শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের ঢল
মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ শ্রদ্ধা: শহীদ মিনারে মানুষের ঢল

শিল্প, শিশুতোষ বিনোদন ও পাপেট আন্দোলনের সঙ্গে যার নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, সেই ‘পাপেটম্যান’ মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভিড় করেছেন সর্বস্তরের মানুষ। ফুলেল শ্রদ্ধা আর স্মৃতিচারণে মুখর হয়ে উঠেছে প্রাঙ্গণ। শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, সহকর্মী, আলোকচিত্রী, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পরিবারের সদস্য, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীরা স্মরণ করছেন তার দীর্ঘ কর্মময় জীবন, সৃজনশীল অবদান এবং দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে রেখে যাওয়া গভীর ছাপের কথা। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতায় প্রিয় এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে শেষ বিদায় জানিয়েছেন তারা।

শ্রদ্ধা নিবেদন ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা

মঙ্গলবার (৩০ জুন) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন তারা। শ্রদ্ধা জানানো শেষে মুস্তাফা মনোয়ারকে জানানো হয় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘গার্ড অফ অনার’। এর পরে তার মৃতদেহ নেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। সেখানে তার দ্বিতীয় জানাজা সম্পন্ন হয়।

শিল্পী হাসেম খানের স্মৃতিচারণ

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে এসে মুস্তাফা মনোয়ারকে স্মরণ করে বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন অঙ্গনে কাজ করা বিশিষ্টজনেরা। শিল্পী হাসেম খান বলেন, “মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের মতো শুধু ক্যানভাসে ছবি আঁকায় সময় ব্যয় করেননি; দেশের বিভিন্ন শিল্পকলার বিকাশ ও উত্তরণের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। এদেশের লোক-ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পুতুলনাচ ও লোকপুতুল, যা একসময় প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। মুস্তাফা মনোয়ার ধীরে ধীরে সেই পুতুলনাচ, পুতুল নির্মাণ এবং গ্রামীণ পুতুলের ঐতিহ্যকে নতুন সৃষ্টিশীলতার পথে নিয়ে আসেন। সেই পুতুলকে কেন্দ্র করে তিনি দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের জন্য সুনাম বয়ে এনেছেন।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিনি বলেন, “মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের সঙ্গে চারুকলায় শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। মাত্র এক বছরের মধ্যেই তিনি এত জনপ্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন যে ছাত্রদের কাছে তিনি যেন প্রাণের মানুষ ছিলেন। ছাত্রদের বন্ধু হিসেবে, কাছের মানুষ হিসেবে এবং শিক্ষক হিসেবে তিনি যে আন্তরিকতা দেখিয়েছেন, তা ছিল অসাধারণ। মুস্তাফা মনোয়ারের গুণ ও অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”

চলচ্চিত্র নির্মাতা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর বক্তব্য

চলচ্চিত্র নির্মাতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, “আমাদের সবার শিক্ষক মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহকে সামনে রেখে আজ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আমরা সমবেত হয়েছি তাকে শ্রদ্ধা জানাতে। আমরা যারা ষাট ও সত্তরের দশকে বেড়ে উঠেছি, তারা মূলত তার সৃষ্টিশীলতা ও নান্দনিকতার আবহেই বেড়ে উঠেছি। যুদ্ধ ও শিল্পকে একসূত্রে গাঁথতে পেরেছিল আমাদের প্রজন্মের অনেক তরুণ; মুস্তাফা মনোয়ারও ছিলেন সেই ধারার একজন।”

তিনি আরও বলেন, “মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের শিক্ষক— শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক নন, জীবনের শিক্ষক; সংস্কৃতি ও শিল্পের শিক্ষক। তাকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলন কখনোই পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। মুস্তাফা মনোয়ার একজনই ছিলেন, দ্বিতীয় কেউ হবেন না। তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। দেখেন, বাংলা ও বাঙালির শিল্পের যত আঙ্গিক আছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই তিনি স্পর্শ রেখেছেন। চলচ্চিত্র, নাটক, চিত্রকলা, পাপেট্রি— এমনকি আমাদের অন্যান্য শিল্পমাধ্যমেও তার উপস্থিতি ছিল প্রবল। তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর স্থাপন করেছেন। তার কাছ থেকেই আমরা ধারণা পেয়েছি, জ্ঞান পেয়েছি। কিন্তু তার কাছ থেকে আমরা কতটুকু নিতে পেরেছি, সেটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেছে। সমাজের দিকে তাকালে সেই প্রশ্ন আরও বড় হয়ে দাঁড়ায়।”

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হকের শ্রদ্ধার্ঘ্য

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের পক্ষ থেকে বলেন, “শিল্পের জাদুকাঠির ছোঁয়ায় জাতিকে স্নাত, জাগ্রত ও সৃষ্টিমুখর করে তোলার নিরন্তর সাধক, অনিরলস কর্মবীর— আপনার প্রতি জানাই অপরিমেয় শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। কৈশোরে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে আপনি কারাবরণ করেছিলেন। সেটিই ছিল আপনার জীবনের প্রাথমিক পাঠ, যা আপনি আজীবন অন্তরে ধারণ করে রেখেছিলেন। কিন্তু স্বভাবগুণে এই অর্জন নিয়ে কখনো উচ্চকিত হননি। কলকাতা আর্ট কলেজের শিল্পশিক্ষার্থী হিসেবে আপনার যে বিকাশ ঘটেছিল, দেশে ফিরে তা আপনি সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছিলেন সমাজকে শিল্পিত করে তোলার সাধনায়।”

