আমরা যৌবনের শুরুতে নানা খাবার খুঁজে বেড়াতাম, কিন্তু পকেটে টাকা থাকত না। কে খাওয়াবে, সেই সংযোগ বের করা ছিল দায়। তখন শুনলাম অলকার মোড়ে দীপেনদার মাটন চপের কথা; খবরদাতা শফিক এমনভাবে গল্প করল যে জিবে জল এসে গেল। তবে সেখানে যাওয়ার উপায় ছিল না। শফিক বলল, 'সব ঠিক আছে, স্রেফ অসাধারণ, তবে দামটা একটু বেশি—একটা চপের দাম তেরো টাকা।' তখন আমরা পাঁচ টাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলে দুপুরের ভাত, ডাল, মাছ বা মাংস খেতাম। সে খাবার ভদ্রলোকেরা খেতে পারবে না, তবু আমরা পেট ভরে খেতাম। শফিক বলল, 'শোন, আগে একদিন ধারকর্য করে কিংবা কাউকে পটিয়ে খেয়ে দেখ। এই জিনিস এই শহরে তো আর নেই, গোটা বাংলাদেশে আছে কি না সন্দেহ। একবার খাবি তো বাপের জন্মে আর ভুলবি না।' শফিক সব কথা বাড়িয়ে বলে; শুভময়ের কথায় সে চব্বিশ ঘণ্টার গল্পকার। তবু আমরা ওকে বিশ্বাস করে দীপেনদার চপ খাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকি।
বিপ্লবের উদ্যোগে চপ খাওয়ার দিন
আমাদের মধ্যে যুবক বয়সে লম্বা দাড়ি রেখে বিখ্যাত হয়েছিল বিপ্লব। সে সারাদিন টিউশনি করে, ভালো খাবার খায়, থাকে সাগরপাড়া বা বেলদার পাড়ার কাছে এক মেসে। তার বান্ধবী লাভলিকে নিয়ে প্রায়ই খেতে বের হয়। আমরা একদিন ওকে প্রস্তাব দিলে সে রাজি হয়ে যায়। সে বলে, 'একটা চপ খাবি তার জন্য এমন করছিস যেন ফাইফস্টার হোটেলে খেতে দিতে হবে।' ফাইভস্টার-ফোরস্টার আমাদের ভূগোলে নেই। একদিন সন্ধেবেলা আমরা চারজন ওর ঘাড়ে ভর করে দীপেনদার রেস্তোরাঁয় হাজির হলাম। রাস্তার পাশে ছাপরার মতো পুঁচকে দোকান, কয়েকটা প্রাচীন কালো টেবিল চেয়ার, সামনে বড় মাটির চুলায় নানা ভাজাভাজিতে ব্যস্ত দীপেনদা। শফিককে দেখে নীরব চওড়া হাসি দিলেন। আমরা একটা টেবিলে গোল হয়ে বসলাম। বাইরের চুলার ধোঁয়া ভেতরে ঢুকছে, দেয়াল ময়লা। 'দীপেন রেস্ট্যুরেন্ট' লেখা প্রায় অস্পষ্ট। এক বালক শসা, মরিচ, পেঁয়াজ দিয়ে সালাদ ও চাটনি তৈরি করছে। তার হালকা সবুজ টি-শার্ট, পাতলা গোঁফ, সে ট্যারা। শফিক বিপ্লবকে ইশারা করলে বিপ্লব ছেলেটাকে ডাকে। শফিক ছয়জনের জন্য ছয়টা মাটন চপ অর্ডার দিল। দোকানে ভিড়, ডিমের চপ, কাবাব, পুরি, আলুর চপ, পেঁয়াজু, শিঙাড়া—সবই আছে, মাটন চপ সিগনেচার আইটেম।
চপের স্বাদ আর আড্ডার মজা
মিনিট দশেক পরে চপ এলে আমরা খাওয়া শুরু করলাম। সালাদ, চাটনিসহ শফিক আগে খেতে শুরু করল, যেন পথপ্রদর্শক। শফিক খাওয়ার সময় সাধারণত কথা বলে না, কিন্তু আজ বলে। চপে কামড় দিয়ে সে বলে, 'চপ যে এ দেশে কারা বানানো শুরু করেছিল, বলতে পারব না, তবে মোগলরাই সম্ভবত করেছিল।' শুভময় ওর দিকে তাকালে সে থামে। বিপ্লব হাল ধরে: 'কলকাতায় আমি নানা রকম চপ খেয়েছি। কফি হাউসের কাটলেট বিখ্যাত। সবজির পাকোড়া আর মাটন চপও খুব চলে। আমার ঘুঘনি আর হিংয়ের কচুরি বেশি পছন্দ।' আরেফিন বলে, 'আমার মনে হয় আমার মা খাসির মাংস হামান দিস্তায় পিষে যে বড়া বানাত, সেটা আরও বেশি স্বাদের।' শফিক চুপসে যায়নি। আরেফিন আবার বলে, 'চপ তো খাচ্ছিস, চাপ খেয়েছিস কখনো?' বিপ্লব বলে, 'ঢের খেয়েছি।' লাভলি মাথা নাড়ে। সবার খাওয়া শেষ, পোস্তর চাটনি, শসা-টমেটোর সালাদ দিয়ে তৈলাক্ত ও মুচমুচে মাটন চপ সবার ভালো লেগেছে। শফিক সবার আগে শেষ করেছে, আরও খেতে চায়। কিন্তু হোস্ট ওর দিকে তাকায় না। বিপ্লব লাভলির দিকে নজর রাখে, লাভলি চা খাবে বলে সে সবার জন্য দুধ-চা অর্ডার দেয়।
