অভিনেতা শামস সুমনের অকাল প্রয়াণ ও ঢালিউডের নীরব সংকট
বাংলাদেশের অভিনয় জগতে এক দুঃখের ছায়া নেমে এসেছে। অভিনেতা শামস সুমন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অসুস্থতা থেকে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর প্রয়াণ খবরটি শোনার পর থেকেই শিল্পী মহলে শোকের ছাপ স্পষ্ট। ৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে অভিনয় করে তিনি দর্শকদের হৃদয় জয় করেছিলেন। তাঁর স্পষ্ট শুদ্ধ উচ্চারণ, ভরাট কণ্ঠ এবং স্বাভাবিক অভিনয় দক্ষতা তাকে আলাদা করে চিনিয়েছিল।
একজন শিল্পীর জীবনযাত্রার কঠিন বাস্তবতা
শামস সুমনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ খুব ঘনিষ্ঠ না হলেও, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা এবং স্নেহ ছিল অকৃত্রিম। তিনি আমাকে ভাই ডাকতেন এবং আপনি সম্বোধন করতেন, যা তাঁর বিনয়ী চরিত্রের প্রতিফলন। ১৯৯৬ সালে যখন আমি দেশ ছেড়ে প্রবাসী হই, তখনও বাংলাদেশ টেলিভিশনই ছিল একমাত্র মাধ্যম। প্যাকেজ নাটকের যুগে তিনি তরুণ অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন, যদিও জনপ্রিয়তার নিরিখে নয়, বরং তাঁর নিষ্ঠার জন্য।
দীর্ঘ এক যুগের বেশি প্রবাসে থাকার পর দেশে ফিরে আসার ইচ্ছা জাগে। ২০০৮/০৯ সালের দিকে ঢাকায় এসে আমি টেলিভিশন নাটকের শুটিং সেটে গিয়েছিলাম। সেখানে গাজীপুরের একটি আধাপাকা টিন শেডের বাড়িতে শামস সুমনকে দেখি মেঝেতে বালিশ ছাড়াই ঘুমিয়ে থাকতে। তিনি জেগে উঠে আমার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে তাঁর জীবনযাত্রার কথা জানতে চাইলে তিনি গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেছিলেন, "এটা কোনও মানুষের জীবন না। মাসে ২৫/২৬ দিন কাজ না করলে সচ্ছলভাবে সংসার চলে না। প্রতিদিন ভোর বেলা উঠে ব্যাগ নিয়ে শুটিং এর বাসে উঠে বসতে হয়। ফিরতে ফিরতে মাঝ রাত পার হয়ে যায়। ঘুমাতে যাবার আগেই পরের দিনের শুটিংয়ের জন্যে ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে হয়। ভোরবেলা বের হবার সময় বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকে। রাতে ফিরেও দেখি ঘুমাচ্ছে। আমার বাচ্চা আমার চোখের আড়ালেই বড় হচ্ছে।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রস্তুতি ছাড়াই সেটে গিয়ে স্ক্রিপ্ট হাতে পাওয়া এবং শুধু সংলাপ বলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এই কথাগুলো শুনে আমি সেদিনই সিদ্ধান্ত নিই যে, শুধু অভিনয় করে সংসার চালানোর চিন্তা করা উচিত নয়। পরে দেশে ফিরে আমি ভিন্ন পেশায় যুক্ত হই, যা আমাকে অভিনয় থেকে দূরে রাখে।
ঢালিউডের গভীর সংকট: কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন
শামস সুমনের মৃত্যু আমাদের সামনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে। প্রথমত, দেশে ৩০টির অধিক টেলিভিশন চ্যানেল থাকার পরেও মাত্র ৪০০/৫০০ অভিনেতা কেন অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিতে পারছেন না? শীর্ষের ২০/৩০ জনের সাফল্য পুরো ইন্ডাস্ট্রির প্রতিনিধিত্ব করে না।
দ্বিতীয়ত, নানা নামের সমিতি এবং সংগঠন থাকলেও, অভিনেতাসহ অন্যান্য শিল্পীদের জন্য সুরক্ষার কোনও কার্যকর ব্যবস্থা এখনও গড়ে উঠেনি। দুর্যোগ বা অসুস্থতার সময় শিল্পীদের সাহায্যের জন্য হাত পাততে হয়, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। শুটিংয়ে আহত হওয়ার মতো ঘটনায়ও পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব রয়েছে।
তৃতীয়ত, একটি নির্দিষ্ট বয়স পার হলেই অভিনেতারা কেন কর্মহীন হয়ে পড়ছেন? পুরুষ অভিনেতারা ৫০/৬০ বছর বয়স পার করলে আর কাজ পান না, আর নারী অভিনেতাদের জন্য অবস্থা আরও ভয়াবহ—৪০ বছর বয়স পার হলেই তারা প্রায় বাতিলের খাতায় চলে যান। রাইসুল ইসলাম আসাদ, আফসানা মিমি, আজাদ আবুল কালাম, শহিদুজ্জামান সেলিম, আজিজুল হাকিম বা শামস সুমনের মতো অভিনেতাদের প্রধান চরিত্রে দেখা যায় না কেন?
শামস সুমনের আক্ষেপ ও বিষণ্ণতার লক্ষণ
শামস সুমনের মৃত্যুর পর তাঁর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার এবং ফটোকার্ড সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তাঁকে কেউ অভিনয় করতে ডাকেন না। বয়স অনুযায়ী ততটা বুড়িয়ে যাননি বলে বাবার চরিত্রেও তাকে ভাবা হয় না। এই আক্ষেপ তাঁর অভিনয় না করতে পারার কষ্টেরই প্রকাশ।
আরেক সিনিয়র অভিনেতা জানিয়েছেন যে, শামস সুমন তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। আজাদ আবুল কালাম উল্লেখ করেছেন, তাঁকে জোর করে হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। এই সবই বিষণ্ণতার লক্ষণ, যা একজন শিল্পীর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
কিছুদিন আগে বরেণ্য অভিনেতা আফজাল হোসেনের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেছিলেন, "অভিনয়কে পেশা হিসেবে না নেওয়াটা আমার জীবনের সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।" তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু রাইসুল ইসলাম আসাদের কাজ না পাওয়া নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
শেষ কথা: ইন্ডাস্ট্রির দায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ
শামস সুমনের প্রয়াণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঢালিউডের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলোর এখনই সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত। অভিনেতাদের সুরক্ষা, বয়সভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। না হলে এমন আক্ষেপের ঘটনা ঘটতেই থাকবে, এবং আমরা কেবল হাহাকার করে যাব। শামস সুমন শুধু একজন অভিনেতা নন, তিনি ছিলেন একটি যুগের প্রতিনিধি, যার মৃত্যু অনেক প্রশ্ন সামনে এনেছে। এই প্রশ্নগুলোর সমাধান না হলে, শিল্পী সমাজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থেকে যাবে।