তিনি বলেন, “জনমানুষের অধিষ্ঠানে যে বিপুল ও বহুবিস্তৃত অবদান আপনি জীবনভর রচনা করেছেন, তাতে আপনি ক্রমে নিজেই এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন। আপনি সেই চিত্রকর, যিনি জাতির চিত্তপট ভরিয়ে দিয়েছেন রঙে ও রেখায়; সংগীতের সুরমূর্ছনায়, নাট্যশিল্পের উজ্জ্বলতায়, পুতুলের প্রাণ প্রতিষ্ঠায়। সর্বোপরি টেলিভিশনের মাধ্যমে অযুত মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন শিল্পের সুষমা ও সৃজনের আনন্দরস। বিশেষ করে নবীন প্রজন্মের অন্তরে শিল্পের আলোকপ্রদীপ প্রজ্বলনের কাজে আপনি হয়ে উঠেছিলেন এক দীপাধার। সর্বজনের বিশেষত নবীন প্রজন্মের চিত্তলোকে সুরে, ছন্দে, রঙে, রেখায়, বাচনে, অভিনয়ে, নৃত্যে, বাদনে, উৎসবে এবং সৃজনে যে শিল্পযাত্রার সূচনা আপনি করেছিলেন, সেই যাত্রাকে আরও বেগবান করা আমাদের কর্তব্য। আমরা যেন সেই শিল্পযাত্রার বিস্তারে আরও নিবিষ্ট, সচেষ্ট ও উদ্যমী হতে পারি— এই শপথই হবে আপনার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ।”

অভিনেতা তারিক আনাম খানের মূল্যায়ন

অভিনেতা তারিক আনাম খান বলেন, “সিসিমপুর, মীনা কার্টুনসহ অসংখ্য সৃজনশীল উদ্যোগের পেছনে ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তার সৃষ্টিশীলতা ও অবদান আমাদের সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমকে সমৃদ্ধ করেছে।”

তিনি বলেন, “আমরা যদি তার কাজগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে পারি, সেটিই হবে তাকে স্মরণ করার সবচেয়ে ভালো উপায়। তার সংগ্রাম, আদর্শ এবং ভালো কাজগুলো চর্চার মধ্য দিয়েই তার স্মৃতিকে জীবন্ত রাখা সম্ভব।”

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সাইফুল হকের অভিমত

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের চিত্রশিল্পী এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন মহীরুহ ছিলেন। জীবনের প্রায় সাত দশক ধরে তিনি চিত্রশিল্পসহ সমগ্র সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। ভাষা আন্দোলনের সময় ছবি আঁকার কারণে তাকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি অসাধারণ ভূমিকা রেখে গেছেন। বিশেষ করে পাপেট শিল্পে তিনি একজন পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। তার ছত্রছায়ায় হাজার হাজার শিল্পী, চিত্রশিল্পী ও কলাকুশলী গড়ে উঠেছেন। টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে তিনি কয়েকটি প্রজন্মকে মানবিক গুণাবলী ও শিল্পচর্চার মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন।”

তিনি বলেন, “একজন মুস্তাফা মনোয়ারের শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি বটবৃক্ষের মতো ভূমিকা পালন করে এসেছেন। এখন তার উত্তরাধিকার ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার কাজ ও অবদান সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্যক্তি উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমি মনে করি, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। মিনা কার্টুন থেকে শুরু করে পাপেট শিল্পকে তিনি যে উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শিশু ও তরুণদের মনে দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং সহমর্মিতা জাগিয়ে তুলতে তার কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই রাষ্ট্র যদি এই বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে আমরা তার উত্তরাধিকার যথাযথভাবে ধারণ করতে পারব এবং তার প্রতি প্রাপ্য সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে সক্ষম হবো।”

অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিমের অঙ্গীকার

অভিনেতা ও ডিরেক্টরস গিল্ড অব বাংলাদেশের সভাপতি শহীদুজ্জামান সেলিম বলেন, “আজ আমরা শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে আছি। এখানে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার শায়িত আছেন। কিন্তু তিনি যেভাবে চলে গেলেন, তাতে আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতির অঙ্গনে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হলো।

“আমি বর্তমানে ডিরেক্টরস গিল্ড অব বাংলাদেশের সভাপতি। তবে এই সংগঠনের প্রথম প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার।

“মুস্তাফা মনোয়ার স্যারের সঙ্গে আমার সরাসরি কাজ করার সুযোগ হয়নি। কিন্তু তিনি যে সংগঠন গড়ে গেছেন, যে মানুষগুলোকে সংগঠিত করে গেছেন, সেটি আজও তার অবদানের সাক্ষ্য বহন করছে।”

সেলিম বলেন, “তিনি শুধু একজন সৃষ্টিশীল মানুষ ছিলেন না। তিনি শুধু ছবি আঁকতেন, পাপেট শো করতেন বা নাটক পরিচালনা করতেন— এমনও নয়। শিল্প ও সংস্কৃতির প্রায় সব ক্ষেত্রেই তার বিচরণ ছিল। কিন্তু একজন সংগঠক হিসেবে তার যে ভূমিকা, সেটিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকে তিনি ডিরেক্টরস গিল্ডকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন যে আজ এটি বাংলাদেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অন্যতম প্রধান পেশাজীবী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। ৮৫০ সদস্যের এই সংগঠন দেশের পেশাগত সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান অর্জন করেছে। এই ভিত্তি নির্মাণে মোস্তফা মনোয়ারের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা তার অভাব গভীরভাবে অনুভব করবো। তবে আমরা প্রতিজ্ঞা করতে চাই, তার কর্ম, তার সৃজনশীলতা, তার নান্দনিক চর্চা এবং শিল্পভাবনাকে আমরা তার অবর্তমানেও এগিয়ে নিয়ে যাবো। তিনি যে চর্চার ধারা সৃষ্টি করে গেছেন, সেটি যেন অব্যাহত থাকে— এই অঙ্গীকারই আমরা করতে চাই।”