুরেশ বা আনুশা শেঠির মতো অভিনেত্রীরা নারীকেন্দ্রিক সিনেমার মাধ্যমে এই ধারা বদলানোর চেষ্টা করেছেন। তবু বাণিজ্যিক ছবিতে পুরোনো ফর্মুলা এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

বলিউড কি সত্যিই আলাদা?

তামান্না মনে করেন, হিন্দি চলচ্চিত্রশিল্প অন্তত অভিনেত্রীদের সামনে বিকল্প পথ খুলে দেয়। কেউ চাইলে অভিনয়নির্ভর চরিত্র করতে পারেন, আবার কেউ চাইলে গ্ল্যামারাস বাণিজ্যিক ছবির তারকা হতে পারেন। আর যাঁরা দুটি ক্ষেত্রেই সফল হন, তাঁরাই হয়ে ওঠেন প্রকৃত সুপারস্টার। বলিউডেও যে নারীর বস্তুগত উপস্থাপন নেই, তা নয়; কিন্তু গত দুই দশকে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। বিদ্যা বালান, আলিয়া ভাট, কঙ্গনা রনৌত বা তাপসী পান্নুর মতো অভিনেত্রীরা প্রমাণ করেছেন যে নারীকে কেন্দ্র করেও বড় ছবি তৈরি করা সম্ভব।