নেত্রকোনা শহরের মালনী এলাকায় মগরা নদীর তীরে অবস্থিত কবি নির্মলেন্দু গুণ প্রতিষ্ঠিত 'কবিতাকুঞ্জ' নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়ার পর থেকেই অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে বন্ধ রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি একসময় দেশ-বিদেশের কবিতাপ্রেমীদের মিলনস্থল ছিল, কিন্তু বর্তমানে তা তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্বাধীনতা পুরস্কারের অর্থে গড়া স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান
২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর নেত্রকোনার মালনী এলাকায় ৮ শতাংশ খাসজমির ওপর যাত্রা শুরু করে কবিতাকুঞ্জ। ওই বছর স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন নির্মলেন্দু গুণ। পুরস্কারের অর্থ দিয়েই তিনি প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। পরে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা তাঁর শুভানুধ্যায়ী, অনুরাগী ও কবিতাপ্রেমীদের সহায়তায় ধীরে ধীরে পূর্ণতা পায় উদ্যোগটি।
'বিশ্ব কবিতার বাসগৃহ' স্লোগানে গড়ে ওঠা কবিতাকুঞ্জে রয়েছে বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশের কালজয়ী কবিদের রচিত দুই হাজারের বেশি কাব্যগ্রন্থ। বাংলা, ইংরেজি ও বিভিন্ন ভাষার অনূদিত কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি এখানে সংরক্ষিত আছে বিশ্বের নানা দেশের কবিতা-সম্পর্কিত মূল্যবান বই। রয়েছে বিভিন্ন ভাষার প্রায় ৭০ জন খ্যাতিমান কবির প্রতিকৃতি, নির্মলেন্দু গুণের ব্যক্তিগত স্মারক, সম্মাননা ক্রেস্ট ও নানা সংগ্রহ।
একসময় প্রাণবন্ত ছিল প্রতিষ্ঠানটি
একসময় প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ জন দর্শনার্থী এখানে আসতেন। বিশেষ দিবসে সেই সংখ্যা পাঁচশ’ও ছাড়িয়ে যেত। কবিতাকুঞ্জের কুঞ্জঘাটে বসে মানুষ জোছনা দেখতেন আর কবিতা পড়তেন। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখতেন এই প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বর্তমানে সেখানে প্রাণহীন নীরবতা। দরজায় ঝুলছে তালা। ধুলা, মাকড়সা জমছে বইয়ের তাকের পাশে।
স্থানীয় সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও কবিতাপ্রেমীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যাওয়ার পর কবিতাকুঞ্জের নিয়মিত কার্যক্রম ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। সেখানে কর্মরত দুজন কর্মীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কাজে নিয়োজিত করা হয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে দাঁড়ায় যে কোনো পাঠক বা দর্শনার্থী এলে দরজা খোলার মতো লোকও খুঁজে পাওয়া যায় না।
কবির ক্ষোভ
এ ব্যাপারে কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গবেষণা, পড়াশোনাসহ আমার অবর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি যাতে টিকে থাকে সেই উদ্দেশ্যে আমি দান করেছিলাম। কিন্তু তা বন্ধ করে অযত্নে অবহেলায় ফেলে রাখায় আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষুব্ধ।'
লোকসংস্কৃতি গবেষক আলী আহাম্মদ খান আইয়োব জানান, দেশে তো নয়ই, বিশ্বের খুব কম দেশেই কবিতা নিয়ে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে একসময় বইপাঠ, সাহিত্য আলোচনা, আবৃত্তি ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা উল্টো সংকুচিত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য খন্দকার মোহাম্মদ আশরাফুল মুনিমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার আনিছা পারভীন বলেন, 'প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ নয়। বাংলা বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা চাইলে এটি ব্যবহার করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে আমরা আরও খোঁজখবর নেব। কবিতাকুঞ্জে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে আরও সক্রিয় করা যায়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।'
জেলা উদীচীর সভাপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা না গেলে তা শুধু নেত্রকোনার নয়, দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্যও ক্ষতির কারণ হবে। ছড়াকার সঞ্জয় সরকার জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতায় প্রতিষ্ঠানটি এখন অচলায়তনে পরিণত হয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক।
কবিতাকুঞ্জের বর্তমান অবস্থা
গতকাল শনিবার বিকেলে ও রোববার দুপুরে দেখা যায়, কবিতাকুঞ্জের প্রবেশপথের ফলকে 'আমন্ত্রণ' নামে নির্মলেন্দু গুণের একটি কবিতা লেখা আছে। মূল ফটকের দুই পাশে থাকা শেফালী ফুলের গাছ দুটি হেলে পড়েছে। প্রতিটি গাছই পরিচর্যাহীন, লতাগুল্মে আচ্ছাদিত। কবিতাকুঞ্জের প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। ভেতরে বইয়ের তাকগুলো নীরব।
কবিতাকুঞ্জের উত্তর পাশের বাসিন্দা আবদুল বারেক বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে এখানে পাঠক ও দর্শনার্থীর উপস্থিতি নেই। কুঞ্জঘাটও প্রায় জনশূন্য থাকে। নিয়মিত কোনো সাহিত্যসভা, আবৃত্তি অনুষ্ঠান বা পাঠচক্রের না হওয়ায় এটি এখন ভুতুড়ে অবস্থা।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাকালীন সাবেক পরিচালক কবি এনামূল হক (পলাশ) প্রশ্ন তুলেছেন, যে প্রতিষ্ঠানের জন্য একজন কবি তাঁর রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননার অর্থ ব্যয় করেছিলেন, সেই কবিতাকুঞ্জ কি কবির স্বপ্নের পথে এগোচ্ছে? নাকি মগরা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটি ধীরে ধীরে কেবল একটি অপূর্ণ স্বপ্নের স্মারক হয়ে উঠছে?



