অভিনেত্রী বনাম অভিনেত্রী: সোনারপুর দক্ষিণে জমজমাট লড়াই
অভিনেত্রী বনাম অভিনেত্রী: সোনারপুর দক্ষিণের লড়াই

লড়াইটা হচ্ছে কলকাতার কাছেই। রাজ্য-রাজধানীর দক্ষিণে অবস্থিত জেলা দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র। আসন্ন নির্বাচনে এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে দুই পরিচিত মুখকে ঘিরে—দুজনই স্বনামধন্য অভিনেত্রী। একদিকে আছেন তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান বিধায়ক লাভলি মৈত্র, অন্যদিকে বিজেপির প্রার্থী ও সাবেক রাজ্যসভার সদস্য রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। আলোচনার কেন্দ্রে এই দুজনই।

প্রচারণায় দুই অভিনেত্রী

বৈশাখের তীব্র গরমেও অভিনেত্রীদের প্রচারণা থেমে নেই। সোনারপুর দক্ষিণ এলাকায় দুই অভিনেত্রী-প্রার্থীকেই প্রখর রোদ উপেক্ষা করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের ভিডিও প্রতিবেদনগুলোতে ভোটারদেরও সহানুভূতি জানাতে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে। এক দলের সমর্থকরা বলছেন—তাদের অভিনেত্রীর খ্যাতি জাতীয় পর্যায়ে এবং বাংলা চলচ্চিত্রের সুপরিচিত মুখ। প্রখ্যাত পরিচালক মৃণাল সেন, অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষ ও ঋতুপর্ণ ঘোষের সঙ্গে কাজ করেছেন তাদের অভিনেত্রী। এ ক্ষেত্রে তার সাফল্য আলাদা পরিচিত এনেছে। অন্য দলের সমর্থকরা এমন বিতর্কে না গিয়ে বলছে—সোনারপুর দক্ষিণের উন্নয়নের ধারা চলমান রাখতে তাদের প্রার্থীকেই আবার ফিরিয়ে আনা হবে। এমন বাস্তবতায় পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমগুলো সোনারপুর দক্ষিণের ভোটযুদ্ধকে ‘অভিনেত্রী বনাম অভিনেত্রীর লড়াই’ বলেই আখ্যা দিচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রূপা গঙ্গোপাধ্যায়: পরিচিতি ও সম্পত্তি

