আজ ৮ মে বিশ্ব গাধা দিবস। এই দিনটি গাধাদের জন্য একটি বিশেষ সম্মানের দিন। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, একসময় গাধা ছিল গ্রামীণ সমাজের ভরসা। কিন্তু এখন গাধা শুধুই কৌতুকের উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। মানুষ বদলেছে, বদলেছে গাধার সম্মানও। তবুও গাধারা প্রতিবাদ করতে শেখেনি; তারা এখনো নীরবে বোঝা টেনে যায়। অথচ মানুষ বোঝা টেনেও অহংকার করে।
একসময়ের সমাজনায়ক গাধা
একসময় গ্রামের হাটে গাধা চলত। চালের বস্তা গাধার পিঠে উঠত। ইটভাটায় গাধারা কর্মচারীর মর্যাদা পেত। তখন ট্রাক ছিল বিরল রাজকীয় বস্তু। গাধাই ছিল দরিদ্র মানুষের পরিবহন। অনেক ব্যবসায়ী গাধার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। গাধা ছাড়া বাজার বসতো না প্রায়। গাধা ছিল ছোটলোকের নির্ভরযোগ্য সহকারী প্রাণী।
গাধার নীরব সেবা
গাধারা কখনো ধর্মঘট ডাকেনি, কখনো বেতন বৃদ্ধির দাবিও তোলেনি। শুধু খড় পেলেই কাজ চালিয়েছে। মানুষ হলে অবশ্য মিছিল বের করতো। গাধারা সভা-সমিতিও করতো না, তাদের কোনো রাজনৈতিক দলও ছিল না। তবুও তারা নিয়মিত জাতীয় সেবা দিয়ে গেছে। এমন দেশপ্রেম আজকাল বিরল হয়ে গেছে।
আগের দিনের কুমোরেরা গাধা ভালোবাসতো। গাধা মাটি বহনে দক্ষ ছিল ভীষণ। গরমে মানুষ হাঁপাতো, গাধা চলতো অবিরাম। অনেক গাধা মালিকের চেয়েও কর্মঠ ছিল। তবুও সম্মান পেত না ঠিকমতো। মানুষ বরাবর অকৃতজ্ঞ প্রাণী হিসেবেই পরিচিত।
গাধার বুদ্ধিমত্তা ও সহনশীলতা
গাধাদের স্মৃতিশক্তি অসাধারণ ভালো, কিন্তু পরীক্ষায় বসার সুযোগ পায়নি কখনো। সুযোগ পেলে অনেক মানুষ ফেল করতো। গাধারা হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও হতে পারত। কমপক্ষে তারা প্রশ্নফাঁস করতো না, কখনো ভুয়া সার্টিফিকেট বানাতো না। তাদের বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজির অভিযোগও নেই কোথাও।
এখনকার শিশুরা গাধা দেখেই হাসে, কারণ বইয়ে গাধাকে বোকা বানানো হয়েছে। কার্টুনেও গাধা সবসময় হাসির চরিত্র। কেউ গাধাকে জ্ঞানী প্রাণী হিসেবে দেখায় না। এটা গাধাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক ষড়যন্ত্র বলা যায়। মানুষ কাউকে অপমান করতে গাধা বলে, কিন্তু গাধারা কখনো মানহানির মামলা করেনি। এই সহনশীলতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
একটি গাধার অভিমানের গল্প
একবার এক গাধা নাকি অভিমান করেছিল। মালিক তাকে সারাদিন গাধা বলেছিল। গাধাটি ভীষণ অপমানিত হয়ে বলেছিল, “আমি তো গাধাই! আপনি মানুষ হয়েও কেন গালি দেন?” মালিক তখন লজ্জায় মাথা নিচু করেছিল। পাশের ছাগলটিও হাসতে শুরু করলো।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে গাধার ভূমিকা
গ্রামের বুড়ো মুরুব্বিরা গাধা চিনতেন ভালো। তারা জানতেন গাধা ভীষণ ধৈর্যশীল প্রাণী। এখনকার নেতারা সেই গুণ শিখতে পারেন, বিশেষ করে নির্বাচনের পরবর্তী সময়গুলোতে। গাধারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে পালিয়ে যায় না কখনো। এটাও তাদের অসাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
একসময় ডাকপিয়নের সঙ্গেও গাধা থাকতো। চিঠিপত্র বহনে গাধারা নীরবে ভূমিকা রাখতো। তখন মোবাইল ফোন ছিল না, মানুষ অপেক্ষা করতো চিঠির আশায়। গাধা ধীরে হাঁটলেও চিঠি পৌঁছাতো ঠিকই। আজ ইন্টারনেট দ্রুত, কিন্তু সম্পর্কগুলো ধীর হয়ে গেছে। গাধারা প্রেমপত্র বহনেও অভিজ্ঞ ছিল; তারা কখনো গোপন তথ্য ফাঁস করেনি। আজকাল মানুষ স্ক্রিনশট দিয়েই সম্পর্ক নষ্ট করে।
ইটভাটার গাধার জীবন
ইটভাটার গাধাদের জীবন ছিল কঠিন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রম চলতো। তবুও তারা ওভারটাইম বিল চাইতো না। তাদের ইউনিয়ন নেতা ছিল না, কেউ টকশোতে গাধাদের প্রতিনিধি ডাকেনি। গাধারা নীরব শ্রমিক হিসেবেই জীবন কাটিয়েছে।