দীপেনদার চপের নেশা
আমরা এরপর নানা কায়দা-কৌশল করে দীপেনদার দোকানে গিয়েছি চপ খেতে। খাসির মাংস ও পুর সহযোগে সালাদের ব্যঞ্জনে এই চপ আমাদের কাছে অসাধারণ উপাদেয় খাবার। আমরা নানাভাবে টাকা বাঁচিয়ে এখানে আসতাম। দাদা আমাদের চিনে ফেললেন, খাতির যত্ন শুরু করলেন, এক চাপা হাসি দিয়ে ময়লা দাঁত বের করে দিতেন, তাতেই আমরা মুগ্ধ। আমরা গর্ব করতাম এই মফস্বল শহরে দীপেনদার মতো মানুষ আছে, আর তার মাটন চপ আছে। সন্ধ্যার পর সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ত। একসময় দোকান আরও বড় হলো, নামডাক হলো। অন্য আইটেম কমে গেল, মাটন চপ রাজত্ব করতে লাগল। আমরা ছাত্রজীবনের শহর ছেড়ে চাকরির খোঁজে চলে গেলাম, তবে মাটন চপের স্বাদ জিবে নিয়ে।
পুনর্মিলনে বিভেদের তিক্ততা
বিভাগের পুনর্মিলনে সব বন্ধু আবার মিলিত হলাম। চাকরিবাকরি সংসার নিয়ে বিস্তর আলাপ, খুব খাওয়াদাওয়া। পদ্মায় অনেক জল গড়িয়েছে, সবার চেহারায় তার ছাপ। বিপ্লব দাড়ি কেটেছে, শফিক লম্বা দাড়ি রেখেছে। আমরা বিপ্লবকে লাভলির কথা জিজ্ঞেস করিনি। আরেফিন বলল হঠাৎ, 'চল, দীপেনদার মাটন চপ খেয়ে আসি।' আমরা বিভাগের সামনে আমগাছের বেদিতে বসেছিলাম, চারপাশে গল্পগুজব, চা-বিস্কুট, গান। আরেফিনের কথায় বিপ্লব বলল, 'চল, যাই।' আমি রাজি, শুভময় নীরবে সম্মতি দিল। শফিক ইতস্তত করছে—অথচ সেও আমাদের মাটন চপের নেশা ধরিয়েছিল। সে সরাসরি না করল না। আমরা অটো ভাড়া করে অলকার মোড়ের দিকে যাত্রা শুরু করলাম।
পরিবর্তিত দীপেনদার দোকান আর শফিকের রূপান্তর
শহরের চওড়া রাস্তাঘাট, ডিভাইডারে ফুলের গাছ, সড়কবাতি, উঁচু ইমারত দেখে চমকে গেলাম। অনেক কষ্টে দাদার রেস্তোরাঁ খুঁজে পেলাম। আগের জায়গায় নেই—প্রধান রাস্তার বাইরে ছোট গলিতে বড় বাসার সিঁড়িঘরে দোকান। অবনতি হয়েছে। দাদা নেই, তাঁর ছেলে অনীল দোকান চালাচ্ছে। দাদার ময়লা দাঁতসহ নীরব হাসির কথা মনে পড়ল। আমরা ছোট কুঠুরির মতো ঘরে বসলাম। অর্ডার দিলাম মাটন চপের। শফিক বেঞ্চে বসল, কিন্তু অর্ডার দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলল, 'তোরা খা, আমি খাব না।' আরেফিন বলল, 'কেন? তোর পেটে সমস্যা?' সে বলল, 'পেট ঠিক আছে, তবে আমি খাব না।' আমি বললাম, 'শফিক, তুই বলছিস এই কথা? তুই এত দিন পরে এভাবে ভাবছিস?' সে বলল, 'ভাবাভাবির কিছু নেই, আমার যা মনে হয়েছে তাই বলছি। এভাবে তৈরি করা জিনিস আমি খাব না।' আমি বলি, 'এই শহরে কারা মাংস বিক্রি করে জানিস না? আমাদের ডান পাশে একজন হুজুর তো এখনি চপ খেয়ে গেল, দেখলি না? কত শত বছর ধরে হিন্দু-মুসলিমরা খাদ্য রান্না বিনিময় করে, একে অপরের বাড়িতে খায়, জানিস না? এসব নিয়ে কেউ তো ভাবেনি, তুই কেন ভাবিস?' সে উঠে দাঁড়াল, রাগে গরগর করতে লাগল। কিছু কথা বলল, কিন্তু আমরা ঠিক বুঝতে পারলাম না। আমাদের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। আমরা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ওকে চিনতে পারি না। কী করব বুঝতে পারি না। রাগে সে কাঁপছে। বুঝতে পারি, শুধু পোশাক-আশাকেই ওর পরিবর্তন হয়নি, মানুষটাই পাল্টে গেছে। নিজেকে এই সমাজের হাজার বছরের রীতি থেকে আলাদা করে ফেলেছে। বিপ্লব সাহস করে বলল, 'ঠিক আছে, দোস্ত, তুমি তোমার মতো থাকো।' শফিক বলল, 'অবশ্যই।' বলেই সে হাঁটা শুরু করল।