বিজেপির ‘রূপারপুর’ রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বা রূপা গাঙ্গুলি; অথবা ‘পদ্মানদীর মাঝি’র কপিলা। গৌতম ঘোষের পরিচালনায় ‘পদ্মানদীর মাঝি’-তে রাইসুল ইসলাম আসাদ ও রূপার অভিনয় নানা প্রেক্ষাপটে আজো প্রাসঙ্গিক। সেই সূত্রে বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে রূপা গাঙ্গুলি পরিচিত নাম। এরপর ছোটপর্দার ‘মহাভারতে’ রূপা অভিনয় করেন দ্রৌপদীর ভূমিকায়। পৌঁছে যান মানুষের ঘরে ঘরে। ১৯৬৬ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া রূপা গঙ্গোপাধ্যায় সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভা নির্বাচনে এবার বিজেপির প্রার্থী। নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি এলাকার উন্নয়নকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। গত ২৬ মার্চ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়—রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বিজেপির মনোনয়ন নিয়ে ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। সেই সময় তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ভারতীয় পার্লামেন্টে তুলে ধরেন। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে রূপা সফল হবেন কিনা তা দেখা যাবে ৪ মে প্রকাশ হতে যাওয়া ফলাফলে। বৈশাখের এমন উত্তাপে ক্লান্ত রূপাকে বলতে শোনা যায়—‘পদ্মানদীর মাঝি করে যদি গায়ের রং পোড়াতে পারি, তাহলে এটুকু করে গায়ের রং পোড়াতে পারবো না কেন?’ গত ১৮ এপ্রিল প্রকাশিত ভারতীয় গণমাধ্যম এবিপি আনন্দের এক ভিডিও প্রতিবেদনে এমনটি শোনা যায়। এর আগে গত ৯ এপ্রিল নিউজ বাংলা এইটটিন এর এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘৫ বাড়ি, ২ গাড়ি, সোনা-হীরা, বিনিয়োগে বাদ নেই কিছুই! বিজেপি প্রার্থী রূপার সম্পত্তির অংক গুণে শেষ করতে পারবেন না।’ প্রতিবেদনটিতে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকার মামলা থাকার কথাও বলা হয়। তার বিরুদ্ধে দাঙ্গা ও খুনের চেষ্টার অভিযোগ-সহ মোট ৫টি মামলা আছে। গত ১৫ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—’১২ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মুম্বাইয়ে বাড়ি! কত কোটির মালিক রূপা গঙ্গোপাধ্যায়? বিজেপি প্রার্থীর গাড়ি-গয়নাই বা কত।’ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০১৫ সালে অভিনেত্রী রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বিজেপিতে যোগ দেন। এরপর থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত আছেন। রাজ্যসভার এই সাবেক সদস্যকে বিজেপির বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি, প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ও প্রচার অভিযানে দেখা গিয়েছে। তবে রূপা এবারই প্রথম ভোটে লড়ছেন উল্লেখ করে এতে আরও বলা হয়, গত ৭ এপ্রিল রূপা বিজেপি প্রার্থী হিসেবে নিজের মনোনয়নের সঙ্গে যে হলফনামা দিয়েছেন তা থেকে জানা যায়, স্থাবর ও অস্থাবর মিলে তার মোট সম্পত্তি প্রায় ৯ কোটি ৪০ লাখ রূপি। মিউচুয়াল ফান্ডসহ মোট ২৩ খাতে রূপা মোটা অংকের অর্থ বিনিয়োগ করে রেখেছেন। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, ‘রূপা পেশায় শিল্পী। পারিশ্রমিক থেকেই আয় হয়। ১৯৮৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে স্নাতক হন। রূপার দল বিজেপি নিরামিষের পক্ষে কথা বলায় লাভলির দল তথা তৃণমূলের প্রধান ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচার করছেন, ‘বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে রাজ্যে মাছ-মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেবে।’ এমন এক প্রশ্নের জবাবে বিজেপি-প্রার্থী রূপা গঙ্গোপাধ্যায় বলে বসেন—‘চিংড়িমাছের মালাইকারি না দিলে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলব’। তার এমন কথা মূলত ভোটারদের বোঝানো যে বিজেপির প্রার্থী হয়েও তিনি আমিষ খান। বিজেপি সমর্থকদের অনেকের ভাষ্য: রূপার ছোটবেলা এই এলাকায় কেটেছে। তার মনোনয়নই তাকে ‘বিজয়ী’ করেছে। এবার ভোটের মাধ্যমে তার বিজয় হবে বলেও প্রত্যাশা তাদের।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লাভলি মৈত্র: অভিনয় থেকে রাজনীতি

তৃণমূলের ভরসা লাভলি মৈত্র নামে সমাধিক পরিচিত অরুন্ধতী মৈত্র ছিলেন স্টার জলসার ধারাবাহিক ‘জল নূপুর’-এ প্রধান অভিনেত্রী। এরপর একই টেলিভিশন চ্যানেলে ‘মোহর’ ও ‘গুড্ডি’ ধারাবাহিকে অভিনয় করেন তিনি। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তিনি ক্ষমতাসীন তৃণমূলের প্রার্থী হয়ে সোনারপুর দক্ষিণ থেকে বিজয়ী হন। এবারও তিনিই এই আসনে তৃণমূলের প্রধান মুখ। ভিন্ন এলাকার বাসিন্দা হলেও লাভলি গত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সোনারপুর দক্ষিণের বাসিন্দা হন। গত ১২ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকা এক শিরোনামে জানায়, ‘১০০ ভরি সোনার মালিক লাভলি, ৫ বছরে ৫ গুণ হয়েছে সম্পত্তি! নিজের নামে বাড়ি নেই তৃণমূল বিধায়কের।’ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়—অনেকের মতোই লাভলিও অভিনয় থেকে রাজনীতিতে এসেছেন। ২০২১ সালে প্রথমবার ভোটে লড়াই করে জয় পান। এবারও তার ওপর ভরসা রেখেছে তৃণমূল। তার মনোনয়নের সঙ্গে দাখিল করা হলফনামা অনুসারে—গত ৫ বছরে শুধু লাভলি নয়, তার স্বামী সৌম্য রায়ের সম্পত্তির আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। তবে তাদের দুইজনের কারো নামেই জমি বা বাড়ি নেই। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অভিনেত্রী লাভলি মৈত্র হারিয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থী অভিনেত্রী অঞ্জনা বসুকে। সেই নির্বাচনে লাভলি পেয়েছিলেন প্রায় ৪৭ শতাংশ ভোট। বিপরীতে অঞ্জনা ভোট পেয়েছিলেন ৩৫ শতাংশের বেশি। এবারও নিজের বিজয় নিয়ে আশাবাদী ৩৫ বছর বয়সী লাভলি। গত ১১ এপ্রিল ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এই সময়ের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়—অভিনব কায়দায় লাভলির ভোটের প্রচার এলাকাবাসীর বেশ নজর কেড়েছে। গণমাধ্যমটিকে লাভলি জানিয়েছিলেন—সাইকেল বা স্কুটিতে চালিয়ে এলাকায় ঘোরা তার কাছে নতুন কিছু নয়। এর আগেও তিনি বহুবার এভাবেই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন। লাভলির দাবি: ‘সোনারপুরের মানুষের সুখে-দুঃখে আমি পাশে থেকেছি’।

