চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকপন্থি দুই কর্মীর বিরোধের জেরে জাতীয় ছাত্রশক্তির এক নেতাকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়া ও হেনস্তার অভিযোগও উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরসহ কয়েকজন আঘাত পেয়েছেন বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ঘটনার বিবরণ
মঙ্গলবার (৩০ জুন) রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহজালাল হলের সামনে এ ঘটনা ঘটে। মারধরের শিকার উলফাতুর রহমান রাকিব জাতীয় ছাত্রশক্তির চবি শাখার মুখ্য সংগঠক। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাকিব শাহজালাল হলের সামনে গেলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে বাগবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নিরাপত্তাকর্মীদের সামনেই তাকে মারধর করা হয়।
ঘটনাস্থলে চবি ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবীব, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইয়াছিন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাফায়াত হোসেন, দপ্তর সম্পাদক রোকন উদ্দিনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, মারধরে রাকিবের দুই কান রক্তাক্ত হয়। এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়া হয় এবং তাদের সঙ্গে উচ্চবাচ্য করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
সাংবাদিকদের হেনস্তা ও প্রক্টরের আঘাত
অভিযোগ অনুযায়ী, ছাত্রদল কর্মী তাসিন আল সাদমান, দপ্তর সম্পাদক রোকন উদ্দিনসহ কয়েকজন নেতাকর্মী সাংবাদিকদের হেনস্তা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দীসহ কয়েকজন সহকারী প্রক্টরও আঘাত পান বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
ঘটনার সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত হয় সোমবার সকালে শহীদ মিনার চত্বরে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখা নিয়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ব্রাজিল ও জাপানের মধ্যকার ম্যাচ দেখাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল কর্মী ইফতেখারুল ইসলাম জিসানের সঙ্গে শাখা ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক মামুনের কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় জিসানকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। জিসান মার্কেটিং বিভাগের ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। পরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জিরো পয়েন্টসংলগ্ন এলাকায় মামুন ও জিসানের মধ্যে আবারও কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় মামুনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে।
জানা গেছে, মামুন শাখা ছাত্রদলের সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিনের অনুসারী এবং অভিযুক্ত জিসান সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমানের অনুসারী। তবে জিসান তার রাজনৈতিক পরিচয় অস্বীকার করেছেন। এরপর রাত ১১টার দিকে সভাপতি আলাউদ্দিন মহসিন ও সহ-সভাপতি আহসান হাবীবের অনুসারীরা শাহজালাল হলের সামনে জড়ো হন। এর আগে আহত জিসান ও রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী পলাশ মোল্লাকে মোটরসাইকেলে করে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে পৌঁছে দেন রাকিব।
রাকিবের অভিযোগ
রাকিবের অভিযোগ, এ কারণে ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবীব তাকে ফোনে হুমকি দিয়ে শাহজালাল হলের সামনে ডাকেন। পরে সেখানে গেলে তাকে মারধর করা হয়। আহতদের বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। মেডিকেল সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ডা. শুভাশীষ চৌধুরী বলেন, "যারা আহত হয়েছেন, তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।"
প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী পলাশ মোল্লা বলেন, "গতকাল খেলাকে কেন্দ্র করে জুনিয়র জিসানকে ছাত্রদলের কয়েকজন কর্মী মারধর করেন। আজ সেই ঘটনার জের ধরে আবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে উলফাতুর রহমান রাকিবকে মারধর করা হয়।" মারধরের শিকার রাকিব বলেন, "আমি গতকালের ঘটনায় আহতদের মেডিকেলে নিয়ে গেছি। পরে ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আহসান হাবীব ভাই আমাকে ফোন দিয়ে হুমকি দেন। তিনি বলেন- ‘তুই কোথায় আছিস বল, আমি আসতেছি।’ আমি বললাম, ‘ভাই, আপনি কোথায় আছেন বলেন, আমি আসতেছি।’ পরে আমি শাহজালাল হলের সামনে গেলে আমাকে মারধর করা হয়।"
ছাত্রশক্তি ও ছাত্রদলের প্রতিক্রিয়া
জাতীয় ছাত্রশক্তির সদস্য সচিব মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে আমার সংগঠনের একজন নেতাকে বিনা কারণে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মারধর করেছে। এটি খুবই দুঃখজনক। এমন ঘটনা ঘটতে থাকলে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কোথায়?" অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চবি ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, "খেলা দেখার সময় একটি ঝামেলাকে কেন্দ্র করে এসব ঘটনা ঘটেছে। যারা অভিযুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব। সাংবাদিকদের সঙ্গে যারা অশোভন আচরণ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
প্রক্টরের বক্তব্য
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী বলেন, "ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা একজন শিক্ষার্থীকে মারধর করেছে। তার নাম রাকিব। তিনি জাতীয় ছাত্রশক্তির একজন নেতা বলে জেনেছি। শাহজালাল হলের সামনে সবাই জড়ো হলে ঘটনাটি ঘটে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি এবং যেকোনো অপতৎপরতা দমনে সজাগ রয়েছি।" তিনি আরও বলেন, "ঘটনায় আমি নিজে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ছিলাম। তাই আমিসহ অনেকেই কিছুটা আঘাত পেয়েছি। সাংবাদিকদের হেনস্তা করা খুবই নিন্দনীয়। আজকের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"