শহরের মানুষ এখন গাধা ভুলে গেছে। তারা শুধু গাড়ির হর্ন শুনে অভ্যস্ত। আগে গ্রামের পথে গাধার ডাক শোনা যেত, সেই ডাকে ছিল সরলতা। আজকের হর্নে শুধু বিরক্তি আর তাড়াহুড়ো।
গাধার সামাজিক জীবন
গাধারা দল বেঁধে চলতে পছন্দ করত, কোনো গাধা অন্য গাধাকে ছোট করতো না। মানুষ কিন্তু সুযোগ পেলেই সমালোচনা শুরু করে। গাধাদের ফেসবুক থাকলে হয়তো শান্তি থাকতো, কারণ তারা কমেন্ট যুদ্ধে জড়াতো না। একবার এক গাধা শহরে এসে ট্রাফিক জ্যাম দেখে অবাক হয়েছিল। সে বলেছিল, “মানুষ এত দ্রুত কোথায় যায়?” পাশের ঘোড়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “এরা দৌড়ায়, কিন্তু পৌঁছায় না।”
গাধার খাদ্যাভ্যাস ও সন্তুষ্টি
গাধাদের খাদ্যাভ্যাস ছিল ভীষণ সাধারণ। সামান্য ঘাস পেলেই তারা খুশি থাকতো। আজকের মানুষ পাঁচতারকা খাবার খুঁজে বেড়ায়, তবুও তাদের মুখে অভিযোগ থাকে। গাধারা অন্তত খাবারের ছবি তুলতো না।
একজন কবি নাকি গাধা নিয়ে লিখেছিলেন, কিন্তু কেউ সেই কবিতার মূল্য দেয়নি। কারণ সমাজ গাধাকে গুরুত্ব দিতে চায় না। অথচ বাস্তবতা ছিল ভিন্ন; অনেক পরিবারের আয় গাধার উপর নির্ভরশীল। আগের দিনের বাজারগুলো প্রাণবন্ত ছিল, যেখানে গাধারা নিয়মিত কর্মচারীর মতো কাজ করত। কেউ চাল আনতো, কেউ লাকড়ি বহন করত। গাধারা নির্ভরযোগ্য পরিবহন হিসেবে পরিচিত ছিল। তখন পেট্রোলের দাম নিয়ে চিন্তা ছিল না, গাধারা খড় খেলেই চলতো।
এক বুড়ো গাধার উপদেশ
এক বুড়ো গাধা নাকি উপদেশ দিয়েছিল, “মানুষ খুব অদ্ভুত প্রাণী! নিজেরা ভুল করেও অন্যকে গাধা বলে।” এই কথায় পাশের গরুও সম্মতি জানিয়েছিল, আর ছাগল তখন ব্যস্ত ছিল পাতা খেতে।
গাধার প্রতি সাংস্কৃতিক অবিচার
আজ যদি গাধারা সভা ডাকতো, তারা হয়তো মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতো। বলতো, “আমাদের সম্মান ফিরিয়ে দিতে হবে। ‘গাধা’ শব্দের অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বোকা মানুষকে ‘মানুষ’ বলেই ডাকুন।” এই দাবিতে অনেক গাধা একমত হতো।
গাধাদের নিয়ে সিনেমাও খুব কম হয়েছে। ঘোড়ারা বরাবর বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে, কারণ ঘোড়া দেখতে রাজকীয় ও সুন্দর। গাধারা সাধারণ, পরিশ্রমী, নিরীহ প্রকৃতির প্রাণী। সমাজ সাধারণ মানুষকেও তেমন মূল্য দেয় না।
গাধা দৌড় প্রতিযোগিতা
গ্রামে একসময় গাধা দৌড় প্রতিযোগিতা হতো। বাচ্চারা খুব আনন্দ নিয়ে সেই খেলা দেখতো। গাধারা অবশ্য পুরস্কার বুঝতো না, একটু বেশি ঘাস পেলেই খুশি থাকতো। গাধার ডাক নিয়েও অনেক ঠাট্টা হয়, কিন্তু ভেবে দেখুন, মানুষও কম চিৎকার করে না, বিশেষ করে রাজনৈতিক সভাগুলোর সময়। সেখানে গাধার ডাকও ভদ্র শোনাতে পারে।
গাধার বুদ্ধিমত্তার স্বীকৃতি
অনেক গবেষক গাধার সহনশীলতা নিয়ে মুগ্ধ। তারা বলছেন, গাধারা ভীষণ বুদ্ধিমান প্রাণী, শুধু তারা অহংকার করতে জানে না। মানুষ বরং সামান্য জ্ঞানেই ফুলে ওঠে।
বিশ্ব গাধা দিবসের বার্তা
আজ বিশ্ব গাধা দিবসে তাদের স্মরণ করি। এই নিরীহ শ্রমিক প্রাণীদের সম্মান জানাই। তাদের অবদান ইতিহাস কখনো অস্বীকার করতে পারবে না। গাধারা সভ্যতার নীরব নির্মাতা হিসেবেই থাকবে। মানুষ হয়তো ভুলে যাবে, কিন্তু ইতিহাস গাধাদের শ্রম মনে রাখবে।
শেষে গাধাদের উদ্দেশ্যে শুভেচ্ছা: “হে গাধারা, তোমরা অপমান নিও না কখনো। মানুষ তোমাদের নাম ব্যবহার করেই বাঁচে। তোমরা অন্তত মানুষের মতো প্রতারণা করোনি। তোমরা সৎ, ধৈর্যশীল, পরিশ্রমী এবং নিরীহ। এই গুণগুলো আজকাল বিরল হয়ে গেছে।”
লেখক: ড. মো. রুহুল আমিন সরকার, অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার, সিআইডি, ঢাকা।