ভোটারদের মতামত ও উন্নয়ন ইস্যু

গত ১৬ এপ্রিল সংবাদ প্রতিদিনের ‘রূপা বনাম লাভলি, কে এগিয়ে সোনারপুর দক্ষিণে?’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে এলাকার উন্নয়ন, পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান, ইত্যাদি নিয়ে ভোটারদের মতামত তুলে ধরা হয়। এতে একদিকে যেমন উঠে এসেছে এলাকার রাস্তাঘাট ও নাগরিক সুবিধার অভাব নিয়ে মানুষের ক্ষোভ, অন্যদিকে জানা গেছে—উন্নয়ন যা হয়েছে তা তৃণমূলের শাসনামলেই হয়েছে। আবারও তৃণমূল প্রার্থী নির্বাচিত হলে আরও উন্নয়ন হবে বলেও ভোটারদের অনেকে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। গত ২১ এপ্রিল আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়—‘এলাকা “নেই রাজ্য”, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ কি দেখা যাবে ইভিএমে’। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘ভাঙাচোরা রাস্তা। বেহাল নিকাশি। পানীয় জলের সংকট। হাসপাতাল নেই। উড়ালপুলের কাজ একচুলও এগোয়নি। গত ৫ বছরের মেয়াদ শেষে এমনই “নেই-রাজ্যে” সোনারপুর দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র। বলছেন এলাকার বাসিন্দারাই।’ এতে আরও বলা হয়—‘তবে কি এই ক্ষোভের প্রভাব ভোটের ফলাফলে পড়তে পারে, তা নিয়ে বিধানসভা কেন্দ্রের অন্দরে চাপা উত্তেজনা তো রয়েছেই।’ লাভলির প্রার্থিতা নিয়ে তৃণমূলের দলীয় কোন্দল আছে বলেও প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়। এর আগে ২ এপ্রিল এবিপি আনন্দের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রার্থীপদ ঘোষণার আগেই সোনারপুর দক্ষিণের প্রার্থী হিসেবে লাভলি মৈত্রের নামে প্রচার শুরু হয়ে গিয়েছিল। লাভলির নামে দেয়াল লিখন চোখে পড়তেই বিতর্ক শুরু হয়। এরপর তড়িঘড়ি চুনকাম করে লাভলির নাম মুছে ফেলা হয়, বলেও প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়েছে। তৃণমূল-ভক্তদের আশা: শুধু সোনারপুর নয়, পুরো পশ্চিমবঙ্গে তারা আবার বিজয়ী হয়ে ফিরে আসবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, কলকাতার অভিজাত ভবানীপুর আসনে তৃণমূল নেত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিধানসভায় বিরোধীদল নেতা বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর পর সোনারপুর দক্ষিণ আসনটি ভোটারদের কাছে বেশি আলোচিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের বক্তব্য: দুই জনপ্রিয় অভিনেত্রী সোনারপুরের ‘সোনার কেল্লা’ দখলের চেষ্টা করছেন। তবে জনগণ ‘কেল্লার’ দুয়ার কার জন্য খুলে দেবেন তা জানা যাবে ভোটের পরে। আগামী ২৯ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় সোনারপুর দক্ষিণে ভোট হবে। ফল প্রকাশ হবে ৪ মে।