জ্যাকি চানের জন্মদিন: দারিদ্র্য থেকে কিংবদন্তির যাত্রা
বিশ্বখ্যাত অভিনেতা ও মার্শাল আর্ট তারকা জ্যাকি চানের আজ জন্মদিন। ৭ এপ্রিল, ১৯৫৪ সালে হংকংয়ে জন্মগ্রহণ করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। ‘রাশ আওয়ার’, ‘সাংহাই নুন’, ‘দ্য কারাতে কিড’সহ অসংখ্য সিনেমা দিয়ে তিনি জয় করেছেন সারা দুনিয়ার ভক্তদের হৃদয়। জন্মদিন উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলো।
দারিদ্র্য ও কঠোর অনুশীলনের দিনগুলো
জ্যাকি চানের আসল নাম চ্যান কং-সাং। ছোটবেলায় পরিবারের দারিদ্র্যের কারণে তাঁকে ভর্তি করা হয় চায়না ড্রামা একাডেমিতে। সেখানে শিশুদের মার্শাল আর্ট, নাচ, অভিনয়সহ কঠোর শারীরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এই স্কুলেই শুরু হয় তাঁর প্রকৃত সংগ্রাম। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কঠিন অনুশীলন, শাস্তি ও কষ্ট তাঁকে গড়ে তোলে এক অসাধারণ পারফরমার হিসেবে। এখানেই তাঁর সহপাঠী ছিলেন সামো হাং, যিনি পরবর্তীতে তাঁর ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
স্টান্টম্যান থেকে নায়ক: নিজের পথ তৈরি
১৯৭০-এর দশকে জ্যাকি চ্যান কাজ শুরু করেন স্টান্টম্যান হিসেবে। তিনি ব্রুস লির ‘এন্টার দ্য ড্রাগন’ সিনেমাতেও কাজ করেছেন। কিন্তু তিনি ব্রুস লির মতো হতে চাননি। প্রযোজকেরা চেয়েছিলেন আরেকজন ব্রুস লি তৈরি করতে, কিন্তু জ্যাকি চ্যান তৈরি করলেন নিজের আলাদা স্টাইল—অ্যাকশন আর কমেডির মিশ্রণ। ১৯৭৮ সালে ‘স্নেক ইন দ্য ইগলস শ্যাডো’ ও ‘ড্রাঙ্কেন মাস্টার’ ছবি দুটি তাঁকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয়।
হলিউড জয়: ভাষার বাধা ডিঙানো
হংকংয়ে সাফল্যের পর লক্ষ্য ছিল হলিউড। প্রথম দিকে তাঁর ছবি তেমন সফল না হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। ১৯৯৫ সালে ‘রাম্বল ইন দ্য ব্রংক্স’ জ্যাকিকে মার্কিন দর্শকদের কাছে পরিচিত করে তোলে। এরপর ১৯৯৮ সালে ‘রাশ আওয়ার’—যেখানে তাঁর সহ-অভিনেতা ছিলেন ক্রিস টাকার—তাঁকে সুপারস্টার বানিয়ে দেয়। ‘সাংহাই নুন’, ‘রাশ আওয়ার ২’, ‘দ্য কারাতে কিড’সহ একের পর এক সফল সিনেমা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন, ভাষা নয়, অ্যাকশন আর হাসিই আন্তর্জাতিক ভাষা।
নিজের স্টান্ট নিজে: ঝুঁকি ও আঘাত
জ্যাকি চ্যানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, তিনি নিজেই তাঁর স্টান্ট করেন। বিপজ্জনক দৃশ্যগুলোতে ডুপ্লিকেট ব্যবহার না করে নিজেই ঝুঁকি নেন। ‘পুলিশ স্টোরি’-তে শপিং মলের কাচ ভেঙে নিচে নামার দৃশ্য কিংবা ‘প্রজেক্ট এ’-এর ঘড়ির টাওয়ার থেকে ঝাঁপ—এসব দৃশ্য এখন কিংবদন্তি। এ কারণে তাঁর শরীর প্রায় ভেঙে গেছে বহুবার। মাথা, হাত, পা—শরীরের প্রায় প্রতিটি অংশেই তিনি আঘাত পেয়েছেন। এমনকি একবার মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরে এসেছেন।
সম্পদ ও দান: শিক্ষার গুরুত্ব
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জ্যাকি শুধু অভিনেতা নন, প্রযোজক, পরিচালক, গায়ক ও ব্যবসায়ীও। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি)। তিনি বিশ্বের অন্যতম ধনী অভিনেতাদের একজন। তবে জ্যাকির সম্পদের বড় অংশই তিনি দান করতে চান। একাধিকবার তিনি বলেছেন, তাঁর মৃত্যুর পর সম্পদের বড় অংশ দান করা হবে।
জ্যাকি চান শিক্ষার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ‘শিশু-কিশোরেরা যদি খালি ভিডিও গেমস নিয়ে পড়ে থাকে, তাহলে তারা শিখবে কোথা থেকে? জ্যাকি চ্যান হওয়ার জন্য কখনোই কুংফু অনুশীলন করবে না। জ্যাকি চ্যান একজনই, তোমরা তাকে অন্যভাবে ছাড়িয়ে যাও। যত পারো স্কুলে যাও। মন দিয়ে পড়াশোনা করো, কম্পিউটার চালানো শেখো। কুংফুর চেয়ে পড়াশোনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
ব্যক্তিগত জীবন: আলো-ছায়ার গল্প
জ্যাকি চ্যানের ব্যক্তিগত জীবনও কম নাটকীয় নয়। তিনি বিয়ে করেছেন জোয়ান লিনকে। তবে তাঁর জীবনে বিতর্কও এসেছে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নানা সমালোচনা হয়েছে। নিজেও একাধিক সাক্ষাৎকারে নিজের ভুল স্বীকার করেছেন।
জ্যাকি চান আজও প্রেরণা দিচ্ছেন বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ ভক্তকে। তাঁর জীবনী শেখায়, দারিদ্র্য ও ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠে অদম্য মনোবল ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সাফল্য অর্জন সম্ভব।



