ঢালিউডের ঈদ-সিনেমার সাত দশক: স্বর্ণালী ইতিহাস থেকে বর্তমান সংকট
ঢালিউডের ঈদ-সিনেমার ইতিহাস প্রায় সত্তর বছরের, যা এই উৎসব ইন্ডাস্ট্রির স্বর্ণালী সময়ের সাক্ষী। দেশের অগণিত ব্যয়বহুল ও ব্যবসাসফল ছবি মুক্তি পেয়েছে ঈদ মৌসুমে, এবং অনেক নির্মাতার ক্যারিয়ারও দাঁড়িয়েছে এই উৎসবের ছবির হাত ধরে। ঈদে ছবি মুক্তি পাওয়া ছিল মর্যাদার ব্যাপার, যেখানে সাধারণত নজিরবিহীন ও তারকাখচিত ছবিগুলোই জায়গা পেতো। সিনেমাবাসী সারা বছর অপেক্ষা করতেন এই সময়টির জন্য, আর প্রভাবশালী প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো চেষ্টা করতো প্রতি ঈদে অন্তত একটি বড় ছবি নিয়ে হাজির হতে।
ষাটের দশক: উর্দু ছবির উৎপাত ও বাংলা সিনেমার উত্থান
ষাটের দশকের শুরুতে উর্দু ছবির দৌরাত্ম্য দেখা গেলেও, ১৯৬৫ সালে ‘রুপবান’ মুক্তির পর বাংলা ছবির জোয়ার ওঠে। ঢাকায় ছবি নির্মাণ শুরু হওয়ার পর ঈদে প্রথম মুক্তি পাওয়া ছবি ছিল উর্দু ভাষার ‘তালাশ’ (১৯৬৩)। এই দশকে জহির রায়হানের ‘সঙ্গম’ ও ‘বাহানা’, এবং এহতেশামের ‘চকোরী’র মতো বিখ্যাত উর্দু ছবি মুক্তি পায় ঈদে। বাংলা সিনেমার প্রতিষ্ঠার পথে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ এবং খান আতাউর রহমানের ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’র ভূমিকা অপরিসীম। তখন একটি নতুন ছবি ৬-৭টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেতো, এবং ছবির সাফল্য মাপা হতো সিলভার বা গোল্ডেন জুবিলি অতিক্রমের মাধ্যমে।
সত্তর দশক: পোশাকি ছবির পসার ও ব্যবসার রেকর্ড
স্বাধীনতার পর ঈদ সিনেমার উৎসবে পরিণত হয়, যেখানে বাংলা ছবির প্লাবন সৃষ্টি হয়। ১৯৭২ সালের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেয়ে কাজী জহিরের ‘অবুঝ মন’ পাকিস্তান আমলের সব ব্যবসায়িক রেকর্ড ভেঙে দেয়। এই দশকের বড় হিট ছবিগুলোর অধিকাংশই মুক্তি পায় ঈদে, যেমন জহিরুল হকের ‘রংবাজ’ এবং আমজাদ হোসেনের ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’। সত্তর দশকের শেষের দিকে ছবিপ্রতি সিনেমা হলের সংখ্যা ১০-১২টিতে উন্নীত হয়, এবং ঈদের ব্যবসা এতটা বেড়ে যায় যে প্রযোজক-প্রদর্শকরা এই দিনটির জন্য মুখিয়ে থাকতেন।
আশির দশক: ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত ও তারকাদের দাপট
আশির দশকের শুরুতে ঢাকাই সিনেমার ব্যবসা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়, যেখানে ঈদে ৪-৫টি করে ছবি মুক্তি পেতে থাকে। আলমগীর পিকচার্স, মাসুদ কথাচিত্রের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতি বছর ঈদে ছবি নিয়ে আসতে চেষ্টা করেছে। তারকাদের টানেই বছরের দুই ঈদে ঢল নামতো সিনেমা হলে, এবং ঈদে যার ছবি মুক্তি পেতো ও ভালো চলতো, সেই তারকা দৌড়ে এগিয়ে যেতেন। ফোক-ফ্যান্টাসি, সামাজিক, ও অ্যাকশন ছবি—বিচিত্র স্বাদের ছবি দর্শকরা ঈদে উপভোগ করেছেন।
নব্বই দশক: তুমুল তারুণ্য ও প্রতিযোগিতার যুগ
নব্বই দশকে এসে ঈদের ছবির প্রতি দর্শক, নির্মাতা, ও হল মালিকদের আগ্রহের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ ঘটে। এসএস প্রডাকশন্স ও আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত ঈদে ছবি মুক্তি দিত, এবং পরিচালক দেলোয়ার জাহান ঝন্টু প্রায় প্রতি ঈদেই ছবি নিয়ে আসতেন। শাবানা ১৯৯৬ সালে এক ঈদে চারটি ছবি মুক্তি দিয়ে রেকর্ড তৈরি করেন, যা আজও অক্ষত। এই দশকে তরুণ তারকাদের উপস্থিতি উজ্জ্বল ছিল, এবং ছবিগুলো ২০-৫০টি সিনেমা হলে মুক্তি পেতো।
শূন্য দশক: চারপাশে শূন্যতা ও অশ্লীলতার যুগ
২০০০ সালের পর ঢালিউডে অশ্লীলতার প্রবণতা দেখা দেয়, যার ফলে দর্শকদের সিনেমা হলে টেনে আনা দুষ্কর হয়ে ওঠে। ব্যানার প্রথার অবসান ঘটে, এবং কেবল গুটিকয় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানই ঈদে ছবি তৈরি করতে থাকে। এই সময় মান্না প্রধান তারকা হিসেবে আবির্ভূত হন, এবং ঈদের দিন স্যাটেলাইট চ্যানেলে নতুন ছবির প্রিমিয়ার শুরু হয়। শূন্য দশকের শেষের দিকে সুস্থ ছবি তৈরির দিকে ঝুঁকে পড়ে ইন্ডাস্ট্রি, যেখানে শাকিব খানের উত্থান ঘটে।
শাকিব খানের দুই দশক: এক নায়কের একাধিপত্য
শাকিব খান গত দুই দশকে ঢালিউডের ঈদ-সিনেমায় একক আধিপত্য বজায় রেখেছেন, যেখানে প্রতিটি ঈদেই তার ছবি মুক্তি পেয়েছে। ২০০৯ সালে এক ঈদেই তার ৫টি ছবি মুক্তি পেয়ে রেকর্ড তৈরি করে, এবং ইন্ডাস্ট্রি একনায়কনির্ভর হয়ে পড়ে। হার্টবিট প্রডাকশন ও জাজ মাল্টিমিডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তার সঙ্গে কাজ করে ঈদের ছবির বাজার গড়ে তোলে। তবে এই একক আধিপত্যের মধ্যেও নতুন সংকট দেখা দেয়, যেখানে ঈদকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে পুরো সিনেমা শিল্প, এবং বছরজুড়ে কর্মপরিকল্পনার অভাব প্রকট।
বর্তমানে ঈদ-সিনেমার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখলেও, সিনেমা শিল্প পড়ে গেছে ঈদের দুষ্টুচক্রে। অতিরিক্ত ওটিটি-নির্ভরতা ও বছরব্যাপী কর্মসূচির অভাবে ইন্ডাস্ট্রি আজব চলচ্চিত্র কারখানায় রূপান্তরিত হচ্ছে। সিনেমা সংশ্লিষ্টদের এখন প্রশ্ন—এই অচলাবস্থার শেষ কবে?



